ঢাকা

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়ছে, কর্মসংস্থান নয়—ভারতের স্নাতকদের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ভারতে গত এক দশকে উচ্চশিক্ষার সুযোগ দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। বিশেষ করে বেসরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে ব্যাপকভাবে। ভালো জীবনের আশায় পরিবারগুলো সঞ্চয় ভেঙে সন্তানদের এসব প্রতিষ্ঠানে পড়াচ্ছে, অনেকেই আবার ব্যাংক ও সরকারি ঋণ নিচ্ছেন। কিন্তু উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর সেই প্রত্যাশা অনুযায়ী চাকরি মিলছে না। তৈরি হচ্ছে ঋণ, বেকারত্ব ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা।

নয়াদিল্লির কাছাকাছি উত্তর ভারতের গ্রেটার নয়ডার ‘নলেজ পার্ক থ্রি’ এ বাস্তবতার একটি বড় উদাহরণ। ‘নলেজ পার্ক’ বলতে এমন পরিকল্পিত অঞ্চলকে বোঝানো হয়, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাকেন্দ্র, তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানি ও স্টার্ট-আপসহ জ্ঞানভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে গড়ে ওঠে। গ্রেটার নয়ডার পাঁচটি নলেজ পার্কে গত এক দশকে অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। বর্তমানে সেখানে প্রায় এক লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন।

এই শিক্ষাকেন্দ্রগুলোর বিকাশের পেছনে ছিল একটি বড় প্রত্যাশা—কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি তরুণদের মধ্যবিত্ত জীবনে প্রবেশের সুযোগ করে দেবে। কিন্তু বাস্তবে অনেক শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতা হচ্ছে ভিন্ন। ডিগ্রি অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে নিশ্চিত কর্মসংস্থানের বদলে তাঁদের অনেকের হাতে উঠছে শিক্ষাঋণের বোঝা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা।

ঋণের বোঝা নিয়ে পড়ছেন হর্ষিত

উত্তর ভারতের বারানসি শহরের ১৮ বছর বয়সী হর্ষিত রাই তাঁদেরই একজন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), মেশিন লার্নিংসহ ভবিষ্যতের চাকরির বাজারে কাজে লাগতে পারে—এমন বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করছেন তিনি। নয়ডা ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে তাঁর ডিগ্রি শেষ করতে প্রায় ১৫ হাজার ডলার খরচ হবে। এর মধ্যে প্রায় ৭ হাজার ডলার ব্যাংকঋণ।

হর্ষিতের লক্ষ্য পড়াশোনা শেষ করে মাসে ৮০ হাজার রুপি বা বছরে প্রায় ১০ হাজার ডলার আয় করা। তবে এর অর্ধেক বেতনের চাকরি পেলেও তিনি সন্তুষ্ট থাকবেন। কারণ, সে ক্ষেত্রে শুধু শিক্ষার পেছনে ব্যয় করা অর্থের সমপরিমাণ আয় করতেই তাঁর পাঁচ থেকে ছয় বছর লেগে যেতে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হবে ঋণের সুদ। স্নাতক হওয়ার এক বছর পর তাঁর ঋণের ওপর বছরে ১০ শতাংশ হারে সুদ যোগ হতে শুরু করবে। ফলে পড়াশোনা শেষ করার আগেই ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন তিনি।

হর্ষিতের ভাষায়, ‘কিছুটা চাপ অনুভব করি। সময়মতো ঋণ পরিশোধ করব কীভাবে?’

হর্ষিতের এই উদ্বেগ এখন ভারতের অসংখ্য তরুণের উদ্বেগের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।

উচ্চশিক্ষার বিস্তার, কিন্তু সেই হারে চাকরি নেই

ভারতে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা প্রায় ১০০ কোটি, যা বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। প্রতিবছর এই সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ করে বাড়ছে। একই সঙ্গে উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণও দ্রুত বাড়ছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ভারতে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ। এক দশক আগের তুলনায় এ সংখ্যা ৪১ শতাংশ বেশি। উচ্চশিক্ষায় থাকা শিক্ষার্থীদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ছেন।

কিন্তু উচ্চশিক্ষার এই দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তৈরি হয়নি ভালো বেতনের চাকরি। ফলে প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ থেকে বিপুলসংখ্যক তরুণ স্নাতক হয়ে বের হলেও তাঁদের জন্য আকর্ষণীয় কর্মসংস্থানের সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত।

আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা অনুযায়ী, ২৫ বছরের কম বয়সী কলেজ স্নাতকদের প্রায় ৪০ শতাংশ বেকার।

অন্যদিকে ভারতে বছরে মাসে ৫০০ ডলারের বেশি বেতনের নতুন চাকরি তৈরি হয় মাত্র প্রায় আড়াই লাখ। দেশটিতে তুলনামূলক স্বচ্ছল জীবনযাপনের জন্য এই বেতনকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এসব চাকরির প্রতিযোগিতায় অবশ্য ভারতের শীর্ষ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্নাতকেরা তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকেন। ফলে নামী প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ না পাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উচ্চ ব্যয়ে পড়াশোনা করা অনেকটা ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে পরিণত হচ্ছে।

মোদির আমলে বেসরকারি কলেজ তিন গুণ

ভারতে পরিবারের কাছে শিক্ষা দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান পথ। বিশেষ করে যেসব পরিবারের কিছু আর্থিক সামর্থ্য আছে, তারা শিক্ষাকে কম মজুরির কৃষিকাজ কিংবা অনানুষ্ঠানিক শ্রমের জীবন থেকে বেরিয়ে আসার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখে।

সবচেয়ে আকর্ষণীয় পথ হলো দেশের অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া। কিন্তু সেখানে আসন সীমিত। ফলে সুযোগ না পাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে বিকল্প।

নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরের এক দশকে দেশটিতে বেসরকারি কলেজের সংখ্যা তিন গুণ হয়েছে।

সরকারি উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার বাইরে এই বিশাল বেসরকারি শিক্ষা খাত পরিবারগুলোর কাছে মূলত একটি প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেছে—উচ্চশিক্ষার বিনিময়ে ভালো চাকরি ও উন্নত জীবন।

কিন্তু বাস্তবতা এখন সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি করেছে।

উদ্যোক্তা এবং একটি শিক্ষা ফেলোশিপ কর্মসূচির প্রতিষ্ঠাতা অক্ষয় সাক্সেনার ভাষায়, ‘তরুণদের কাছে একটি মিথ্যা বিক্রি করা হয়েছে। সেটি হলো, ডিগ্রি পেলেই চাকরি পাওয়া যাবে।’

শীর্ষ প্রতিষ্ঠানে সুযোগ অত্যন্ত সীমিত

ভারতে প্রায় ৫৫০টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। কিন্তু এগুলোর মাত্র এক-দশমাংশকে দেশের অভিজাত বা সেরা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এসব শীর্ষ প্রতিষ্ঠানে আবেদনকারীদের ৫ শতাংশেরও কম ভর্তির সুযোগ পান। অথচ সেখানে বছরে গড় টিউশন ফি ২৫০ ডলারেরও কম। এসব প্রতিষ্ঠানের একটি ডিগ্রি শিক্ষার্থীকে দেশের সবচেয়ে আকর্ষণীয় চাকরির বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে বড় সুবিধা দেয়।

অন্যদিকে যারা এসব প্রতিষ্ঠানে সুযোগ পান না, তাঁদের সামনে থাকে অনেক বেশি ব্যয়বহুল বেসরকারি শিক্ষা এবং অনিশ্চিত কর্মসংস্থানের সমীকরণ।

অক্ষয় সাক্সেনার হিসাবে, প্রতিবছর প্রায় চার লাখ শিক্ষার্থী বেসরকারি প্রকৌশল কলেজে পড়ার জন্য ২০ হাজার ডলারের বেশি ব্যয় করেন। তাঁদের প্রত্যাশা থাকে, ডিগ্রি শেষ করার পর বড় বেতনের চাকরি পাবেন।

কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের স্নাতকদের বার্ষিক মধ্যম বেতন প্রায় তিন হাজার ডলার।

সাক্সেনার মতে, গড়পড়তা একজন স্নাতকের চাকরি পাওয়ার উপযোগিতা মাত্র প্রায় ২০ শতাংশ।

এই বিশাল ব্যবধানকেই তিনি ভারতের জন্য একটি ‘ভয়াবহ জাতীয় মানসিক সংকট’ হিসেবে দেখছেন।

প্রকৌশল ডিগ্রিও আর নিশ্চিত ভবিষ্যৎ নয়

একসময় ভারতে প্রকৌশল ডিগ্রিকে প্রযুক্তি খাতে প্রবেশের অন্যতম নির্ভরযোগ্য পথ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ফলে প্রকৌশল শিক্ষায় প্রবেশের জন্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হয়।

