ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দলীয়ভাবে সবচেয়ে বেশি নির্বাচনী ব্যয় দেখিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটি নির্বাচনে ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৪৭ হাজার ৯৭২ টাকা ব্যয় দেখিয়েছে।
অন্যদিকে নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনকারী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হিসাবে ৩ কোটি ৮০ লাখ ৮৯ হাজার ১৩৭ টাকা ব্যয় দেখিয়েছে।
ইসি গত ২৬ জুলাই তাদের ওয়েবসাইটে ৪৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ব্যয়ের তথ্য প্রকাশ করে। তবে কোন দল কোন খাতে কত টাকা ব্যয় করেছে, সেই বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। শুধু প্রতিটি দলের মোট ব্যয়ের পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে।
৫০টি দল নির্বাচনে অংশ নিলেও প্রকাশ হয়েছে ৪৯ দলের হিসাব
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ৫০টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। এর মধ্যে ৪৯টি দলের নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, প্রার্থীর ব্যক্তিগত ব্যয় এবং রাজনৈতিক দলের ব্যয়—এই দুই ধরনের নির্বাচনী ব্যয়ের বিধান রয়েছে।
একজন প্রার্থী কত টাকা ব্যয় করতে পারবেন, তা সংশ্লিষ্ট আসনের ভোটারসংখ্যার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় এবং সেই হিসাব রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দিতে হয়।
অন্যদিকে রাজনৈতিক দল তাদের মনোনীত প্রতিটি প্রার্থীকে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অনুদান দিতে পারে। পাশাপাশি প্রচার-প্রচারণাসহ অন্যান্য সাংগঠনিক ব্যয়ও দল বহন করতে পারে। কোনো দল মোট কত টাকা ব্যয় করতে পারবে, তা নির্ভর করে তাদের মনোনীত প্রার্থীর সংখ্যার ওপর।
আইনে ব্যয়সীমা কী
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী—
২০০ জনের বেশি প্রার্থী থাকলে সর্বোচ্চ ব্যয় করা যাবে ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
১০০ থেকে ২০০ জন প্রার্থী থাকলে ৩ কোটি টাকা।
৫১ থেকে ১০০ জন প্রার্থী থাকলে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
৫০ জনের কম প্রার্থী থাকলে সর্বোচ্চ ৭৫ লাখ টাকা ব্যয় করা যাবে।
কোন দল কত ব্যয় দেখিয়েছে
ইসির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ২৯১টি আসনে প্রার্থী দেয় বিএনপি। আইন অনুযায়ী দলটির ব্যয়সীমা ছিল ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। তবে তারা নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হিসাবে ৩ কোটি ৮০ লাখ ৮৯ হাজার ১৩৭ টাকা ব্যয় দেখিয়েছে।
অন্যদিকে ২২৭টি আসনে প্রার্থী দেওয়া জামায়াতে ইসলামী ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৪৭ হাজার ৯৭২ টাকা ব্যয় দেখিয়েছে, যা প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী সর্বোচ্চ।
এ ছাড়া অন্যান্য দলের ব্যয় ছিল—
ন্যাশনাল সিটিজেন্স পার্টি (এনসিপি): ১২ লাখ ৮৪ হাজার ৪০০ টাকা (৩২ জন প্রার্থী)
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ: ৩৩ লাখ ৬৫ হাজার ৯৭১ টাকা
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি): ২০ লাখ ৯৬ হাজার ২৬৩ টাকা
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি: ২০ লাখ ১৬ হাজার ৬০০ টাকা
আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি): ১৭ লাখ ৮১ হাজার ৭১০ টাকা
গণ অধিকার পরিষদ: ৮ লাখ ১০ হাজার টাকা
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস: ৭ লাখ ৩০ হাজার টাকা
জাতীয় পার্টি: ৫ লাখ ৫ হাজার টাকা
এ ছাড়া কয়েকটি দল পাঁচ লাখ টাকারও কম ব্যয় দেখিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জেএসডি, বাসদ, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ, সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট, বাংলাদেশ জাসদ, বাসদ (মার্ক্সবাদী), বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, খেলাফত মজলিস ও গণতন্ত্রী পার্টি।
