ঢাকা

নিজ দলের এমপির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন, ব্যবস্থা চাইল আদিতমারী বিএনপি

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
লালমনিরহাট-২ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য রোকন উদ্দিন বাবুলের বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলা অমান্য, দলীয় কর্মকাণ্ডে সমন্বয়হীনতা, অনিয়ম এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ তুলেছেন আদিতমারী উপজেলা বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের একাংশের নেতারা। এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

সোমবার বিকেল পাঁচটায় আদিতমারী উপজেলা বিএনপি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তোলা হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যের শিরোনাম ছিল—‘সংসদ সদস্য রোকন উদ্দিন বাবুলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন’।

উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব সালেকুজ্জামান প্রামাণিক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে রোকন উদ্দিন দলের স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় না করে নিজের মতো করে দলীয় কর্মকাণ্ড ও উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এর ফলে আদিতমারীতে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল হচ্ছে এবং দলের তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংসদ সদস্য রোকন উদ্দিন। তিনি দাবি করেছেন, তাঁকে রাজনৈতিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করা এবং মঙ্গলবার আদিতমারীতে তাঁর আহ্বান করা নির্বাচন-পরবর্তী কর্মী মূল্যায়ন সভা বানচাল করার উদ্দেশ্যেই তাঁর বিরুদ্ধে অসত্য অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে।

‘দলের সঙ্গে কোনো সমন্বয় করেন না’

সংবাদ সম্মেলনে সালেকুজ্জামান প্রামাণিক বলেন, রোকন উদ্দিন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে স্থানীয় বিএনপির সঙ্গে কোনো ধরনের সমন্বয় করছেন না। তিনি নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সালেকুজ্জামানের অভিযোগ, জাতীয় পার্টি, কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী এবং বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহলের সঙ্গে যোগসাজশ করে সংসদ সদস্য ইচ্ছেমতো উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন। এতে এলাকায় বিএনপির রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।

তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সংবাদ সম্মেলনে কোনো নির্দিষ্ট নথি বা প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে কি না, তা বক্তব্যে স্পষ্ট করা হয়নি।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, সংসদ সদস্যের কর্মকাণ্ডে আদিতমারী উপজেলা বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা মর্মাহত। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ, দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে রোকন উদ্দিনের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দলের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

কর্মী মূল্যায়ন সভা নিয়েও বিরোধ

সংবাদ সম্মেলনে রোকন উদ্দিনের বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ তোলা হয়—ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তিনি দলের নেতা-কর্মীদের নিয়ে কোনো মূল্যায়ন সভা করেননি এবং এলাকার সাধারণ মানুষের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎও করেননি।

এর মধ্যেই দলের কেন্দ্রীয় ও রংপুর বিভাগীয় নির্দেশনা অমান্য করে মঙ্গলবার বিকেলে আদিতমারী জিএস মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে একটি সভা আহ্বান করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন স্থানীয় বিএনপির নেতারা।

তাঁদের দাবি, সভাটি দলের নাম ব্যবহার করে আয়োজন করা হলেও উপজেলা বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের মূলধারার অনেক নেতা এ বিষয়ে অবগত নন। ফলে সভাটি দলীয়ভাবে অনুমোদিত কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত নেতারা এ সভাকে বিধিবহির্ভূত আখ্যা দিয়ে এর বিরোধিতা করেন এবং দলীয় সাংগঠনিক কাঠামো অনুসরণ করে কর্মসূচি পরিচালনার দাবি জানান।

দলীয় কার্যালয়ের তালা ভাঙার অভিযোগ

সংবাদ সম্মেলনে ১৫ আগস্টের একটি ঘটনাও তুলে ধরা হয়। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠান নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সকাল ১১টায় শেষ করা হয়।

এরপর স্থানীয় নেতাদের না জানিয়ে সংসদ সদস্যের নির্দেশে দুপুরে আদিতমারী উপজেলা বিএনপির দলীয় কার্যালয়ের তালা ভেঙে সেখানে আরেকটি সভা করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়।

স্থানীয় বিএনপির নেতাদের দাবি, দলীয় কার্যালয়ে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কারণে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। দলীয় সিদ্ধান্ত ও স্থানীয় সাংগঠনিক কাঠামো অনুসরণ না করে এ ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করলে দলের মধ্যে বিভাজন আরও বাড়তে পারে বলেও তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

‘বিএনপিকে বিভক্ত করার চেষ্টা’