ইনফোসিস ও টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেসের মতো ভারতীয় কোম্পানি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানকে তথ্যপ্রযুক্তি সেবা দিয়ে বিশাল ব্যবসা গড়ে তুলেছে। এই শিল্প দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক ভারতীয় প্রকৌশলী ও তথ্যপ্রযুক্তি স্নাতকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে।

কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশে সেই কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎও এখন আগের তুলনায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। অনেক কাজ স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা এবং প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের কারণে নতুন প্রজন্মের প্রকৌশলীদের সামনে আগের মতো নিশ্চিত কর্মজীবনের পথ নেই।

ভারতের ক্লাউড সফটওয়্যার কোম্পানি জোহোর সহপ্রতিষ্ঠাতা শ্রীধর ভেম্বুও শিক্ষাঋণের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন। তাঁর মতে, ভারতে শুধু ডিগ্রি অর্জনের জন্য বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। শিক্ষার নামে তরুণদের ঋণের ফাঁদে ফেলা উচিত নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।

অতুল আনন্দের গল্পও একই

নয়াদিল্লির উপকণ্ঠে অবস্থিত অ্যামিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ক্যাম্পাসেও উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের এই দ্বন্দ্ব স্পষ্ট।

অতুল আনন্দ নিজের রাজ্যের একটি শীর্ষ সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু দুই বছর আগে একটি গাড়ি দুর্ঘটনার কারণে সেখানে ভর্তি হতে পারেননি। পরে ঋণ নিয়ে অ্যামিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন তিনি।

ডিগ্রি ও জীবনযাত্রার খরচ মিলিয়ে তাঁর প্রায় ১৫ হাজার ডলার লাগবে। এর মধ্যে রাজ্য সরকার তাঁকে প্রায় চার হাজার ডলার ঋণ দিয়েছে। বাকি অর্থ জোগাতে তাঁর পরিবারের সঞ্চয় প্রায় শেষ হয়ে যাচ্ছে।

অতুলের বাবা গ্রামের একটি স্কুলে গণিত ও হিন্দি পড়ান। নিজের দৈনন্দিন খরচ চালাতে অতুল রাতে ফ্রিল্যান্স গ্রাফিক ডিজাইনের কাজ করেন।

তাঁর আশা, ভাগ্য ভালো থাকলে প্রযুক্তি খাতে বছরে প্রায় ১০ হাজার ডলারের একটি চাকরি পেতে পারেন। তবে তাঁর স্বপ্ন খুব বড় নয়। তিনি মূলত নিজের ঋণ এবং পরিবারের ওপর তৈরি হওয়া আর্থিক চাপ কমাতে চান।

অতুল বলেন, ‘আমার স্বপ্ন খুব বড় নয়। আমি ঋণ ও পরিবারের খরচের বোঝা কমাতে চাই।’

এই বক্তব্যের মধ্যেই ভারতের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর বর্তমান বাস্তবতার একটি চিত্র পাওয়া যায়। উচ্চশিক্ষার লক্ষ্য যেখানে হওয়া উচিত দক্ষতা ও সম্ভাবনার বিকাশ, সেখানে অনেক শিক্ষার্থীর কাছে সেটি এখন ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা অর্জনের লড়াইয়ে পরিণত হচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে ফুটে উঠেছে ভবিষ্যতের ভয়

এই হতাশারই আরেকটি বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে সম্প্রতি ভারতের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে। প্রশ্নপত্র ফাঁস ও পরীক্ষায় কারচুপির অভিযোগকে কেন্দ্র করে আন্দোলন শুরু হলেও পরে তা তরুণদের ভালো জীবন পাওয়ার পথে থাকা নানা বাধার বিরুদ্ধে বৃহত্তর ক্ষোভে রূপ নেয়।

গত মাসে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার বিরলভাবে পিছু হটতে বাধ্য হয়। পরে প্রকাশ্য বিক্ষোভের মাত্রা কমেছে, কিন্তু আন্দোলনের পেছনে থাকা হতাশা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

অতুল আনন্দও দিল্লিতে আন্দোলনের শেষ দিনে সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁর ভাষ্য, তিনি কোনো রাজনৈতিক কারণে আন্দোলনে যাননি। বরং নিজেদের নানা অভিযোগ তুলে ধরতে সেখানে জড়ো হওয়া শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি জানাতেই তিনি উপস্থিত হয়েছিলেন।

