রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপির মহাসচিবের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পর দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পেয়েছেন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। দীর্ঘদিন বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, কেন্দ্রীয় কার্যালয় পরিচালনা এবং দলীয় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা রিজভীকেই এবার মির্জা ফখরুলের উত্তরসূরি হিসেবে বেছে নিয়েছে দলটি।
এর আগে রিজভীকে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্ষদ জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়। ফলে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব থেকে এবার তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্বে এলেন।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বিএনপির পক্ষ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দলীয় গঠনতন্ত্রের ৭ (খ) ৬ ধারা অনুযায়ী জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য রুহুল কবির রিজভীকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। এ মনোনয়ন অবিলম্বে কার্যকর হবে।
এর আগে বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর বিএনপির মহাসচিবের পদ থেকে লিখিতভাবে পদত্যাগ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাঁর পদত্যাগের পরপরই নতুন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে রিজভীকে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় দলটির জাতীয় স্থায়ী কমিটি।
মির্জা ফখরুলের উত্তরসূরি রিজভী
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিজয়ী হওয়ার পর থেকেই বিএনপির মহাসচিব পদে তাঁর উত্তরসূরি কে হচ্ছেন, তা নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা শুরু হয়। জ্যেষ্ঠ কয়েকজন নেতার নাম আলোচনায় এলেও শেষ পর্যন্ত দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতা রুহুল কবির রিজভীর ওপরই আস্থা রাখল বিএনপি।
দলটির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে রিজভীর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তাঁর নিবিড় যোগাযোগ তাঁকে এই দায়িত্বের জন্য এগিয়ে রেখেছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
বিশেষ করে দীর্ঘ সময় বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়কেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে রিজভীর অভিজ্ঞতা রয়েছে। দলীয় কর্মসূচি, সংবাদ সম্মেলন, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই তাঁকে দলের অন্যতম দৃশ্যমান মুখ হিসেবে দেখা গেছে।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও তাঁর সক্রিয়তা দীর্ঘদিনের। ফলে হঠাৎ করে মহাসচিবের পদ শূন্য হওয়ার পর দল পরিচালনায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে রিজভীকেই সবচেয়ে উপযুক্ত মনে করেছে বিএনপি।
প্রতিকূল সময়ে দলের সামনের সারিতে
রুহুল কবির রিজভী দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে সক্রিয়। ছাত্রজীবনে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন। পরবর্তী সময়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নানা প্রতিকূলতা তৈরি হলেও দলীয় কর্মসূচি ও গণমাধ্যমে বিএনপির অবস্থান তুলে ধরতে রিজভী সামনের সারিতে ছিলেন। নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন, দলীয় কর্মসূচি ঘোষণা এবং রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ে বিএনপির অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনি দীর্ঘ সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
একপর্যায়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে টানা প্রায় দুই মাস অবরুদ্ধ অবস্থায় থেকেও নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন রিজভী। সে সময় দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি চালিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
দলীয় কর্মকাণ্ডের এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতাই তাঁকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্বে আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হিসেবে কাজ করেছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব থেকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব
বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোয় রিজভীর উত্থান দীর্ঘদিনের। জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে তিনি দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কার্যক্রমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। এবার সেই পদ থেকে তাঁকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করা হলো।
এর আগে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি দলের মহাসচিব নির্বাচিত হন। ফলে একই ধারাবাহিকতায় রিজভীরও জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব থেকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হওয়ার ঘটনা বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোয় তাৎপর্যপূর্ণ।
দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্ষদ জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই তাঁকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়ায় বিএনপিতে তাঁর সাংগঠনিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হলো।
মির্জা ফখরুলের এক যুগের বেশি সময়ের অধ্যায়ের সমাপ্তি
রুহুল কবির রিজভীর দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে বিএনপির মহাসচিব হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্বের অবসান হলো।
২০১১ সালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল। এরপর ২০১৬ সালের জাতীয় কাউন্সিলে তিনি দলের মহাসচিব নির্বাচিত হন। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি বিএনপির অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচি, নির্বাচন, সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকটে দলের অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্রে মির্জা ফখরুল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয় করে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনাও ছিল তাঁর দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জয়ী হওয়ার পর তাঁর রাজনৈতিক জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হলো। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে দায়িত্ব নেওয়ার কারণে দলীয় পদ ছাড়তে হয়েছে তাঁকে।
আপাতত ভারপ্রাপ্ত, কাউন্সিলে হতে পারে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব
রুহুল কবির রিজভীর নতুন দায়িত্বকে আপাতত অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ বিএনপি চলতি বছরই জাতীয় কাউন্সিল করার চিন্তা করছে। কাউন্সিলে দলের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করা হলে তখন পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব নির্বাচনের বিষয়টি সামনে আসবে।
সেক্ষেত্রে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে রিজভীর কাজ হবে দলের দৈনন্দিন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা এবং জাতীয় কাউন্সিল পর্যন্ত দলীয় কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।
তবে কাউন্সিলে তাঁকেই পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব করা হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি।
সামনে বড় দায়িত্ব রিজভীর
মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়ার পর রুহুল কবির রিজভীর সামনে এখন বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডকে আরও সক্রিয় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। দল বর্তমানে সরকার পরিচালনার পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পর বিএনপির দলীয় কাঠামো এবং সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বে পরিবর্তনের আলোচনা শুরু হয়েছিল। মির্জা ফখরুলের মহাসচিব পদে রিজভীর নিয়োগ সেই পরিবর্তনপ্রক্রিয়ার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি।
দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় পরিচালনা, বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয়, নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ, সাংগঠনিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং জাতীয় কাউন্সিলের প্রস্তুতির মতো একাধিক দায়িত্ব এখন তাঁর ওপর বর্তাবে।
দীর্ঘদিন কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কারণে এসব কাজের সঙ্গে তিনি পরিচিত হলেও মহাসচিব হিসেবে দায়িত্বের পরিধি আরও বিস্তৃত হবে।
আরও দুই গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তনের অপেক্ষা
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর বিএনপির সাংগঠনিক ও সরকারি দায়িত্বে পরিবর্তনের আলোচনা শুরু হয়। মহাসচিবের পদে রিজভীকে দায়িত্ব দেওয়ার মাধ্যমে সেই প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে এখনো স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং ঠাকুরগাঁও-১ আসনে মির্জা ফখরুলের উত্তরসূরি কে হবেন, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত বাকি রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে একদিকে যেমন বিএনপির মহাসচিব পদে নতুন নেতৃত্ব এল, অন্যদিকে সরকারের দায়িত্ব এবং সংসদীয় রাজনীতিতেও আরও কিছু পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এ অবস্থায় রুহুল কবির রিজভীর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব গ্রহণ বিএনপির সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি দলটির আগামী জাতীয় কাউন্সিলের প্রস্তুতিকেও নতুন মাত্রা দেবে বলে মনে করা হচ্ছে।