প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)–নির্ভর পরিবর্তনের ফলে বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যম, সাংবাদিকতা ও কনটেন্ট তৈরির ধরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সংবাদ আর কেবল সংবাদপত্র বা টেলিভিশনের পর্দায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং স্মার্টফোননির্ভর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মই এখন তথ্যপ্রাপ্তির অন্যতম প্রধান মাধ্যম। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় তরুণদের ডিজিটাল তথ্য প্রকাশ, দায়িত্বশীল কনটেন্ট তৈরি এবং সৃজনশীল অর্থনীতিতে (ক্রিয়েটর ইকোনমি) ক্যারিয়ার গঠনের জন্য প্রস্তুত করতে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘টিকটক মাস্টারক্লাস: সাংবাদিকতা ও ডিজিটাল গল্প বলা’ শীর্ষক একটি সেমিনার।
গত ২৮ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া, কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগ–এর সহযোগিতায় এবং ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম টিকটকের শিক্ষামূলক উদ্যোগের অংশ হিসেবে এ সেমিনার ও মাস্টারক্লাসের আয়োজন করা হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের সামনে আধুনিক সাংবাদিকতা, ডিজিটাল স্টোরিটেলিং, তথ্য যাচাই, কনটেন্ট নির্মাণ এবং সৃজনশীল অর্থনীতিতে ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়।
এআই যুগে সাংবাদিকতার নতুন বাস্তবতা
সেমিনারের মূল সেশন পরিচালনা করেন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রফেশনাল ফেলো ও গবেষক জাহিদ হোসাইন খান। তিনি বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে বর্তমান নিউজরুমের চ্যালেঞ্জ, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
তিনি বলেন, বর্তমান সময়ের অনিশ্চয়তা তরুণদের জন্য নতুন সম্ভাবনারও দ্বার খুলে দিচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের কারণে কনটেন্ট ক্রিয়েশন ও সাংবাদিকতার প্রচলিত ধারা আমূল বদলে যাচ্ছে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থাতেই শিক্ষার্থীদের এআই–নির্ভর প্রযুক্তি ও ডিজিটাল দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে নিজেদের পেশাগত ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সৃজনশীল অর্থনীতি নিয়ে বর্তমানে সরকারও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করছে। ফলে এই খাতে দক্ষ জনবল তৈরির সুযোগ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।
সেশনে তিনি শিক্ষার্থীদের সামনে সংবাদ নির্বাচন, নৈতিক সাংবাদিকতা, তথ্য যাচাই (ফ্যাক্ট-চেকিং), ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংবাদ উপস্থাপন এবং পরিবর্তিত প্রযুক্তিনির্ভর পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার বিভিন্ন কৌশল তুলে ধরেন।
শিক্ষা ও কর্মজীবনের সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব
অনুষ্ঠানে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ–উপাচার্য অধ্যাপক নেছার উদ্দিন আহমেদ বলেন, স্মার্টফোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির কারণে বর্তমান বিশ্ব অভূতপূর্ব গতিতে পরিবর্তিত হচ্ছে। এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু শিক্ষাক্ষেত্রে নয়, প্রায় প্রতিটি পেশায় দৃশ্যমান।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েই শিক্ষার্থীদের যদি বৈশ্বিক পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ কর্মবাজার সম্পর্কে সচেতন করা যায়, তাহলে তারা অনিশ্চয়তাকে দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া, কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগের চেয়ারম্যান মো. হারিসুর রহমান বলেন, সৃজনশীল পেশার পরিধি দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও এ বিষয়ে আগ্রহী। বাস্তব অভিজ্ঞতা ও শিল্পখাতের চাহিদার সঙ্গে পরিচিত করিয়ে দিতে বিশ্ববিদ্যালয় নিয়মিত এ ধরনের আয়োজন করছে।
কনটেন্ট প্রতিযোগিতায় বিজয়ী তিন দল
সেমিনারের অংশ হিসেবে তথ্যভিত্তিক কনটেন্ট নির্মাণ নিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বিশেষ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।
এ প্রতিযোগিতায় চেঞ্জমেকারস, নকশা এবং আর্টিফিস—এই তিনটি দল বিজয়ী হয়। মোট ১১ জন শিক্ষার্থী তাঁদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীলতা দিয়ে ভিন্নধর্মী ভিডিও কনটেন্ট উপস্থাপন করেন।
আয়োজকদের মতে, এ ধরনের প্রতিযোগিতা শিক্ষার্থীদের বাস্তবমুখী দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি ডিজিটাল গল্প বলার কৌশল আয়ত্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাস্তব অভিজ্ঞতার বিকল্প নেই
বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া, কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগের শিক্ষক শরীফুল ইসলাম ইমশিয়াত বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর নতুন বাস্তবতায় শিক্ষার্থীদের সামনে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রথাগত পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানের পাশাপাশি বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনই ভবিষ্যতের সৃজনশীল পেশায় সফল হওয়ার অন্যতম শর্ত। প্রযুক্তিগত পরিবর্তনকে ভয় না পেয়ে সেটিকে নতুন সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা
মাস্টারক্লাসে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরাও এই আয়োজনকে সময়োপযোগী ও কার্যকর বলে অভিহিত করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. মুহতাসিবুর রহমান ছামীন বলেন, এই মাস্টারক্লাসের মাধ্যমে তাঁরা সৃজনশীল ক্যারিয়ারের বাস্তব চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পেরেছেন। একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষের তাত্ত্বিক জ্ঞান এবং বাস্তব কর্মক্ষেত্রের মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, তা কীভাবে কমিয়ে আনা যায় সে সম্পর্কেও বাস্তবভিত্তিক দিকনির্দেশনা পেয়েছেন।
আরেক শিক্ষার্থী রনক সরদার বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে শুধু বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে নয়, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা এবং সম্ভাবনাময় পেশাগত প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও ব্যবহার করা যায়—এই বিষয়টি সেমিনারে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
শিক্ষার্থী মাঈদা মুনতাহা বলেন, ডিজিটাল স্টোরিটেলিংয়ে ভুয়া তথ্য শনাক্ত করা এবং তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের যেসব কৌশল শেখানো হয়েছে, তা ভবিষ্যতে পেশাগত জীবনে অত্যন্ত কার্যকর হবে।
ক্রিয়েটর ইকোনমির নতুন সম্ভাবনা
সেমিনারে বক্তারা বলেন, বর্তমান বিশ্বে কনটেন্ট ক্রিয়েশন ও ডিজিটাল মিডিয়া আর কেবল ব্যক্তিগত শখের বিষয় নয়; এটি একটি শক্তিশালী বৈশ্বিক ক্রিয়েটর ইকোনমি বা সৃজনশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে।
তাঁদের মতে, সঠিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, নৈতিকতা এবং তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারলে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।
বক্তারা আরও বলেন, বিশ্বমানের মেধা, প্রযুক্তি এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার সমন্বয়ে আগামী দিনের ডিজিটাল স্টোরিটেলিং ও কনটেন্ট নির্মাণ আরও শক্তিশালী, বিশ্বাসযোগ্য এবং অর্থবহ হয়ে উঠবে। সেই লক্ষ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পখাতের মধ্যে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তাঁরা।