আদালতে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ গোপনের অভিযোগ; এআই প্রশিক্ষণে সংবাদ কনটেন্ট ব্যবহারের বিরোধে নতুন মোড়
আল–জাজিরা, রয়টার্স
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির বিকাশ এবং কপিরাইট সুরক্ষিত সংবাদ–কনটেন্ট ব্যবহারের বৈধতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলমান বহুল আলোচিত আইনি লড়াইয়ে নতুন মোড় এসেছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, নিউইয়র্ক ডেইলি নিউজসহ যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি শীর্ষ সংবাদমাধ্যম ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে আদালতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানিয়েছে।
সংবাদমাধ্যমগুলোর অভিযোগ, চ্যাটজিপিটির নির্মাতা ওপেনএআই মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও ডিজিটাল প্রমাণ গোপন করছে, যা কপিরাইট লঙ্ঘনের অভিযোগের বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আদালতের পক্ষ থেকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা (Sanctions) গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই মামলার রায় শুধু ওপেনএআই বা সংবাদমাধ্যমগুলোর জন্যই নয়, বরং বৈশ্বিক সংবাদশিল্প, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্প এবং ডিজিটাল কপিরাইট ব্যবস্থার ভবিষ্যতের ওপরও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
আদালতে কী অভিযোগ করা হয়েছে?
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের একটি ফেডারেল আদালতে দাখিল করা আবেদনে অভিযোগ করা হয়, ওপেনএআই এমন ডেটাসেট ও চ্যাটজিপিটির কথোপকথনের লগ (রেকর্ড) প্রকাশ করছে না, যেগুলো থেকে বোঝা যেতে পারে কোম্পানিটি সংবাদমাধ্যমগুলোর কপিরাইট–সুরক্ষিত প্রতিবেদন কীভাবে ব্যবহার করেছে।
আবেদনে বলা হয়েছে, এসব তথ্য মামলার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও ওপেনএআই সেগুলো প্রকাশ না করে "প্রতিবন্ধকতার পথ" বেছে নিয়েছে।
অভিযোগকারী সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, সাম্প্রতিক এক জবানবন্দিতে ওপেনএআইয়ের এক কর্মীর বক্তব্য প্রতিষ্ঠানটির পূর্ববর্তী অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এতে তাদের সন্দেহ আরও জোরালো হয়েছে যে, কোম্পানিটি প্রমাণ সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় অসদাচরণ করেছে।
'লাখ লাখ সংবাদ প্রতিবেদন ব্যবহার করে এআই প্রশিক্ষণ'
মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, ওপেনএআই এবং তাদের ব্যবসায়িক অংশীদার মাইক্রোসফট সংবাদমাধ্যমগুলোর লাখ লাখ কপিরাইট–সুরক্ষিত প্রতিবেদন ব্যবহার করে তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল প্রশিক্ষণ দিয়েছে।
বাদীপক্ষের ভাষ্য, সংবাদ সংগ্রহ, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বা সাংবাদিকতার ব্যয় বহন না করেই এআই চ্যাটবটগুলো সংবাদমাধ্যমের তৈরি তথ্য ব্যবহার করে ব্যবহারকারীদের উত্তর দিচ্ছে।
এর ফলে পাঠকেরা মূল সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটে না গিয়ে সরাসরি এআই প্ল্যাটফর্ম থেকেই তথ্য সংগ্রহ করছেন। এতে সংবাদমাধ্যমগুলোর ওয়েব ট্রাফিক কমছে এবং বিজ্ঞাপননির্ভর আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে—এআই চ্যাটবটগুলো সংবাদমাধ্যমগুলোর সঙ্গে অন্যায্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছে কি না।
আইনজীবীর বক্তব্য
নিউইয়র্ক ডেইলি নিউজ এবং এর সহযোগী সাতটি সংবাদপত্রের পক্ষে মামলাটি পরিচালনাকারী আইনজীবী স্টিভেন লিবারম্যান অভিযোগ করেন, গত দুই বছর ধরে ওপেনএআই আদালতকে বিভ্রান্ত করেছে।
তাঁর দাবি, এআই প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত ডেটাসেট ও কথোপকথনের লগে কপিরাইট–সুরক্ষিত সংবাদ–কনটেন্ট শনাক্ত করার সক্ষমতা সম্পর্কে কোম্পানিটি ভুল তথ্য দিয়েছে।
লিবারম্যান বলেন, চুরি করা সংবাদ–কনটেন্ট ব্যবহার করে চ্যাটজিপিটিকে কীভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, সে–সংক্রান্ত প্রমাণ গোপন এবং ধ্বংস করার জন্যই আদালতের কাছে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আবেদন করা হয়েছে।
ওপেনএআইয়ের জবাব
এর আগে ওপেনএআই আদালতকে জানিয়েছিল, চ্যাটজিপিটির ব্যবহারকারীদের কথোপকথনের লগ জমা দেওয়া হলে ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
