ঢাকা

হামলায় বাঁ চোখে অস্ত্রোপচার, ডান চোখের দৃষ্টিও ঝাপসা—হবিগঞ্জের আহতের বর্ণনা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
হবিগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচিতে হামলার ঘটনায় গুরুতর আহত জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতা আলিফ চৌধুরীর বাঁ চোখে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। বর্তমানে রাজধানীর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল-এ চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি। চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে থাকলেও তাঁর বাঁ চোখের দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। এদিকে ডান চোখেও তিনি ঝাপসা দেখছেন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) বিকেলে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, অস্ত্রোপচারের পর আলিফের বাঁ চোখে ব্যান্ডেজ বাঁধা। ডান চোখটি খোলা থাকলেও স্পষ্টভাবে দেখতে পারছিলেন না। কথা বলতেও কষ্ট হচ্ছিল তাঁর। এ সময় প্রতিবেদকের হাত ধরে তিনি বলেন, ‘আমার জন্য দোয়া করবেন।’

হামলার পর ঢাকায় এনে অস্ত্রোপচার

আলিফ চৌধুরী জাতীয় ছাত্রশক্তি-এর হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলা শাখার সংগঠক। তিনি নবীগঞ্জের হোমল্যান্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজের উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।

গত মঙ্গলবার হবিগঞ্জে এনসিপির নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার সময় তাঁর চোখে গুরুতর আঘাত লাগে। পরদিন উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঢাকায় আনা হয়। বৃহস্পতিবার সকালে চিকিৎসকদের মেডিক্যাল বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁর বাঁ চোখে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়।

‘আমার দৃষ্টিশক্তি কি ফিরে আসবে?’

বিকেলে হাসপাতালে আলিফের কেবিনে গিয়ে দেখা যায়, তিনি চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছেন। সামনে কেউ গেলে ডান চোখের পাতা আঙুল দিয়ে খুলে দেখার চেষ্টা করেন। তবে স্পষ্টভাবে দেখতে পারছিলেন না।

কক্ষের উজ্জ্বল আলোতেও তাঁর অস্বস্তি হচ্ছিল। তিনি ইশারায় কক্ষের বাতি নিভিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন। তাঁর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আলিফ প্রশ্ন করেন, ‘আমার দৃষ্টিশক্তি কি ফিরে আসবে?’ এরপর নিজেই বলেন, ‘না এলেও সমস্যা নাই।’ একই সঙ্গে হাতের ইশারায় জানান, তিনি মানসিকভাবে দৃঢ় থাকার চেষ্টা করছেন।

‘আমি কারও ওপর হামলা করতে যাইনি’

হাসপাতালের কক্ষে উপস্থিত এনসিপি ও ছাত্রশক্তির নেতাদের উদ্দেশে আলিফ ভাঙা কণ্ঠে বলেন, তিনি কাউকে আক্রমণ করতে যাননি।

তিনি বলেন, দেশে শান্তিপূর্ণ ও সুস্থ ধারার রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হোক। রাজনৈতিক মতভেদের কারণে সহিংসতা ও সংঘর্ষের অবসান হওয়া উচিত। তাঁর মতো আর কাউকে যেন চোখ হারানোর পরিস্থিতিতে পড়তে না হয়, সেই প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।

চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে

এনসিপির চিকিৎসক সংগঠন ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্স-এর সদস্যসচিব ডা. আবদুল আহাদ হাসপাতালের সামনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আলিফের চিকিৎসার অগ্রগতি তুলে ধরেন।

তিনি জানান, বৃহস্পতিবার সকালে মেডিক্যাল বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। তাঁর দাবি, আলিফের বাঁ চোখের দৃষ্টিশক্তি আর ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। একই সঙ্গে ডান চোখেও তিনি ঝাপসা দেখছেন।

তবে আলিফের চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অস্ত্রোপচারের পর এখনই চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

তিনি জানান, আলিফের বাঁ চোখে ব্যাপক (এক্সটেনসিভ) আঘাত লেগেছে। শুক্রবার পর্যন্ত পর্যবেক্ষণের পর তাঁর চোখের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত মতামত দেওয়া যাবে।

দেখতে গেলেন এনসিপির শীর্ষ নেতারা

বৃহস্পতিবার বিকেলে হাসপাতালে আলিফকে দেখতে যান এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন, দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়াসহ কেন্দ্রীয় নেতারা।

পরে হাসপাতালের সামনে সংবাদ সম্মেলন করে তাঁরা হামলার ঘটনার নিন্দা জানান এবং আহত শিক্ষার্থীর চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিয়ে সরকারের প্রতি বিভিন্ন দাবি উত্থাপন করেন।

পরিবারের একমাত্র ভরসা ছিলেন আলিফ

এনসিপির নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আলিফের পারিবারিক পরিস্থিতিও অত্যন্ত কঠিন।

তাঁদের দাবি, আলিফের বাবা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ এবং হাঁটতে পারেন না। তাঁর মা একজন প্রতিবন্ধী। দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে এবং বড় ভাইও পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার অবস্থায় নেই।

এ অবস্থায় উচ্চমাধ্যমিকে পড়াশোনার পাশাপাশি আউটসোর্সিং ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে আয় করে পরিবারের ব্যয় বহন করতেন আলিফ।

সরকারের কাছে তিন দফা দাবি

সংবাদ সম্মেলনে এনসিপি সরকারের কাছে তিন দফা দাবি তুলে ধরে।

দাবিগুলো হলো—

আলিফ চৌধুরীর চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয় রাষ্ট্রীয়ভাবে বহন এবং তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান।
হবিগঞ্জের হামলায় জড়িত বলে অভিযুক্ত ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপির নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনা।
এনসিপিসহ অন্যান্য গণতান্ত্রিক বিরোধী রাজনৈতিক দলের কর্মসূচির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনে বাধাহীন পরিবেশ সৃষ্টি করা।

উল্লেখ্য, এই প্রতিবেদনে হামলার ঘটনায় এনসিপির অভিযোগ, চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ এবং দলটির দাবিগুলো তুলে ধরা হয়েছে। হামলার দায়ে অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য বা প্রতিক্রিয়া এতে অন্তর্ভুক্ত নয়।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স