ঢাকা

ইমরানের হাসপাতালে স্থানান্তর নিয়ে সরকারের রিভিউ আবেদন খারিজ নয়, ফেরত দিল আদালত

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
কারাবন্দী পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে চিকিৎসার জন্য ইসলামাবাদের শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তরের আদেশের বিরুদ্ধে সরকারের করা পুনর্বিবেচনার আবেদন ফেরত পাঠিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। বৃহস্পতিবার আদালতের রেজিস্ট্রার কার্যালয় ইসলামাবাদের চিফ কমিশনারের মাধ্যমে করা আবেদনটিতে আপত্তি জানিয়ে তা ফেরত পাঠায়।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের উত্থাপিত আপত্তিগুলো দূর করে আবেদনটি আবার দাখিল করা হবে। অন্যদিকে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) সাধারণ সম্পাদক সালমান আকরাম রাজা দাবি করেছেন, ইমরান খানকে হাসপাতালে স্থানান্তরের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে করা পুনর্বিবেচনার আবেদন ফেডারেল সরকার প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

এই দুই বক্তব্যের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য থাকলেও বৃহস্পতিবারের ঘটনাটি ইমরান খানের চিকিৎসা নিয়ে পাকিস্তানের সরকার ও সর্বোচ্চ আদালতের মধ্যে চলমান টানাপোড়েনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে সালমান আকরাম রাজা বলেন, সরকারের আর ১৮ আগস্টের সুপ্রিম কোর্টের আদেশ না মানার কোনো অজুহাত নেই। তাঁর দাবি, ইমরান খানকে এখনই শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হবে।

জিও নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশের বিরুদ্ধে ফেডারেল সরকার সুপ্রিম কোর্টে পুনর্বিবেচনার আবেদন করার এক দিন পরই এই আবেদন ফেরত দেওয়ার ঘটনা ঘটল।

কী নিয়ে সরকারের আপত্তি

সরকারের পক্ষ থেকে করা পুনর্বিবেচনার আবেদনে মূলত সুপ্রিম কোর্টের ১৮ আগস্টের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের এখতিয়ার ও আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল।

ইসলামাবাদ ক্যাপিটাল টেরিটরির অ্যাডভোকেট জেনারেলের মাধ্যমে ইসলামাবাদের চিফ কমিশনার আবেদনটি করেন। সরকারের যুক্তি ছিল, ইমরান খানকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে আদালত সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিবিধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনায় নেননি।

আবেদনে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট সংবিধিবদ্ধ বিধানটি আদালতের নজর এড়িয়ে যাওয়ার কারণে আদেশে একটি স্পষ্ট ভুল তৈরি হয়েছে। ওই বিধান বিবেচনায় নেওয়া হলে পুনর্বিবেচনাধীন আদেশটি দেওয়া সম্ভব হতো না বলেও সরকার দাবি করে।

এ কারণে ১৮ আগস্টের আদেশটি পুনর্বিবেচনার জন্য গ্রহণযোগ্য বলে আবেদনে যুক্তি দেওয়া হয়।

সরকার আরও দাবি করে, বিষয়টি প্রথমবার সুপ্রিম কোর্টে আসার সময় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে কোনো নোটিশ দেওয়া হয়নি। ফলে আদালতের আদেশ দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য শোনার সুযোগ ছিল না।

প্রিজন রুলসের বিধান তুলে ধরেছে সরকার

ইমরান খানকে কারাগার থেকে হাসপাতালে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে ১৯৭৮ সালের পাকিস্তান প্রিজন রুলসের ১৯৭ নম্বর বিধির কথাও উল্লেখ করেছে সরকার।

ওই বিধিতে কারাগারে থাকা কোনো বন্দীকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়ার পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের যুক্তি, হাসপাতালে স্থানান্তরিত বন্দীকে পুলিশের নজরদারিতে রাখার বিধান রয়েছে। ফলে আদালতের সরাসরি নির্দেশে বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের আগে প্রচলিত আইন ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন ছিল।