এদিকে সংবাদমাধ্যমগুলোর নতুন আবেদনের জবাবে ওপেনএআইয়ের মুখপাত্র ড্রু পুসাতেরি অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তিনি বলেন, নিউইয়র্ক টাইমসের মামলা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং ইতোমধ্যে তারা নিজেদের আনা কয়েকটি অভিযোগ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছে।
তাঁর দাবি, মামলার সঙ্গে সম্পর্কহীন মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য পাওয়ার জন্য সংবাদমাধ্যমগুলো অপ্রয়োজনীয়ভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে এবং এ প্রক্রিয়ায় তারা "স্পষ্টভাবে মিথ্যা অভিযোগ" করছে।
মামলার পটভূমি
চ্যাটজিপিটির বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু হওয়ার প্রায় এক বছর পর, ২০২৩ সালের শেষ দিকে ওপেনএআই ও মাইক্রোসফটের বিরুদ্ধে মামলা করে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস।
পরে নিউইয়র্ক ডেইলি নিউজসহ আরও কয়েকটি সংবাদমাধ্যম এই মামলায় যুক্ত হয়।
তাদের অভিযোগ, অনুমতি ছাড়া সংবাদ প্রতিবেদন ব্যবহার করে এআই মডেল প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যা কপিরাইট আইনের লঙ্ঘন।
এআই যুগে সংবাদশিল্পের সংকট
চ্যাটজিপিটির জনপ্রিয়তার পর বিশ্বজুড়ে তথ্য অনুসন্ধানের ধরনে বড় পরিবর্তন এসেছে।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালে গুগলও অনলাইন অনুসন্ধান ফলাফলের শীর্ষে এআই–নির্ভর সারসংক্ষেপ (AI Overview) প্রদর্শন শুরু করে।
ফলে ব্যবহারকারীরা অনেক ক্ষেত্রেই মূল সংবাদপ্রতিবেদনে প্রবেশ না করেই প্রয়োজনীয় তথ্য পেয়ে যাচ্ছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এতে সংবাদমাধ্যমগুলোর ওয়েবসাইটে পাঠকসংখ্যা কমছে এবং বিজ্ঞাপন থেকে আয়ও হ্রাস পাচ্ছে। ইতোমধ্যে বৈশ্বিক সংবাদশিল্পের ব্যবসায়িক মডেলের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
শুধু নিউইয়র্ক টাইমস নয়
কপিরাইট–সুরক্ষিত কনটেন্ট ব্যবহার করে এআই প্রশিক্ষণের অভিযোগে বর্তমানে একাধিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা চলছে।
লেখক, শিল্পী, আলোকচিত্রী, সংগীত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্বত্বাধিকারী ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক এবং মেটার মতো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই শুরু করেছেন।
এসব মামলার মাধ্যমে মূল প্রশ্নটি হলো—এআই প্রশিক্ষণের জন্য ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত কপিরাইট–সুরক্ষিত উপকরণ ব্যবহার "ন্যায্য ব্যবহার" (Fair Use)-এর আওতায় পড়ে কি না, নাকি এর জন্য স্বত্বাধিকারীদের অনুমতি ও পারিশ্রমিক প্রয়োজন।
আইনি লড়াইয়ে ব্যয় বাড়ছে
আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থায় জমা দেওয়া নথি অনুযায়ী, এআই কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালাতে এখন পর্যন্ত ২ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলারেরও বেশি ব্যয় করেছে নিউইয়র্ক টাইমস।
এই ব্যয়ের মধ্যে গত বছর এআই–ভিত্তিক সার্চ প্রতিষ্ঠান পারপ্লেক্সিটির বিরুদ্ধে করা মামলার খরচও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
অন্যদিকে বাড়ছে লাইসেন্সিং চুক্তি
একদিকে আইনি লড়াই চললেও অন্যদিকে অনেক সংবাদমাধ্যম এআই কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক লাইসেন্সিং চুক্তিতে যাচ্ছে।
এসব চুক্তির আওতায় ওপেনএআই, গুগল, মেটাসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত অর্থের বিনিময়ে সংবাদমাধ্যমগুলোর কনটেন্ট ও সংরক্ষিত আর্কাইভ ব্যবহার করে তাদের এআই মডেল প্রশিক্ষণ দিতে পারছে।
২০২৩ সালে এ ধরনের লাইসেন্সিং চুক্তি ঘোষণা করা প্রথম আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ছিল অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)। এরপর আরও বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম একই ধরনের চুক্তিতে যুক্ত হয়েছে।
বর্তমান মামলাটি তাই শুধু একটি কপিরাইট বিরোধ নয়; বরং ভবিষ্যতে সংবাদমাধ্যম, প্রযুক্তি কোম্পানি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পের মধ্যে কনটেন্ট ব্যবহারের আইনি ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক কোন কাঠামোয় পরিচালিত হবে, সে প্রশ্নেরও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।