ঢাকা

দলবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ, ২০ এমপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে অভিষেক

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতীকে নির্বাচিত হয়ে দল ছেড়ে নতুন রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়া ২০ সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, তৃণমূলের প্রতীকে নির্বাচিত হওয়ার পর ওই সংসদ সদস্যরা অন্য একটি দলে যোগ দিয়ে লোকসভায় আলাদাভাবে বসছেন। ফলে তাঁদের সংসদ সদস্য পদ বহাল রাখার সুযোগ নেই।

গতকাল সোমবার সুপ্রিম কোর্টে করা আবেদনে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তিনি বিদ্রোহী ২০ সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে দলবিরোধী আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বিকল্প হিসেবে তাঁদের লোকসভায় আলাদাভাবে বসার অনুমতি বাতিল করে তৃণমূলের ২৮ সংসদ সদস্যের জন্য নির্ধারিত আসনেই বসানোর নির্দেশ দেওয়ার আবেদন করেছেন।

এই আবেদনের মধ্য দিয়ে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট এখন সংসদীয় পরিসর ছাড়িয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়াল।

স্পিকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তৃণমূলের

লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের মোট ২৮ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২০ জন বিদ্রোহ করে ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অব ইন্ডিয়া—এনসিপিআই নামের একটি নতুন আঞ্চলিক দলে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বলে তৃণমূলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে।

বিদ্রোহী সংসদ সদস্যরা লোকসভায় আলাদাভাবে বসার জন্য স্পিকার ওম বিড়লার কাছে আবেদন করেন। স্পিকার তাঁদের আলাদাভাবে বসার অনুমতি দিয়েছেন। তবে তাঁদের এনসিপিআইয়ের সংসদ সদস্য হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।

ফলে একদিকে তাঁরা লোকসভায় তৃণমূলের নির্ধারিত আসন থেকে আলাদা হয়ে বসছেন, অন্যদিকে নতুন রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁদের অবস্থানও এখনো স্পিকারের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির অপেক্ষায় রয়েছে।

এই পরিস্থিতিকেই চ্যালেঞ্জ করেছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।

তাঁর যুক্তি, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতীকে নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্য নির্বাচনের পর সেই দল ছেড়ে অন্য দলে যোগ দিলে তাঁর বিরুদ্ধে দলবিরোধী আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্ন ওঠে। সেই অবস্থায় তাঁদের সংসদ সদস্য পদ বহাল রেখে আলাদাভাবে বসার অনুমতি দেওয়ার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

প্রথমে স্পিকারের কাছে, পরে সুপ্রিম কোর্টে

বিদ্রোহী সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথমে লোকসভার স্পিকারের দ্বারস্থ হন।

গত ১৯ জুন তিনি স্পিকারের কাছে এ বিষয়ে আবেদন করেন। এরপর তাঁর আবেদনের বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ২৭ জুলাই এবং ১২ আগস্ট আবারও স্মরণ করিয়ে দেন।

তৃণমূলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, বারবার আবেদন করার পরও স্পিকারের কাছ থেকে প্রত্যাশিত ব্যবস্থা পাওয়া যায়নি। এরপরই বিষয়টি আদালতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন অভিষেক।

গত সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে এ বিষয়ে মামলা করার অনুমতি দেন। সেই অনুমতির পর সোমবার সর্বোচ্চ আদালতে আবেদন করেন তিনি।

এখন আদালতে মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—তৃণমূলের প্রতীকে নির্বাচিত হয়ে অন্য রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়া সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে দলবিরোধী আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে স্পিকারের ভূমিকা কী এবং তাঁদের আলাদাভাবে বসার অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত কতটা আইনসম্মত।

২০ এমপির বিরুদ্ধে কী দাবি অভিষেকের?

সুপ্রিম কোর্টে করা আবেদনে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় মূলত দুটি বিকল্প দাবি জানিয়েছেন।

প্রথমত, তৃণমূলের প্রতীকে নির্বাচিত ২০ সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে দলবিরোধী আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং তাঁদের সংসদ সদস্য পদ খারিজ করা।

দ্বিতীয়ত, যদি আদালত তাঁদের সদস্যপদ বাতিলের বিষয়ে সরাসরি কোনো নির্দেশ না দেয়, তাহলে অন্তত লোকসভায় আলাদাভাবে বসার অনুমতি বাতিল করে তাঁদের তৃণমূলের ২৮ সংসদ সদস্যের জন্য নির্ধারিত আসনে বসানোর ব্যবস্থা করা।

অর্থাৎ তৃণমূলের অবস্থান স্পষ্ট—দলের প্রতীকে নির্বাচিত হয়ে অন্য রাজনৈতিক পরিচয়ে লোকসভায় আলাদাভাবে বসার সুযোগ কোনোভাবেই দেওয়া উচিত নয়।

