ঢাকা

গণকবর জিয়ারতে এনসিপি, নাহিদের দাবি—জুলাইয়ের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ এখনো আসেনি

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হলেও এর কাঙ্ক্ষিত বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।

তিনি বলেছেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর তাঁরা যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে গণহত্যার বিচার, রাষ্ট্রীয় সংস্কার এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা হবে—সেই লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ঘোষিত মাসব্যাপী কর্মসূচির প্রথম দিনে বুধবার রাজধানীর রায়েরবাজারে শহীদদের গণকবর জিয়ারত শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম।

এ সময় এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, দুই মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ ও সারজিস আলমসহ দলের শীর্ষ নেতারা এবং কয়েকজন সংসদ সদস্য উপস্থিত ছিলেন।

বৃষ্টির মধ্যেই এনসিপির নেতারা রায়েরবাজার গণকবরে শ্রদ্ধা জানান। পরে বৃষ্টিতে ভিজেই সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন নাহিদ ইসলাম।

শহীদ ও আন্দোলনকারীদের স্মরণ

বক্তব্যের শুরুতেই জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে স্মরণ করেন এনসিপির আহ্বায়ক।

তিনি বলেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ফারহান ফাইয়াজ, লিয়াকতসহ ১ হাজার ৪০০ শহীদ এবং প্রায় ৩০ হাজার আহত জুলাই যোদ্ধাকে তাঁরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছেন।

তিনি বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে রাজপথে নেমে আসা শিক্ষার্থী, শ্রমিক, নারী, শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী, পেশাজীবী, অভিভাবক, আলেম সমাজ, আইনজীবী, সাংবাদিক এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আন্দোলনে যুক্ত প্রবাসীদেরও তাঁরা স্মরণ করছেন।

জুলাই আন্দোলনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করা সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও তরুণ সেনা কর্মকর্তাদের কথাও উল্লেখ করেন নাহিদ ইসলাম।

তিনি বলেন, “জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে যাঁরা যেখানে, যেভাবে, যেখান থেকে অংশ নিয়েছেন, সহযোগিতা করেছেন—তাঁদের সবাইকে আমরা স্মরণ করছি।”

‘বিচার ও সংস্কারের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ চেয়েছিলাম’

নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর তাঁদের প্রত্যাশা ছিল গণহত্যার বিচার ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের মাধ্যমে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক নতুন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা।

তিনি বলেন, “জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দুই বছর হয়েছে। আমরা জুলাই অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে বলেছিলাম, জুলাই গণহত্যার বিচার ও সংস্কারের মাধ্যমে আমরা একটা বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক নতুন বাংলাদেশ দেখতে চাই। সেই আকাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ আমরা এখনো পাইনি।”

ইনুর সাজায় অসন্তোষ

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর ১০ বছরের কারাদণ্ডের রায় নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন নাহিদ ইসলাম।

তিনি বলেন, এই রায় জনগণকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া মানুষ, শহীদ পরিবার এবং আহত ব্যক্তিরা ন্যায়বিচার পাননি বলে তাঁরা মনে করেন।

নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, হাসানুল হক ইনু আওয়ামী লীগের সহযোগী জোটের অংশ ছিলেন এবং জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডে তিনি মদদ দিয়েছেন।

তিনি বলেন, “আমরা মনে করি, ইনুকে যে সাজা দেওয়া হয়েছে, তা যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্রপক্ষ যাতে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে, সেটিই আমাদের দাবি। আমরা তাঁর কঠোর থেকে কঠোর শাস্তি প্রত্যাশা করছি।”

বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত করার দাবি

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর জুলাই হত্যা মামলার বিচার কার্যক্রম ধীরগতিতে চলছে বলেও অভিযোগ করেন এনসিপির আহ্বায়ক।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের সময়ে এখন পর্যন্ত মাত্র দুটি মামলার রায় হয়েছে। তদন্ত কার্যক্রম ও প্রতিবেদন দাখিলের ক্ষেত্রে যথেষ্ট ধীরগতি দেখা যাচ্ছে।

নাহিদ ইসলাম বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে বিচারপ্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। পাশাপাশি শেখ হাসিনাসহ জুলাই গণহত্যার সঙ্গে জড়িত অন্যদের এবং ভারতে পালিয়ে থাকা ওসমান হাদির হত্যাকারীদের দেশে এনে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেওয়া রায় কার্যকর করতে হবে এবং শহীদ পরিবারগুলোর আর্থিক সহায়তা ও জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হবে।

জুলাই শহীদদের কবর সংরক্ষণের দাবি

নাহিদ ইসলাম বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সারা দেশে জুলাই শহীদদের কবরস্থান সংরক্ষণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয়নি।

তিনি বলেন, জুলাই শহীদদের কবরস্থানগুলো সংরক্ষণ করা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই আত্মত্যাগের ইতিহাস জানতে পারে।

এ ছাড়া জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং গণভোটের রায় অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের দাবি জানান তিনি।

তিনি বলেন, এবারের নির্বাচন ও গণভোটের অন্যতম অঙ্গীকার ছিল রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কার এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। কিন্তু সেই সংস্কার এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

নাহিদ ইসলাম বলেন, শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে জুলাই পালন করলেই হবে না; জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকারকে প্রমাণ করতে হবে যে তারা জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের চেতনার সঙ্গে রয়েছে।

৫ আগস্টের মধ্যে জুলাই জাদুঘর খোলার দাবি

জুলাই গণ–অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর এখনো চালু না হওয়ায় প্রশ্ন তোলেন নাহিদ ইসলাম।

তিনি বলেন, আগামী ৫ আগস্টের মধ্যে জুলাই জাদুঘর খুলে দিতে হবে। তা না হলে জনগণ নিজেরাই জাদুঘর খুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেবে।

তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জুলাই গণ–অভ্যুত্থান উপলক্ষে ৩৬ দিনব্যাপী সরকারি কর্মসূচি ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়নি।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার দ্রুত এ বিষয়ে কর্মসূচি ঘোষণা করবে।

‘দেশ গড়তে জুলাই জাগরণ’ কর্মসূচি

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ‘দেশ গড়তে জুলাই জাগরণ’ শিরোনামে মাসব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে এনসিপি।

এই কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পদযাত্রা, গণসংযোগ, শহীদদের স্মরণ, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতা।

৫ আগস্ট ‘বিজয়ের উল্লাস’ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এ আয়োজন শেষ হবে।

রায়েরবাজারের কর্মসূচিতে এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন, সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ, সারজিস আলম, আতিকুর রহমান মোজাহিদ, আবদুল্লাহ আল আমিন, রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য আলী আহসান জুনায়েদ ও আকরাম হুসাইনসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স