এক লাখ টাকার কম ব্যয় দেখিয়েছে আম জনতার দল ও জাতীয় পার্টি (জেপি)। সবচেয়ে কম ব্যয় দেখিয়েছে বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (বিএমএল), যারা মাত্র ৩ হাজার টাকা ব্যয় দেখিয়েছে।
২৭টি দল বলেছে, কোনো ব্যয়ই হয়নি
ইসিতে জমা দেওয়া হিসাবে ২৭টি রাজনৈতিক দল জানিয়েছে, তারা দলীয়ভাবে নির্বাচনে কোনো অর্থ ব্যয় করেনি।
এসব দলের মধ্যে রয়েছে—
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)
জাকের পার্টি
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন
ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি)
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ
গণফোরাম
বাংলাদেশ ন্যাপ
কল্যাণ পার্টি
ইসলামী ঐক্যজোট
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা)
বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি
জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম)
বাংলাদেশ কংগ্রেস
নাগরিক ঐক্য
গণসংহতি আন্দোলন
এ ছাড়া আরও কয়েকটি দল শূন্য ব্যয়ের হিসাব জমা দিয়েছে।
ব্যয়ের হিসাব জমা দেওয়ার সময়সীমা
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং পরদিন ফলাফলের গেজেট প্রকাশিত হয়।
আইন অনুযায়ী, ফলাফলের গেজেট প্রকাশের ৯০ দিনের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব নির্বাচন কমিশনে জমা দিতে হয়। সেই হিসাবে গত ১৩ মে ছিল ব্যয়ের হিসাব জমা দেওয়ার শেষ দিন।
নির্ধারিত সময়ে ২৭টি দল হিসাব জমা দেয়। পরে নির্বাচন কমিশন বাকি দলগুলোর জন্য ১৪ জুন পর্যন্ত সময় বাড়ায়। ওই সময়ের মধ্যে বিএনপিসহ আরও ১৬টি দল হিসাব জমা দেয়।
তবে এনসিপিসহ সাতটি দল নির্ধারিত সময়েও হিসাব জমা না দেওয়ায় ২৬ জুন তাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় নির্বাচন কমিশন।
ব্যয়ের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন বিশেষজ্ঞদের
নির্বাচনী ব্যয়ের এই হিসাব বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নির্বাচন বিশ্লেষকেরা।
তাঁদের মতে, জাতীয় নির্বাচনের সময় বড় রাজনৈতিক দল এবং প্রভাবশালী প্রার্থীরা ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন উৎস থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আর্থিক সহায়তা পেয়ে থাকেন। কিন্তু সেই অর্থের বড় অংশ আনুষ্ঠানিক হিসাবের বাইরে থেকে যায়। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনও সাধারণত দল বা প্রার্থীদের জমা দেওয়া হিসাব স্বাধীনভাবে নিরীক্ষা করে না।
এ বিষয়ে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য আব্দুল আলীম বলেন, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয় পর্যবেক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হিসাব যাচাই করা উচিত। অন্তত দৈবচয়নের ভিত্তিতে কিছু হিসাব নিরীক্ষা করলে নির্বাচনী ব্যয়ের তথ্য আরও স্বচ্ছ ও জনবিশ্বাসযোগ্য হবে বলে তিনি মনে করেন।
নির্বাচন কমিশনের অবস্থান
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব নিরীক্ষার বিষয়ে এখনো কমিশনের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে বিশেষ প্রয়োজন দেখা দিলে তা বিবেচনা করা হবে।
গবেষণাতেও উঠে এসেছে বেশি ব্যয়ের চিত্র
নির্বাচনী ব্যয়ের বাস্তব চিত্র নিয়ে অতীতের গবেষণাও প্রশ্ন তুলেছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে প্রকাশিত এক গবেষণায় উল্লেখ করেছিল, তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা প্রচার-প্রচারণায় গড়ে প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয় করেছিলেন, যা নির্বাচন কমিশন নির্ধারিত ব্যয়সীমার প্রায় ছয় গুণ বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের বাস্তবতা বিবেচনায় নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব শুধু জমা নেওয়াই যথেষ্ট নয়; বরং তা স্বাধীনভাবে যাচাই ও নিরীক্ষার ব্যবস্থাও জরুরি, যাতে নির্বাচনী অর্থায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়।