লিখিত বক্তব্যে সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ এনে বলা হয়, নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য তিনি আদিতমারী বিএনপিকে বিভক্ত করেছেন। নিজেদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে দলীয় কাঠামো ভেঙে নিজস্ব অনুসারী তৈরির মাধ্যমে বিএনপিকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করা হয়।

স্থানীয় বিএনপির একাংশের নেতারা বলেন, সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো দলীয়ভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

তাঁরা আরও বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে দলের সাংগঠনিক ঐক্য বজায় রাখা না গেলে নির্বাচনী রাজনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডের পরিবর্তে দলীয় সিদ্ধান্ত ও সাংগঠনিক কাঠামো অনুসরণ করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার দাবি জানান তাঁরা।

যা বললেন সংসদ সদস্য রোকন উদ্দিন

অভিযোগের বিষয়ে মুঠোফোনে রোকন উদ্দিন বলেন, তাঁকে রাজনৈতিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যেই এসব অভিযোগ তোলা হয়েছে। একই সঙ্গে মঙ্গলবার বিকেলে আদিতমারীতে তাঁর আহ্বান করা নির্বাচন-পরবর্তী কর্মী মূল্যায়ন সভা বানচাল করার জন্য সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

রোকন উদ্দিন বলেন, সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত অধিকাংশ নেতা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় কৌশলে তাঁর বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁরা তাঁকে যেন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে না হয়, সেই অবস্থান নিয়েছিলেন। এখন তিনি সংসদ সদস্য হওয়ায় তাঁরা নানা অজুহাতে তাঁর বিরোধিতা করছেন।

তিনি তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে অসত্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করে এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।

তবে স্থানীয় বিএনপির নেতাদের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দিয়েছেন কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

লালমনিরহাট-২ আসনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

লালমনিরহাট-২ সংসদীয় আসনটি আদিতমারী ও কালীগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. ফিরোজ হায়দারকে পরাজিত করে বিএনপির প্রার্থী রোকন উদ্দিন নির্বাচিত হন।

নির্বাচনের পর স্থানীয় বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ও সংসদ সদস্যের ভূমিকা নিয়ে দলের একাংশের মধ্যে বিরোধ প্রকাশ্যে এল। এরই ধারাবাহিকতায় সোমবারের সংবাদ সম্মেলনে দলীয় শৃঙ্খলা, সাংগঠনিক সমন্বয় এবং উন্নয়ন কার্যক্রম নিয়ে একাধিক অভিযোগ তোলা হয়।

একদিকে স্থানীয় বিএনপির একাংশ সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছে, অন্যদিকে রোকন উদ্দিন এসব অভিযোগকে রাজনৈতিকভাবে তাঁকে হেয় করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। ফলে আদিতমারী উপজেলা বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ এখন প্রকাশ্য রাজনৈতিক বিতর্কে রূপ নিয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে যাঁরা ছিলেন

সংবাদ সম্মেলনে লালমনিরহাট জেলা বিএনপির সহসাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান হাবিব, উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক নাদিরুল ইসলাম, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি আবু ইয়াহিয়া ইউনুছ আহম্মেদ, উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক হাসানুল বান্না, সদস্যসচিব আবু বাক্কার, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক শাহারিয়ার আলম এবং উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আবদুল হালিমসহ বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

তাঁদের বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল সংসদ সদস্যের সঙ্গে স্থানীয় দলীয় নেতৃত্বের সমন্বয়হীনতা এবং সাংগঠনিক নিয়ম মেনে দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনার দাবি।

জেলা নেতৃত্বের বক্তব্য পাওয়া যায়নি

রোকন উদ্দিনের বিরুদ্ধে স্থানীয় বিএনপির একাংশের সংবাদ সম্মেলনের বিষয়ে লালমনিরহাট জেলা বিএনপির সভাপতি ও রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবিব দুলুর বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়।

তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে এ বিষয়ে প্রশ্ন পাঠানো হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁর কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

ফলে আদিতমারীর স্থানীয় বিএনপির একাংশের অভিযোগ, সংসদ সদস্যের পাল্টা বক্তব্য এবং জেলা নেতৃত্বের প্রতিক্রিয়া—এই তিনটি অবস্থানের মধ্যে আপাতত বিরোধটি প্রকাশ্যেই রয়ে গেছে।

স্থানীয় বিএনপির নেতাদের দাবি, বিষয়টি দলীয়ভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক। অন্যদিকে সংসদ সদস্যের বক্তব্য, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং দলীয় নেতৃত্বের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপরই এখন নির্ভর করছে আদিতমারী বিএনপির এ বিরোধ কোন দিকে গড়ায়।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স