বিদ্রোহ মেনে নেয়নি তৃণমূল

২০ সংসদ সদস্যের এই পদক্ষেপকে তৃণমূল কংগ্রেস দলীয় বিদ্রোহ হিসেবেই দেখছে। দলের বক্তব্য, নির্বাচনে তৃণমূলের প্রতীক ও প্রার্থী হিসেবে ভোট নিয়ে জয়ী হওয়ার পর সংসদ সদস্যরা দল পরিবর্তন করতে পারেন না।

দলটির অভিযোগ, বিদ্রোহী সংসদ সদস্যরা তৃণমূলের রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে নির্বাচিত হওয়ার পর এখন অন্য একটি রাজনৈতিক দলের হয়ে সংসদে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এ কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে দলবিরোধী আইনে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার মধ্য দিয়ে সেই রাজনৈতিক অবস্থানই এখন আইনি লড়াইয়ের রূপ পেয়েছে।

বিধানসভা থেকে লোকসভায় বিদ্রোহ

তৃণমূলের বর্তমান সংকটের শিকড় চলতি বছরের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন পর্যন্ত গড়িয়েছে।

নির্বাচনের আগে দুর্নীতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচার চালায় বিজেপি। ২৯৪ আসনের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ২০৮টি আসনে জয় পায়। তৃণমূল কংগ্রেস পায় ৮০টি আসন।

নির্বাচনের পর তৃণমূলের ভেতরে বিদ্রোহ দেখা দেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর প্রভাব দ্রুত বিধানসভাতেও পড়ে।

তৃণমূলের ৮০ বিধায়কের মধ্যে অন্তত ৭০ জন বিদ্রোহ করে আলাদা তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করে বিধানসভায় যোগ দেন বলে দাবি করা হয়েছে। পরে বিদ্রোহী দলের নেতা বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বিধানসভায় বিরোধী দলের নেতা হন।

তাঁর নেতৃত্বে বিদ্রোহী বিধায়কেরা আলাদা বিরোধী জোট হিসেবে বিধানসভার অধিবেশনে অংশ নিচ্ছেন বলে দাবি করা হয়েছে।

এই নজিরই পরবর্তী সময়ে সংসদীয় রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলেছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।

বিধানসভার পর লোকসভাতেও বড় ধাক্কা

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় তৃণমূলের ভেতরে বিদ্রোহের পর একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয় লোকসভায়।

তৃণমূলের ২৮ সংসদ সদস্যের মধ্যে ২০ জন নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপিআইয়ে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দেন। এরপর তাঁরা লোকসভায় আলাদাভাবে বসার আবেদন করেন।

স্পিকার তাঁদের আলাদাভাবে বসার অনুমতি দেওয়ায় তৃণমূলের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। তবে স্পিকার তাঁদের এনসিপিআইয়ের সংসদ সদস্য হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দেওয়ায় বিষয়টি পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি।

এখন সেই সিদ্ধান্তের আইনগত বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।

দলবিরোধী আইনই এখন মূল প্রশ্ন

ভারতের সংসদীয় রাজনীতিতে দলবদল ঠেকাতে দলবিরোধী আইন গুরুত্বপূর্ণ একটি বিধান। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচনের পর দল পরিবর্তন করলে তাঁদের সদস্যপদ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

তৃণমূলের ২০ সংসদ সদস্যের ক্ষেত্রে সেই আইন কীভাবে প্রযোজ্য হবে, তাঁদের দলত্যাগের ধরন কী এবং নতুন দলে যোগ দেওয়ার পরও তাঁরা সংসদ সদস্য হিসেবে বহাল থাকতে পারেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন আদালতের সামনে আসতে পারে।

তবে সংসদ সদস্যদের দলত্যাগ সংক্রান্ত বিষয়ে লোকসভার স্পিকারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় অভিষেকের আবেদনে স্পিকারের সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপও আইনি পর্যালোচনার কেন্দ্রে এসেছে।

রাজনৈতিক সংঘাত এখন আদালতের মঞ্চে

তৃণমূলের এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব শুধু দলীয় রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিধানসভায় বিদ্রোহ, লোকসভায় ২০ সংসদ সদস্যের দলত্যাগের ঘোষণা এবং তাঁদের আলাদাভাবে বসার অনুমতি—সব মিলিয়ে এটি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটি বড় সাংগঠনিক সংকট তৈরি করেছে।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার ফলে সেই সংকট এখন সাংবিধানিক ও সংসদীয় আইনের প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে।

একদিকে তৃণমূল চাইছে বিদ্রোহী সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে দলবিরোধী আইন কার্যকর হোক; অন্যদিকে স্পিকার তাঁদের আলাদাভাবে বসার অনুমতি দিলেও নতুন দলের সংসদ সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি দেননি। ফলে ২০ সংসদ সদস্যের ভবিষ্যৎ অবস্থান এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

সুপ্রিম কোর্টে করা অভিষেকের আবেদনের শুনানিতে এই প্রশ্নগুলোর আইনি ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে আদালতের সিদ্ধান্ত ভারতের সংসদীয় রাজনীতিতে দলত্যাগ, দলবিরোধী আইন এবং স্পিকারের ক্ষমতা নিয়ে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বিতর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স