পাঁচ দিনের বিরতির পর আবারও ইরানে বড় ধরনের সামরিক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার রাতের এই হামলার পর পাল্টা জবাব হিসেবে কুয়েত ও জর্ডানে হামলার দাবি করেছে ইরান। একই সময়ে গাজা, লেবানন, সিরিয়া ও ইরাকে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি ঘিরে পাল্টাপাল্টি হুমকি ও সামরিক তৎপরতা বাড়ায় আঞ্চলিক যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রয়টার্স ও আল–জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক হামলা–পাল্টা হামলার ফলে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মুখোমুখি অবস্থানই নয়, বরং সৌদি আরব, ইসরায়েল, হুতি বিদ্রোহী, ইরাকভিত্তিক ইরানপন্থী মিলিশিয়া এবং উপসাগরীয় দেশগুলোকেও সংঘাতের নতুন পর্বে জড়িয়ে ফেলেছে।
আলোচনার আশার মধ্যেই নতুন হামলা
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা ‘ভালো’ চলছে। তেহরানও কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত থাকার কথা জানিয়েছিল। তবে সেই আশার মধ্যেই বুধবার রাতে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে ইরানে হামলা চালায়।
হামলার আগে ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বলেন, ‘আমরা ওদের ওপর কঠোর হামলা চালাব। ওরা কঠিন শাস্তি পাবে।’
এর জবাবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানায়, যত দিন যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি থাকবে, তত দিন নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে তেহরান।
আইআরজিসির সদস্য নিহত, বিভিন্ন শহরে হামলা
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, জর্ডানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলার প্রতিশোধ হিসেবেই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। ভবিষ্যৎ সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে ৫০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
ইরানের বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, নতুন হামলায় কেশম দ্বীপে তিনজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। জানজান প্রদেশে নিহত হয়েছেন আইআরজিসির তিন সদস্য। এছাড়া বুশেহর, জাম, খোরমোজ, আহভেজ, বন্দর আব্বাস, কিশ দ্বীপসহ একাধিক স্থানে হামলার খবর পাওয়া গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের সমালোচনা করে কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের গবেষক ট্রিটা পারসি বলেন, এই হামলার মাধ্যমে ট্রাম্পের কৌশলগত লক্ষ্য স্পষ্ট নয়। তাঁর মতে, প্রতিশোধ নেওয়া ছাড়া এর অন্য কোনো উদ্দেশ্য দেখা যাচ্ছে না এবং এটি সংঘাত আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
কুয়েত ও জর্ডানে পাল্টা হামলা
মার্কিন হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কুয়েত ও জর্ডান লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করে আইআরজিসি।
তাদের দাবি, কুয়েতের আলী আল–সালেম বিমানঘাঁটিতে হামলায় মার্কিন সেনাদের ব্যবহৃত দুটি ড্রোন হ্যাঙ্গার এবং একটি জ্বালানি সংরক্ষণাগার ধ্বংস হয়েছে।
তবে কুয়েত সরকার জানিয়েছে, হামলায় একটি চীনা প্রতিষ্ঠানের বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সেখানে কর্মরত একজন শ্রমিক নিহত হয়েছেন।
একই সঙ্গে জর্ডানের আল–আজরাক বিমানঘাঁটিতে হামলারও দাবি করেছে আইআরজিসি।
তিনটি এফ–৩৫ যুদ্ধবিমান ধ্বংসের দাবি
ইরানের দাবি, জর্ডানের আল–আজরাক ঘাঁটিতে হামলায় তিনটি মার্কিন এফ–৩৫ যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে এবং আরও তিনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র এই দাবি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। বিশ্বের অন্যতম আধুনিক যুদ্ধবিমান হিসেবে পরিচিত এফ–৩৫ ধ্বংসের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো স্বাধীন সূত্র থেকে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
সৌদি আরবও সংঘাতে সক্রিয়
এদিকে বুধবার দিনের বেলায় প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে ইরাকে সামরিক অভিযান চালিয়েছে সৌদি আরব।
এর আগে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে পড়ে রিয়াদ। একই সময়ে ইরাকভিত্তিক ইরানপন্থী মিলিশিয়াদের ড্রোন হামলাও মোকাবিলা করতে হয়েছে দেশটিকে।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরব দীর্ঘদিন সংঘাত এড়িয়ে চললেও এখন আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হচ্ছে।
লেবানন ও গাজায়ও হামলা
ইসরায়েল একই সময়ে দক্ষিণ লেবাননে নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে। আল–মানসুরি, মাজদাল জৌন ও মাজরাত বুয়ুত আল–সিয়াদ এলাকায় রাতভর বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। পাশাপাশি সিরিয়ার কুনেইতরা এলাকাতেও হামলার খবর পাওয়া গেছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার আরও কয়েকজন নিহত হওয়ার পর উপত্যকাটিতে ইসরায়েলি অভিযানে মোট নিহতের সংখ্যা ৭৩ হাজার ৩৪১ জনে পৌঁছেছে।
জাতিসংঘের উদ্বেগ
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সংঘাতের বিস্তার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
মহাসচিবের মুখপাত্র ফারহান হক বলেন, আলোচনায় ফিরতে ব্যর্থ হলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কার কথা মহাসচিব আগেই জানিয়েছিলেন। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই আশঙ্কাকেই সত্য প্রমাণ করছে এবং পরিস্থিতি কোনো ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে না।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে অচলাবস্থা
সংঘাতের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিরোধ এখনও কাটেনি।
ওমানের মধ্যস্থতায় আলোচনা চললেও কোনো সমাধান হয়নি। ইরান চায় তাদের নির্ধারিত রুট ব্যবহার করে জাহাজ চলাচল হোক, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণাঞ্চলীয় বিকল্প নৌপথ ব্যবহারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকাণ্ড, ইরানি জাহাজে হামলা এবং বন্দর অবরোধের কারণেই বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে নৌপরিবহন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত
যুদ্ধ পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলেও কূটনৈতিক তৎপরতা পুরোপুরি থেমে যায়নি।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে নতুন করে আলোচনার উদ্যোগ চলছে। পাশাপাশি ওমানও হরমুজ প্রণালি ইস্যুতে পৃথকভাবে ইরানের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রেখেছে।
তবে গবেষক ট্রিটা পারসির মতে, উভয় পক্ষই এখনো মনে করছে আরও সামরিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে তারা আলোচনায় শক্তিশালী অবস্থান অর্জন করতে পারবে। ফলে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা আপাতত অনিশ্চিত থাকলেও শেষ পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমেই এই সংঘাতের সমাধান খুঁজতে হবে।