সরকারের আবেদনে আরও বলা হয়, ইমরান খানের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য অতীতে নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষা করা হয়েছে এবং বিভিন্ন সময়ে তিনি মেডিক্যাল বোর্ডের কাছ থেকে চিকিৎসাসেবাও পেয়েছেন।

তাই তাঁকে স্বাস্থ্যগত কারণে কারাগার থেকে বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে আদালতের চিকিৎসাবিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া উচিত ছিল বলে সরকার মনে করে।

ইমরানকে হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্ট

এর আগে ১৮ আগস্টের আদেশে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট আদিয়ালা জেল কর্তৃপক্ষকে ইমরান খানকে দুই দিনের মধ্যে ইসলামাবাদের শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশ দেন।

আদালতের নির্দেশ ছিল, সেখানে তাঁর চিকিৎসা মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে হবে। একই সঙ্গে ইমরানের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসার জন্য একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়।

আদালত আরও বলেন, চিকিৎসা মূল্যায়ন ও চিকিৎসার সময় ডা. উজমা এবং ইমরান খানের ব্যক্তিগত চিকিৎসক উপস্থিত থাকতে পারবেন। চিকিৎসাসংক্রান্ত সব খরচ বহন করবে তাঁর পরিবার।

সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণেরও নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয় আদালত।

তবে আদালত একই সঙ্গে একটি সতর্কবার্তাও দিয়েছিলেন। নির্দেশনা বা শর্ত লঙ্ঘন করা হলে ইমরান খানকে দেওয়া সুযোগ-সুবিধা প্রত্যাহার করা হতে পারে বলে আদালতের আদেশে উল্লেখ করা হয়।

এই আদেশের পর পিটিআই তা স্বাগত জানায়। একই সঙ্গে দলটির নেতা-কর্মীদের হাসপাতালের বাইরে ভিড় না করার আহ্বান জানানো হয়।

তিন বছর ধরে কারাগারে ইমরান

৭৩ বছর বয়সী ইমরান খান ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে কারাগারে রয়েছেন। ২০২২ সালের এপ্রিলে অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়। পিটিআই ও ইমরান খান বরাবরই এসব মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছেন।

কারাগারে থাকার সময় তাঁর স্বাস্থ্য নিয়েও বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে বয়স ও একাধিক শারীরিক সমস্যার কারণে তাঁর চিকিৎসা নিয়ে পরিবারের সদস্য ও দলীয় নেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

ইমরান খানকে শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তরের বিষয়টি নিয়েও এর আগে আদালতে আবেদন করা হয়েছিল। সরকারের পুনর্বিবেচনার আবেদনে বলা হয়, ইমরান খান চিকিৎসার জন্য ওই হাসপাতালে স্থানান্তরের আবেদন করেছিলেন। তবে ইসলামাবাদ হাইকোর্ট গত ১২ মার্চ তাঁর সেই আবেদন খারিজ করে দেন।

এরপর বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে যায়। সেখানেই ১৮ আগস্ট ইমরানকে বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ দেওয়া হয়।

সরকারের আবেদন ফেরত যাওয়ায় নতুন পরিস্থিতি

সরকারের পুনর্বিবেচনার আবেদন রেজিস্ট্রার কার্যালয় থেকে ফেরত পাঠানোর ঘটনায় এখন ইমরান খানকে হাসপাতালে নেওয়ার প্রক্রিয়া কোন দিকে যায়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সরকারি পক্ষ বলছে, আবেদনটি পুনরায় দাখিল করা হবে। অর্থাৎ ১৮ আগস্টের আদেশের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে—এমনটা বলা যাচ্ছে না।

অন্যদিকে পিটিআই বলছে, সরকারের পক্ষ থেকে পুনর্বিবেচনার আবেদন প্রত্যাহার করা হয়েছে। দলটির নেতা সালমান আকরাম রাজার বক্তব্য অনুযায়ী, এখন ইমরান খানকে হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে আর কোনো আইনি বাধা থাকার কথা নয়।

এই দুই অবস্থানের মধ্যে কোনটি শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয়, তার ওপরই পরবর্তী পদক্ষেপ অনেকটা নির্ভর করছে।

পিটিআইয়ের জন্য নতুন রাজনৈতিক বার্তা?

