ঢাকা

মাশহাদে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফন, শেষ শ্রদ্ধায় জনতার ঢল

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
দুবাই | রয়টার্স

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে তাঁর জন্মস্থান উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে দাফন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দেশটির অন্যতম পবিত্র ধর্মীয় স্থাপনা ইমাম রেজার মাজার প্রাঙ্গণে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়। এর মধ্য দিয়ে এক সপ্তাহব্যাপী জানাজা, রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান এবং দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত শোকযাত্রার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।

দাফন উপলক্ষে মাশহাদে লাখো মানুষের সমাগম হয়। শোকযাত্রায় অংশ নেওয়া মানুষের হাতে ছিল ইরানের জাতীয় পতাকা, খামেনির প্রতিকৃতি এবং বিপ্লবী স্লোগানসংবলিত লাল প্ল্যাকার্ড। কালো পোশাকে শোকাহত জনতা শহরের প্রধান সড়কজুড়ে শেষ শ্রদ্ধা জানান।

খামেনির মরদেহ একটি বিশেষ ট্রাকে করে মাশহাদের জনাকীর্ণ সড়ক অতিক্রম করে ইমাম রেজার মাজারের দিকে নেওয়া হয়। ট্রাকের দুই পাশে সাদা পাগড়ি পরিহিত ধর্মীয় আলেমরা হেঁটে শোভাযাত্রায় অংশ নেন। পুরো এলাকায় কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হলেও বিপুলসংখ্যক মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে শেষ বিদায়ে অংশ নেন।

যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রীয় শোক

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার এই দাফন এমন এক সময় সম্পন্ন হলো, যখন দেশটি সাম্প্রতিক যুদ্ধ এবং আঞ্চলিক অস্থিরতার প্রভাব কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় যুদ্ধের প্রথম ধাপে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। পরবর্তী সময়ে কয়েক সপ্তাহের সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় এবং গত মাসে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে আবারও উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কূটনৈতিক আলোচনা চললেও উভয় পক্ষের মধ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে। একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি কার্যত শেষ হয়েছে বলে ঘোষণা দিয়েছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।

উত্তরসূরি মোজতবা এখনো জনসমক্ষে নন

খামেনির মৃত্যুর এক সপ্তাহ পর মার্চের শুরুতে দেশটির প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতাদের একটি পরিষদ তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করে।

তবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে মোজতবা এখনো জনসমক্ষে উপস্থিত হননি।

যুদ্ধ শুরুর পর তাঁর কোনো ছবি, ভিডিও বা বক্তব্যও প্রকাশ করা হয়নি। কেবল লিখিত বিবৃতির মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন বার্তা দিয়েছেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, যে হামলায় আয়াতুল্লাহ খামেনি নিহত হন, সেই হামলাতেই মোজতবা খামেনিও গুরুতর আহত হন। এতে তাঁর মুখমণ্ডল বিকৃত হয় এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাত লাগে।

তেহরানের একাধিক জ্যেষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন। তবে শারীরিক অবস্থার পাশাপাশি নিরাপত্তাজনিত কারণেও তাঁকে এখনো জনসমক্ষে আনা হয়নি। নতুন করে হামলার আশঙ্কায় তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলো কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে।

শোকযাত্রায় প্রতিশোধের স্লোগান

দাফনের আগে মাশহাদে অনুষ্ঠিত শোকযাত্রায় অংশ নেওয়া বহু মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

শোকযাত্রায় উপস্থিত জনতার একটি অংশ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের দাবিতে স্লোগান দেন। যুদ্ধ-পরবর্তী উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে এই শোকানুষ্ঠান ইরানের রাজনৈতিক ও জনমতের প্রতিফলন হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অবসান

বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জন্ম ১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল মাশহাদে। ধর্মীয় পরিবারে বেড়ে ওঠা খামেনি তরুণ বয়সে মাশহাদ ও কোমে ইসলামি শিক্ষা গ্রহণ করেন।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর তিনি দ্রুত দেশটির ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন। ১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এরপর ইসলামি বিপ্লবের প্রতিষ্ঠাতা নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর ১৯৮৯ সালে তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হন।

মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রায় ৩৭ বছর তিনি দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্বে ছিলেন। এই দীর্ঘ সময়ে ইরানের পররাষ্ট্রনীতি, নিরাপত্তা কৌশল, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে তাঁর প্রভাব ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মাশহাদে তাঁর দাফনের মধ্য দিয়ে ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটল। একই সঙ্গে দেশটির নতুন নেতৃত্ব, আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স