ঢাকা

সরকারের ছয় মাসের কর্মকাণ্ডে প্রত্যাশা-প্রাপ্তির বড় ব্যবধান: চরমোনাই পীর

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
বর্তমান সরকারের প্রথম ছয় মাসে জনগণের প্রত্যাশা ও সরকারের কাছ থেকে পাওয়া বাস্তব ফলাফলের মধ্যে বিস্তর ফারাক দেখা যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম (চরমোনাই পীর)। তাঁর মতে, যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্ন থেকে গণ-অভ্যুত্থানের সৃষ্টি হয়েছিল, সেই প্রত্যাশা পূরণের ক্ষেত্রে সরকার এখনো কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। ফলে মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া আশার আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যাচ্ছে।

সোমবার এক বিবৃতিতে তিনি এসব কথা বলেন।

চরমোনাই পীর বলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছরে রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে জমে থাকা অনিয়ম, দুর্নীতি, বৈষম্য ও অব্যবস্থাপনা দূর করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকেই একটি গণ-অভ্যুত্থানের জন্ম হয়েছিল। সেই গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা ও স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিয়েই বর্তমান সরকার গঠিত হয়েছে। ফলে পরিবর্তনের সেই রক্তস্নাত পটভূমি বিবেচনায় নিলে সরকারের প্রথম ছয় মাসে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান দেখা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, জনগণের মধ্যে তৈরি হওয়া আশার আলো ক্রমেই ম্লান হয়ে আসছে।

ছয় মাস মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট, আবার কমও নয়

বর্তমান সরকারের কার্যক্রম মূল্যায়নে ছয় মাসকে একদিকে যথেষ্ট সময় নয়, অন্যদিকে একেবারে কম সময়ও নয় বলে মন্তব্য করেন ইসলামী আন্দোলনের আমির।

তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট শাসনের পর দায়িত্ব নেওয়া একটি নির্বাচিত সরকারের কর্মকাণ্ড মূল্যায়নের জন্য মাত্র ছয় মাসকে চূড়ান্ত সময় হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। সরকারের সামনে অনেক জটিলতা ও দীর্ঘদিনের জমে থাকা সমস্যা রয়েছে। ফলে সব ক্ষেত্রে এত অল্প সময়ে দৃশ্যমান সাফল্য অর্জন সম্ভব নাও হতে পারে।

তবে তাঁর মতে, ছয় মাসের মধ্যে একটি সরকারের উদ্যোগ, অগ্রাধিকার, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন এবং সংস্কারের পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। সে জায়গা থেকেই বর্তমান সরকারের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

চরমোনাই পীর বলেন, ছয় মাসে হয়তো সব সফলতা দেখা যাবে না, কিন্তু সরকার কোন পথে এগোচ্ছে এবং পরিবর্তনের জন্য কী ধরনের পদ্ধতি গ্রহণ করছে—তা স্পষ্ট হওয়ার কথা। সেই সূচনা ও পদ্ধতি বিবেচনা করেই সরকারের কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

সংস্কার নিয়ে হতাশা তৈরি হয়েছে

বিবৃতিতে সরকারের সংস্কার কার্যক্রম নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেন ইসলামী আন্দোলনের আমির। তাঁর দাবি, রাষ্ট্র সংস্কারের যে প্রত্যাশা জনগণের মধ্যে তৈরি হয়েছিল, বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ডে তার প্রতিফলন যথেষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, জুলাই সনদের ওপর অনুষ্ঠিত গণভোটকে কার্যত বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রকে ভবিষ্যতে আবার স্বৈরাচারী হয়ে ওঠা থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে যেসব অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল, সেগুলোও বাতিল করা হয়েছে।

চরমোনাই পীরের অভিযোগ, এসব অধ্যাদেশের বিকল্প হিসেবে কিছু ক্ষেত্রে নতুন আইন আনা হলেও তাতে আগের সমস্যার কার্যকর সমাধান হচ্ছে না। ফলে আইন ও সংস্কারের ক্ষেত্রে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ জুলাইয়ের মাঠে নেমে আসা অরাজনৈতিক ছাত্র-জনতার প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তিনি বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর মানুষের মধ্যে রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তন এবং ভবিষ্যতে স্বৈরতন্ত্রের পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেই প্রত্যাশা উপেক্ষা করা হলে তার রাজনৈতিক পরিণতি ভালো হবে না।