ইমরান খানকে বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ শুধু চিকিৎসার বিষয়েই সীমাবদ্ধ নেই; পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনেও এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের ওই নির্দেশ দেশটির রাজনৈতিক ও আইনাঙ্গনের অনেককে বিস্মিত করেছে। কারণ, প্রায় তিন বছর ধরে রাজনৈতিকভাবে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে থাকা পিটিআইয়ের জন্য এই আদেশকে কেউ কেউ নতুন রাজনৈতিক পরিসর তৈরির সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।

ইমরান খানকে ঘিরে পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকট দীর্ঘদিন ধরে চলমান। তাঁর দল একদিকে রাজনৈতিকভাবে কার্যকর থাকার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক ও আইনি জটিলতা সামলাতে হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ আদালতের কোনো সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি করছে কি না, তা নিয়েও নানা আলোচনা শুরু হয়েছে।

সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে জল্পনা

পাকিস্তানের কয়েকজন রাজনৈতিক ও আইন বিশ্লেষক মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইমরান খানের সঙ্গে কোনো ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তাঁদের যুক্তি, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটাতে কোনো পর্যায়ে সরকার ও পিটিআইয়ের মধ্যে সমঝোতার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। আর সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশ সেই সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরির সুযোগ দিয়েছে।

তবে এখন পর্যন্ত সরকার ও পিটিআইয়ের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক সমঝোতা হয়েছে—এমন তথ্য নেই। ফলে এসব আলোচনা আপাতত রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও জল্পনার পর্যায়েই রয়েছে।

এরই মধ্যে ইমরান খান নতুন প্রদেশ গঠন কিংবা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জাতীয় সরকার গঠনের মতো কোনো প্রস্তাবে সম্মত হতে পারেন কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।

তবে এসব প্রস্তাবের কোনোটি বাস্তব রাজনৈতিক আলোচনার অংশ কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য সামনে আসেনি।

সামনে এখন কী?

তাৎক্ষণিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সরকার পুনর্বিবেচনার আবেদন কীভাবে এবং কখন আবার দাখিল করে এবং সুপ্রিম কোর্ট সেটি কীভাবে বিবেচনা করে।

অন্যদিকে ১৮ আগস্টের আদেশ অনুযায়ী ইমরান খানকে শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়ার প্রক্রিয়া কার্যকর হয় কি না, সেটিও নজরে থাকবে।

যদি সরকার আদালতের আদেশ মেনে ইমরানকে হাসপাতালে স্থানান্তর করে, তাহলে এটি তাঁর চিকিৎসা নিয়ে চলমান বিরোধের আপাতত একটি সমাধান তৈরি করতে পারে। আর যদি সরকার আবারও আইনি পথে আদেশটি ঠেকানোর চেষ্টা করে, তাহলে বিষয়টি নতুন করে আদালত ও রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা তৈরি করতে পারে।

সব মিলিয়ে ইমরান খানের হাসপাতাল স্থানান্তরের বিষয়টি এখন কেবল একজন কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রীর চিকিৎসার প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে পাকিস্তানের বিচার বিভাগ, সরকার ও পিটিআইয়ের মধ্যকার ক্ষমতার ভারসাম্য এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর সেই অচলাবস্থায় আদৌ কোনো নতুন দরজা খুলছে কি না, এখন সেটিই পাকিস্তানের রাজনীতির অন্যতম বড় প্রশ্ন।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স