সৌদি আরবের সঙ্গে বহুল আলোচিত একটি বিস্তৃত বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার দুই দেশের পক্ষ থেকে চুক্তির বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এই সমঝোতার মাধ্যমে ভবিষ্যতে সৌদি আরব নিজস্ব পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জনের সুযোগ পেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তিটি শুধু জ্বালানি সহযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি, ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, যুক্তরাষ্ট্র–সৌদি কৌশলগত সম্পর্ক এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ—সবকিছুর ওপরই এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে।
ইরান যুদ্ধের পর নতুন কৌশলগত সমঝোতা
সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও রিয়াদের সম্পর্কে কিছুটা টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। নতুন এই পারমাণবিক চুক্তিকে দুই দেশের সম্পর্ক পুনরায় শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দাবি, চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক শিল্পে কয়েক শ কোটি ডলারের নতুন ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে মার্কিন প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টিংহাউস সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে পারে। প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যবহৃত বহু পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লির নকশা তৈরি করেছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের পর খুব শিগগিরই চুক্তির বিস্তারিত কংগ্রেসে উপস্থাপন করা হবে।
চুক্তিতে কী রয়েছে
এই সমঝোতা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের 'ওয়ান-টু-থ্রি অ্যাগ্রিমেন্ট' কাঠামোর আওতায় সম্পাদিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটমিক এনার্জি অ্যাক্টের ১২৩ ধারা অনুসারে এ ধরনের চুক্তি দুটি দেশের মধ্যে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার আইনি ভিত্তি নির্ধারণ করে।
বর্তমানে বিশ্বের ৫১টি দেশ এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের ২৬টি চুক্তি রয়েছে।
নতুন চুক্তির আওতায়—
সৌদি আরবের বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে যুক্তরাষ্ট্র প্রযুক্তিগত সহায়তা দেবে।
ভবিষ্যতে সৌদি আরবের নিজস্ব ভূখণ্ডে পারমাণবিক জ্বালানি উৎপাদনের সম্ভাব্যতা নিয়ে যৌথ সমীক্ষা পরিচালিত হবে।
সমীক্ষার ফল ইতিবাচক হলে সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কিংবা প্লুটোনিয়াম পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করার অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।
পারমাণবিক অবকাঠামো নির্মাণে মার্কিন কোম্পানিগুলো বড় ধরনের বিনিয়োগের সুযোগ পাবে।
কেন উদ্বিগ্ন ইসরায়েল
চুক্তিটি নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইসরায়েল এবং মার্কিন কংগ্রেসের একাংশ।
তাদের আশঙ্কা, বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচির আড়ালে ভবিষ্যতে সৌদি আরব পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের পথে এগোতে পারে।
উদ্বেগের আরেকটি বড় কারণ হলো, ট্রাম্প প্রশাসন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের ক্ষমতা সীমিত করার মতো কিছু শর্তে সম্মত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সমালোচকদের মতে, এতে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শকদের পক্ষে কোনো পারমাণবিক স্থাপনা থেকে অস্ত্র তৈরির উদ্দেশ্যে জ্বালানি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে কি না, তা কার্যকরভাবে যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
আমিরাতের চুক্তির তুলনায় শর্ত অনেক শিথিল
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এই চুক্তির সবচেয়ে বড় বিতর্কের জায়গা হলো এর শর্তাবলি।
২০০৯ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র যে পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি করেছিল, সেটিকে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধে 'গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড' হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সেই চুক্তির আওতায়—
আমিরাত আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার 'অতিরিক্ত প্রটোকল' গ্রহণ করেছিল।
নিজস্বভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা প্লুটোনিয়াম পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করার অধিকার ত্যাগ করেছিল।
ফলে ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অবকাঠামো গড়ে তোলার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
অন্যদিকে সৌদি আরবের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলক নমনীয় অবস্থান নিয়েছে। যদিও ওয়াশিংটনের দাবি, পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিবিড় নজরদারি অব্যাহত থাকবে।
বাইডেনের পরিকল্পনা থেকে ট্রাম্পের ভিন্ন পথ
সৌদি আরবের সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা নতুন নয়।
জো বাইডেন প্রশাসনের সময় এই চুক্তিকে একটি বৃহত্তর কূটনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা হয়েছিল। সেই পরিকল্পনায় শর্ত ছিল, সৌদি আরবকে ইসরায়েলকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা এবং পরবর্তী গাজা যুদ্ধের পর সেই সম্ভাবনা কার্যত ভেঙে পড়ে।
পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই শর্ত বাদ দিয়ে সরাসরি সৌদি আরবের সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতার পথ খুলে দেন।
ইরানকে ঘিরে নতুন সমীকরণ
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান অতীতে একাধিকবার বলেছেন, ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে, তবে সৌদি আরবও একই পথে হাঁটবে।
এদিকে ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর তেহরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম আরও জোরদার করে।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। চলতি বছরও দুই দেশের যৌথ সামরিক অভিযান মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
এই প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবের পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়ানোর সম্ভাবনা ইসরায়েলের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের নতুন করে উদ্বিগ্ন করেছে।
কংগ্রেসে বিতর্কের সম্ভাবনা
চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার আগে মার্কিন কংগ্রেসে পর্যালোচনার মুখোমুখি হতে হবে।
যদিও রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থনের কারণে এটি অনুমোদনের সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করা হচ্ছে, তবু ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান—উভয় দলের কিছু আইনপ্রণেতা আপত্তি তুলতে পারেন।
বিশেষ করে চুক্তির সঙ্গে যুক্ত দুটি গোপন সম্পূরক নথি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, এসব নথিতে জাতীয় নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিকভাবে সংবেদনশীল তথ্য রয়েছে। তবে কংগ্রেসের কয়েকজন সদস্যের বক্তব্য, নথিগুলো প্রকাশ না করা হলে তাঁরা চুক্তির পক্ষে ভোট দেবেন না।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও আলোচনায়
পারমাণবিক সহযোগিতার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও জোরদার করার বিষয়েও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমন একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষাচুক্তি চেয়ে আসছে, যা মার্কিন সিনেট অনুমোদন করবে এবং ভবিষ্যতের কোনো প্রশাসন সহজে বাতিল করতে পারবে না।
দুই দেশের আলোচনায় সৌদি আরবের কাছে উন্নত এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির বিষয়ও উঠে এসেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন অধ্যায়
বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ করবে।
একদিকে এটি যুক্তরাষ্ট্র–সৌদি সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করবে, অন্যদিকে ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়াবে এবং ইরান–সৌদি প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে নতুন রূপ দিতে পারে।
একই সঙ্গে পারমাণবিক প্রযুক্তির বিস্তার রোধে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রক্রিয়া, আন্তর্জাতিক পরিদর্শন ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতে সৌদি আরবের পারমাণবিক কর্মসূচির বাস্তবায়ন—সবকিছুই এখন আন্তর্জাতিক মহলের নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকবে।