ঢাকা

‘জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে কাগুজে বিষয়েও টানাপোড়েন’: জামায়াত নেতা আযাদ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ও জনগণের প্রত্যাশা বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েন চলছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি বলেছেন, জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে যেসব লিখিত ও নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেগুলো নিয়েও এখন মতবিরোধ ও টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত জনগণের শক্তিই বিজয়ী হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বৃহস্পতিবার (১০ জুলাই) দুপুরে রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। ‘আত্মোপলব্ধি ও আত্মপর্যালোচনায় অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের দীপ্ত শপথ’ শীর্ষক এই আলোচনা সভার আয়োজন করে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)।

‘জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন নিয়েও টানাপোড়েন’

বক্তব্যে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘ আলোচনা ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়ে একটি অভিন্ন অবস্থানে পৌঁছেছিল। রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করে দীর্ঘ সময় আলোচনা, বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের অঙ্গীকার এবং জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় জুলাই সনদ প্রণয়ন করা হয়েছিল।

তিনি বলেন,

“জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন নিয়ে কিছু লিখিত-কাগুজে বিষয় হয়েছে। আবার সেটাকেও মেনে নেওয়া, না নেওয়ার জায়গায় রশি টানাটানি চলছে। এই রশি টানাটানির মধ্যে কার শক্তি বেশি, এটাও আগামীতে প্রমাণ হবে, ইনশা আল্লাহ।”

জামায়াত নেতা অভিযোগ করেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়নের পরিবর্তে কিছু পক্ষ সেই আন্দোলনের অর্জনকে দুর্বল বা মুছে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তিনি এ ধরনের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।

‘সংস্কারের পক্ষে জনগণের রায় বাস্তবায়ন হয়নি’

হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, জুলাইয়ের শহীদ এবং আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানুষের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল একমঞ্চে এসে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছিল।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, জনগণের প্রায় ৭০ শতাংশ রাষ্ট্রীয় সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে। কিন্তু সেই জনরায়ের প্রতিফলন এখনো বাস্তবে দেখা যায়নি।

তিনি বলেন, মৌলিক সংস্কারের লক্ষ্যে একাধিক অধ্যাদেশ জারি করা হলেও সংসদে সেগুলোর মধ্যে অন্তত ২০টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ কার্যত বাদ পড়ে গেছে।

“এসব অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ কী হবে, সেটিও এখন অনিশ্চিত,”—বলেন তিনি।

‘গণভোটকে দুর্বল করার চেষ্টা হয়েছে’

বক্তব্যে জামায়াতের এই নেতা অভিযোগ করেন, গণভোটসংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিলের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যক্ষ মতামত প্রকাশের সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়েছে।

তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, আদালতের সাম্প্রতিক রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা এবং গণভোট পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়াকে তিনি ইতিবাচক ও সুখবর হিসেবে দেখছেন।

তার মতে, জনগণের প্রত্যক্ষ রায়ের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো নির্ধারণই গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

‘সংশোধন নয়, সংবিধান সংস্কার করতে হবে’

সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, সংবিধানের সীমিত সংশোধনের পরিবর্তে পূর্ণাঙ্গ সংস্কার প্রয়োজন।

তিনি দাবি করেন, জনগণ গণভোটে সংবিধান সংশোধনের পক্ষে নয়, বরং সংবিধান সংস্কারের জন্যই রায় দিয়েছে।

তার ভাষায়, একই তফসিলের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটে জনগণ রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে। তাই সেই গণরায়ের ভিত্তিতে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যকর করা উচিত।

‘গণরায় উপেক্ষা করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়’

হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, গণভোটে প্রকাশিত জনগণের মতামত একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক অভিব্যক্তি।

তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, জনগণের সেই রায় উপেক্ষা করে কীভাবে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব?

তার মতে, রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে আরেক ধরনের সংসদীয় স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করা উচিত নয়।

তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচনের আগে সংস্কারের বিষয়ে যেসব রাজনৈতিক অঙ্গীকার করা হয়েছিল, সংসদে গিয়ে তার অনেকটাই উপেক্ষা করা হচ্ছে।

“জাতির সঙ্গে দ্বিচারিতা করে সামনে এগোনো সম্ভব নয়,”—বলেন তিনি।

‘সংসদে জনগণের স্বার্থই প্রাধান্য পেতে হবে’

সংসদের কার্যকারিতা প্রসঙ্গে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, সংসদ তখনই কার্যকর হবে, যখন সরকার ও বিরোধী দলের বক্তব্য সমন্বয় করে দেশ ও জনগণের কল্যাণে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।

বর্তমান সংসদের কার্যক্রম নিয়ে সমালোচনা করে তিনি বলেন, অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত আলোচনার পরিবর্তে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক ও হালকা রসিকতায় মূল্যবান সময় নষ্ট হয়।

তিনি আরও বলেন, দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করতে হবে। শুধু অপরাধ সংঘটনকারীদের নয়, যারা এসব ঘটনার নির্দেশ দিয়েছে বা সহায়তা করেছে, তাদেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে।

‘জাতিকে বোকা বানানোর চেষ্টা করবেন না’

হামিদুর রহমান আযাদ জানান, গত মঙ্গলবার ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ জাবির ইব্রাহিমের মায়ের স্বাক্ষরিত একটি স্মারকলিপি জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, স্মারকলিপিতে ছয় দফা দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। এর প্রথম দাবিই হলো—অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করে রাষ্ট্র সংস্কারের কার্যক্রম শুরু করা।

তার অভিযোগ, সরকার বর্তমানে সংবিধান সংশোধনের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তিনি বলেন,
“সংবিধান সংশোধনের জন্য নয়, জুলাই বিপ্লব হয়েছিল সংবিধান সংস্কারের জন্য। জনগণ সংশোধনের পক্ষে রায় দেয়নি; তারা সংস্কারের জন্য রায় দিয়েছে।”

‘প্রয়োজনে রাজপথে সমাধান খুঁজতে হবে’

সরকারের উদ্দেশে হামিদুর রহমান আযাদ আরও বলেন, অতীতে সংবিধানের একাধিক সংশোধনী আদালতের রায়ে বাতিল হয়েছে। ফলে শুধুমাত্র সংশোধনের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার টেকসই হবে না।

তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন,
“সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া অবলম্বন করে জাতিকে বোকা বানানোর চেষ্টা করবেন না।”

তিনি আরও বলেন, যদি সংসদের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী রাষ্ট্র সংস্কারের সমাধান না আসে, তাহলে গণতান্ত্রিক উপায়ে রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমেও সমাধান খুঁজতে হবে।

বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার অংশগ্রহণ

আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান (মঞ্জু)।

সভায় আরও বক্তব্য দেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান রিপন, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ জাবির ইব্রাহিমের মা ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগম, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম এবং সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স