ঢাকা

রোহিঙ্গা পাচার ও সাগরে মৃত্যুর ঘটনায় উদ্বেগ, পদক্ষেপ চাইলেন জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবিক সুরক্ষা জোরদার, মানব পাচার প্রতিরোধ এবং আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগরে প্রাণহানির ঘটনা বন্ধে জরুরি ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলেছেন, রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু বাংলাদেশের নয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও এ দায়িত্ব ভাগ করে নিতে হবে।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর) ওয়েবসাইটে বুধবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রহীন ও বাস্তুচ্যুত অবস্থায় জীবনযাপন করায় রোহিঙ্গারা ক্রমেই মানব পাচারকারী চক্রের সহজ লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠছেন। বিশেষ করে নারী, শিশু ও তরুণেরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।

সমুদ্রপথে প্রাণহানির উদ্বেগজনক চিত্র

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুন মাসের শেষ দিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে ছেড়ে আসা দুটি নৌযান উপকূলের কাছে ডুবে যায়। এসব নৌযানে ৫০০–এর বেশি যাত্রী ছিলেন, যাঁদের অধিকাংশই রোহিঙ্গা। তাঁদের মধ্যে অনেকে বাংলাদেশের কক্সবাজারের শরণার্থীশিবির থেকেও যাত্রা করেছিলেন বলে জানা গেছে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথে যাত্রা করেছেন সাড়ে ৬ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা। তাঁদের মধ্যে আনুমানিক ৯০০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। অর্থাৎ প্রতি সাতজন যাত্রীর মধ্যে একজন মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগরের এই রুট বিশ্বে শরণার্থী ও অভিবাসীদের ব্যবহৃত সবচেয়ে প্রাণঘাতী সমুদ্রপথগুলোর একটি।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সমুদ্রপথে যাত্রা করা রোহিঙ্গাদের প্রায় ৬৬ শতাংশই নারী ও শিশু, যা এই সংকটের মানবিক মাত্রাকে আরও গভীর করেছে।

সীমিত সুযোগ বাড়াচ্ছে পাচারের ঝুঁকি

বর্তমানে বাংলাদেশ প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। তবে শরণার্থীশিবিরে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, জীবিকা এবং নিরাপদ অভিবাসনের সুযোগ সীমিত থাকায় অনেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাচারকারীদের প্রলোভনে পা দিচ্ছেন।

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এই সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগিয়ে সক্রিয় রয়েছে মানব পাচারকারী চক্র এবং বিভিন্ন সশস্ত্র অপরাধী গোষ্ঠী। তারা চাকরি, উচ্চশিক্ষা, উন্নত জীবনের সুযোগ কিংবা বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে রোহিঙ্গা শিশু, কিশোর ও তরুণদের পাচার করছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব তরুণকে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, শরণার্থীশিবিরে বসবাসরত নারী ও কন্যাশিশুরা পাচার, যৌন শোষণ এবং জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছেন। বিদ্যমান তথ্য অনুযায়ী, প্রতি চারজন নারী বা কন্যাশিশুর মধ্যে প্রায় একজন কোনো না কোনো ধরনের লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন।

উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরাও পাচ্ছেন না প্রয়োজনীয় সহায়তা

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা জানান, আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগর থেকে উদ্ধার হওয়া রোহিঙ্গাদের, এমনকি শিশুদেরও, অনেক সময় কয়েক দিন থানায় আটকে রাখা হয়।

পরিবারের সদস্যদের মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার মতো ভয়াবহ মানসিক আঘাতের মধ্যেও তাঁরা প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কিংবা চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাঁদের ভাষ্য, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের সহায়তায় বিভিন্ন মানবিক সংস্থা কাজ করলেও এসব সংস্থাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক তহবিলে বড় ধরনের কাটছাঁট হওয়ায় মানবিক সহায়তা কার্যক্রমও আগের তুলনায় সীমিত হয়ে পড়েছে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, রোহিঙ্গাদের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার জন্য শুধু মানবিক সহায়তা যথেষ্ট নয়। তাঁদের রাষ্ট্রহীনতার অবসান ঘটানো এবং শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, চলাচলের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তাসহ মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

একই সঙ্গে তাঁরা মানব পাচার প্রতিরোধে আরও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, পাচারের শিকার ব্যক্তিদের মানবাধিকারসম্মত ও জেন্ডার-সংবেদনশীল সহায়তা নিশ্চিত করা এবং ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।

বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত

জাতিসংঘ জানিয়েছে, এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী বিশেষজ্ঞদের মধ্যে রয়েছেন নারী ও শিশু পাচারবিষয়ক বিশেষ র‌্যাপোর্টিয়ার সিওভান মুল্যালি, অভিবাসীদের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষ র‌্যাপোর্টিয়ার জেহাদ মাদি এবং নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্যবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপের সভাপতি ক্লদিয়া ফ্লোরেস। এছাড়া সহসভাপতি ইভানা ক্রটিচ এবং সদস্য ডরোথি এস্ত্রাদা-ট্যাঙ্ক, হাইনা লু ও লরা নিরিনকিন্দিও এই আহ্বানে অংশ নিয়েছেন।

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের মতে, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান নিশ্চিত করতে হলে মানবিক সহায়তার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার এবং পাচার প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ এখন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স