‘জনপ্রত্যাশা উপেক্ষা করলে আস্থা হারাবে’

ইসলামী আন্দোলনের আমির সতর্ক করে বলেন, জনগণ সব সময় রাজপথে আন্দোলনে নেমে প্রতিবাদ করবে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। মানুষ এখনই মাঠে না নামলেও রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি তাদের আস্থা হারিয়ে যেতে পারে।

তাঁর মতে, গণ-অভ্যুত্থানের পর জনগণের মধ্যে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করা প্রয়োজন। সেই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতা তৈরি হলে মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়তে পারে এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি বিশ্বাসের সংকট দেখা দিতে পারে।

তিনি বলেন, জনপ্রত্যাশাকে উপেক্ষা করার পরিণতি কখনো ভালো হয় না। তাই সরকারকে জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও জুলাইয়ের আন্দোলনের পটভূমিকে বিবেচনায় নিয়ে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হবে।

সরকারের কিছু উদ্যোগের প্রশংসাও

সরকারের সমালোচনার পাশাপাশি কিছু উদ্যোগ ও প্রচেষ্টার প্রশংসাও করেছেন চরমোনাই পীর। তিনি বলেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারের নেওয়া উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা প্রশংসার যোগ্য।

বিশেষ করে সরকারপ্রধানের দৃশ্যমান আচরণ এবং বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর ব্যস্ততা ভালো কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। সরকারের প্রধানের মতো অন্য যারা সরকারে দায়িত্ব পালন করছেন, তাঁদের কাছ থেকেও একই ধরনের সক্রিয়তা, আন্তরিকতা ও ব্যস্ততা প্রত্যাশা করেন ইসলামী আন্দোলনের আমির।

তাঁর বক্তব্যে সরকারের পুরো কর্মকাণ্ডকে ব্যর্থ হিসেবে দেখার পরিবর্তে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি বড় ধরনের নীতিগত ও বাস্তব পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি

চরমোনাই পীর জুলাই সনদ এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণ যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা প্রকাশ করেছে, তার বাস্তব প্রতিফলন রাষ্ট্র পরিচালনায় নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রে দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে হবে।

দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানোর জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জীবনে বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে। এ চাপ কমাতে সরকারকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

ফ্যাসিবাদের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির দাবি

ফ্যাসিবাদের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনারও দাবি জানিয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির।

তিনি বলেন, অতীতের স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের সঙ্গে যারা জড়িত ছিল, তাদের আইনের আওতায় এনে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তা পূর্ণতা পাবে না।

তাঁর মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, দ্রব্যমূল্য কমানো, রাজনৈতিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং ফ্যাসিবাদের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা—এসব ক্ষেত্রে সরকারের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।

প্রত্যাশা পূরণে আরও কার্যকর পদক্ষেপের আহ্বান

সরকারের প্রথম ছয় মাস নিয়ে চরমোনাই পীরের বক্তব্যে একদিকে যেমন সংস্কার কার্যক্রম ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে হতাশা প্রকাশ করা হয়েছে, অন্যদিকে সরকারপ্রধানের কিছু উদ্যোগের প্রশংসাও করা হয়েছে। অর্থাৎ তাঁর মূল্যায়নে সরকারের সব কার্যক্রমকে নেতিবাচক হিসেবে দেখা হয়নি; বরং ইতিবাচক উদ্যোগগুলোকে আরও কার্যকর ও দৃশ্যমান করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তন, রাজনৈতিক জবাবদিহি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বাস্তব উন্নতির যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা পূরণে সরকারকে আরও সক্রিয় হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তিনি।

চরমোনাই পীরের মতে, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে দেরি হলে শুধু তাৎক্ষণিক অসন্তোষই নয়, দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আস্থার সংকটও তৈরি হতে পারে। তাই সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সংস্কারের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, দ্রব্যমূল্যের চাপ কমানো এবং গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে রাষ্ট্র পরিচালনার কার্যকর নীতিতে রূপ দেওয়া।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স