ঢাকা

দিল্লিতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, পদত্যাগ না করা পর্যন্ত কর্মসূচি অব্যাহত

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে চলমান আন্দোলন আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। বুধবার গভীর রাতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও পরীক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া এ আন্দোলন এখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের জন্য অন্যতম বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর তরুণদের নেতৃত্বে এত বড় আন্দোলনের মুখে এবারই প্রথম পড়েছে মোদি সরকার।

যন্তর মন্তরে ১০ হাজারের বেশি মানুষের সমাবেশ

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার দিনভর রাজধানীর যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের সমাগম বাড়তে থাকে। সন্ধ্যার পর বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। একপর্যায়ে সমাবেশের ভিড় যন্তর মন্তরের সীমানা ছাড়িয়ে আশপাশের সড়কে ছড়িয়ে পড়ে।

আন্দোলনকারীরা স্লোগান দিতে দিতে ভারতের জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে বিক্ষোভে অংশ নেন। একই সময়ে সংসদ ভবনের বাইরেও পৃথক বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়।

রাতভর সংঘর্ষ, কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ

দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, গভীর রাতে কিছু বিক্ষোভকারী পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে পাথর ও প্লাস্টিকের বোতল নিক্ষেপ করেন। এতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন এবং তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে এবং লাঠিচার্জ করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, আন্দোলনকারীদের ছোট ছোট কয়েকটি দলের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হচ্ছে। ভিডিওগুলোতে পুলিশকে বিক্ষোভকারীদের ওপর লাঠিচার্জ করতে এবং কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করতে দেখা যায়।

তবে রয়টার্স এসব ভিডিওর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন

গত মে মাসে নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়।

আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে সদ্যগঠিত ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। সংগঠনটির নেতারা ঘোষণা দিয়েছেন, শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।

সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে বুধবার গভীর রাতে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলেন,

“আজ ২৫ দিন হলো। প্রয়োজন হলে ২৫ মাসও আন্দোলন চলবে। কিন্তু আমরা এখান থেকে সরে যাব না।”

প্রথমদিকে অনলাইন ব্যঙ্গ বা স্যাটায়ারভিত্তিক একটি উদ্যোগ হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে হাজারো তরুণ-তরুণীর অংশগ্রহণে সিজেপি একটি বড় আন্দোলনের প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।

বিরোধীদের সমর্থন, সংসদে নতুন কৌশল

শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে কংগ্রেসসহ ভারতের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো।

গত মঙ্গলবার কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ বিরোধী নেতারা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। পরে পুলিশ তাঁদের সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়। যদিও কিছু সময় পর তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

এদিকে সংসদের চলমান বর্ষাকালীন অধিবেশনেও বিষয়টি নিয়ে সরকারকে চাপে রাখার কৌশল নিয়েছে বিরোধীরা।

বিরোধী নেতাদের বৈঠকে বৃহস্পতিবার সংসদে পরবর্তী কর্মসূচি ও কৌশল নির্ধারণের কথা রয়েছে।

রাহুল গান্ধী বলেছেন, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের প্রশ্নে বিরোধীরা কোনো আপস করবে না।

দিল্লির ১৬টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ

বিক্ষোভের কারণে নিরাপত্তা জোরদার করেছে দিল্লি প্রশাসন।

দিল্লি মেট্রোরেল করপোরেশন (ডিএমআরসি) জানিয়েছে, নিরাপত্তাজনিত কারণে বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লি ও আশপাশের ১৬টি মেট্রো স্টেশন পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়েছে।

চলতি সপ্তাহে দ্বিতীয়বারের মতো এত বড় পরিসরে মেট্রো স্টেশন বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো।

সরকারের সঙ্গে আলোচনা, তবু সমাধান হয়নি

ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে মোদি সরকার আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক দফা বৈঠক করেছে।

সরকার জানিয়েছে, শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো বিবেচনা করা হবে এবং পরীক্ষাব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে সংসদে আলোচনা করা হবে।

তবে বিরোধীদের অভিযোগ, অতীতেও প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটলেও সরকার কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এবারও আন্দোলন শুরুর পর দীর্ঘ সময় সরকার শিক্ষার্থীদের দাবিকে গুরুত্ব দেয়নি।

তরুণদের ক্ষোভে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ

বিশ্লেষকদের মতে, দেশে দীর্ঘদিন ধরে চাকরির সংকট, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অনিয়ম এবং বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় তরুণদের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভ এই আন্দোলনের মাধ্যমে বিস্ফোরিত হয়েছে।

এ আন্দোলন বিরোধী দলগুলোর জন্যও মোদি সরকারকে রাজনৈতিকভাবে চাপে রাখার একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে।

তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ বিজেপির গুরুত্বপূর্ণ সমর্থকগোষ্ঠী হিসেবে বিবেচিত হলেও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা।

বিশেষ করে ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নতুন করে তরুণ ভোটারদের আস্থা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে রাজধানী দিল্লির এই আন্দোলন শুধু শিক্ষাব্যবস্থার সংকট নয়, বরং ভারতের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপরও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স