তাঁর বন্ধু এম জে বিশ্বাসও আন্দোলনকারীদের দাবির বিষয়ে সন্দিহান ছিলেন। তাঁর মতে, পরীক্ষাপদ্ধতিতে পরিবর্তনের দাবির আড়ালে তরুণদের মধ্যে আরও গভীর একটি ভয় কাজ করছে।

আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘ক্ষোভ আসলে তোমাদের ভয় ঢাকার মুখোশ। তোমরা সবাই ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব ভীত।’

শিক্ষার ব্যবসায় অসহায়তাই পুঁজি

অক্ষয় সাক্সেনা ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার উভয় দিকই কাছ থেকে দেখেছেন। তিনি দেশের অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি বোম্বেতে পড়াশোনা করেছেন। পরে বোস্টন কনসালটিং গ্রুপে কাজ করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালিতে নতুন প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সহায়তা করেছেন।

এখন তিনি ‘অবন্তী ফেলোস’-এর মাধ্যমে মেধাবী ও নিম্ন আয়ের শিক্ষার্থীদের অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সহায়তা করছেন। কর্মসূচিটির আওতায় শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে পরীক্ষার প্রস্তুতি ও নিবিড় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

কিন্তু তাঁর নিজের অভিজ্ঞতাই দেখাচ্ছে, শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসনের তুলনায় আবেদনকারীর সংখ্যা অনেক বেশি। একই সমস্যা রয়েছে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও। ভালো চাকরির সংখ্যার তুলনায় স্নাতকের সংখ্যা অনেক বেশি।

ফলে বেসরকারি শিক্ষার বিশাল খাত পরিবারগুলোর কাছে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে ওপরে ওঠার সম্ভাবনা বিক্রি করছে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা বাস্তবে কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

সাক্সেনার আশঙ্কা, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যেতে পারে যেখানে শিক্ষার্থীদের অসহায়তাই শিক্ষা ব্যবসার মূল পুঁজি হয়ে উঠবে।

তিনি বলেন, ‘বাস্তবে কেউই চাকরি পাবে না। মানুষের অসহায়তাকেই অর্থ উপার্জনের উপায় বানানো হবে।’

ডিগ্রি নয়, কর্মসংস্থানই এখন বড় প্রশ্ন

ভারতের উচ্চশিক্ষার বিস্তার নিঃসন্দেহে একটি বড় সামাজিক পরিবর্তন। কয়েক কোটি তরুণ এখন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন, যা এক দশক আগের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়লেই যে শিক্ষার্থীদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হয় না, গ্রেটার নয়ডার নলেজ পার্ক থেকে শুরু করে ভারতের বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতা সেটিই দেখাচ্ছে।

পরিবারগুলো সঞ্চয় ভাঙছে, শিক্ষার্থীরা ঋণ নিচ্ছেন, তরুণেরা বছরের পর বছর পড়াশোনা করছেন। কিন্তু স্নাতক হওয়ার পর যদি তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত মানসম্মত ও ভালো বেতনের চাকরি তৈরি না হয়, তাহলে উচ্চশিক্ষার এই বিস্তার নতুন সুযোগের পাশাপাশি নতুন আর্থিক ঝুঁকিও তৈরি করবে।

ভারতের তরুণদের সামনে তাই প্রশ্নটি এখন শুধু ‘কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ব’—এতটুকুতে সীমাবদ্ধ নেই। বরং প্রশ্ন হচ্ছে, সেই ডিগ্রির মূল্য কতটা, সেটি দিয়ে চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা কতটা এবং সেই শিক্ষার পেছনে নেওয়া ঋণ ভবিষ্যতে কীভাবে পরিশোধ করা হবে।

উচ্চশিক্ষার বিস্তার যদি দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরির সঙ্গে তাল মিলিয়ে না এগোয়, তাহলে ডিগ্রি অর্জনের স্বপ্ন অনেক পরিবারের জন্য শেষ পর্যন্ত ঋণের বোঝায় পরিণত হতে পারে। আর সেই হতাশা থেকেই ভারতের তরুণ সমাজে যে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে, তা কেবল শিক্ষাব্যবস্থার সংকট নয়—দেশটির ভবিষ্যৎ শ্রমবাজার ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্যও বড় একটি সতর্কবার্তা।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স