ঢাকা

গোপনীয়তা লঙ্ঘনের মামলায় হার, ৫৭৫ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে হ্যারিসহ ৮ তারকাকে

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ডেইলি মেইলের বিরুদ্ধে গোপনীয়তা লঙ্ঘন ও অবৈধভাবে তথ্য সংগ্রহের অভিযোগে করা মামলায় হেরে যাওয়ার পর বড় অঙ্কের আইনি খরচের মুখে পড়েছেন প্রিন্স হ্যারি ও আরও ছয় বাদী। মামলায় প্রতিপক্ষের আইনি ব্যয় বাবদ তাঁদের সর্বোচ্চ ৩ কোটি ৪৫ লাখ পাউন্ড পর্যন্ত পরিশোধ করতে হতে পারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ৫৭৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা—প্রতি পাউন্ড ১৬৬ টাকা হিসাবে।

শুক্রবার যুক্তরাজ্যের হাইকোর্টের বিচারপতি এ মামলার আইনি ব্যয় নিয়ে একটি ব্যতিক্রমী আদেশ দেন। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, সাত বাদীকে প্রাথমিকভাবে আগামী শুক্রবারের মধ্যে ডেইলি মেইলের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অ্যাসোসিয়েটেড নিউজপেপার্স লিমিটেডকে (এএনএল) ৯৫ লাখ ৪০ হাজার পাউন্ড পরিশোধ করতে হবে।

মামলার বাদীদের মধ্যে প্রিন্স হ্যারি ছাড়াও রয়েছেন ব্রিটিশ গায়ক এলটন জন, তাঁর স্বামী ডেভিড ফার্নিশ, লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সাবেক উপনেতা সাইমন হিউজেস, অধিকারকর্মী ব্যারনেস লরেন্স এবং অভিনেত্রী স্যাডি ফ্রস্ট ও লিজ হার্লি।

মামলায় হেরে যাওয়ার পর আইনি খরচের চাপ

ডেইলি মেইলের বিরুদ্ধে করা মামলায় বাদীদের মূল অভিযোগ ছিল, সংবাদপত্রটির প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এএনএল তাঁদের ব্যক্তিগত তথ্য অবৈধভাবে সংগ্রহ করেছে এবং গোপনীয়তা লঙ্ঘন করেছে।

তবে গত ৭ জুলাই যুক্তরাজ্যের হাইকোর্টের বিচারপতি নিকলিন বাদীদের আনা অবৈধভাবে তথ্য সংগ্রহের অভিযোগগুলো খারিজ করে দেন। এএনএল শুরু থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিল।

মামলায় হেরে যাওয়ার পর এখন শুধু নিজেদের আইনি খরচ নয়, প্রতিপক্ষের মামলার খরচও বহনের ঝুঁকিতে পড়েছেন বাদীরা। শুক্রবারের শুনানিতে সেই খরচের পরিমাণ নিয়েই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন বিচারপতি।

আদালতের এই সিদ্ধান্তের ফলে মামলাটি শুধু গোপনীয়তা ও ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারের আইনি প্রশ্নেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকছে না; বরং দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল আইনি লড়াইয়ের আর্থিক পরিণতিও সামনে এসেছে।

প্রথম ধাপে দিতে হবে ৯৫ লাখ ৪০ হাজার পাউন্ড

আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, আগামী শুক্রবারের মধ্যে সাত বাদীকে সম্মিলিতভাবে ৯৫ লাখ ৪০ হাজার পাউন্ড এএনএলকে দিতে হবে।

তবে এটি মোট আইনি খরচের চূড়ান্ত পরিমাণ নয়। এএনএল দাবি করেছে, নিজেদের পক্ষে মামলা পরিচালনা করতে তাদের মোট প্রায় ৩ কোটি ৪৫ লাখ পাউন্ড খরচ হয়েছে। শুক্রবারের আদেশের ফলে প্রতিষ্ঠানটি এই পুরো অর্থ আদায়ের চেষ্টা করতে পারবে।

অর্থাৎ, প্রাথমিকভাবে প্রায় ৯৫ লাখ পাউন্ড দেওয়ার পরও বাদীদের আরও বড় অঙ্কের আইনি খরচ বহন করার সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩ কোটি ৪৫ লাখ পাউন্ডের মূল্য প্রায় ৫৭৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। আর প্রাথমিকভাবে দিতে বলা ৯৫ লাখ ৪০ হাজার পাউন্ডের মূল্য প্রায় ১৫৮ কোটি ৩ লাখ টাকা।

বিমার সীমার বাইরেও বড় বিল

মামলায় বাদীদের আইনি ব্যয়ের দায় নিয়ে আলাদা একটি বিষয়ও সামনে এসেছে। তাঁদের মধ্যে লিজ হার্লির ক্ষেত্রে এএনএলের আইনি খরচের জন্য সর্বোচ্চ ১ কোটি ৬২ লাখ পাউন্ড পর্যন্ত বিমা করা ছিল।

কিন্তু এএনএলের দাবি অনুযায়ী, নিজেদের পক্ষে মামলা পরিচালনায় প্রতিষ্ঠানটির মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৪৫ লাখ পাউন্ড।

ফলে বিমার আওতায় থাকা অর্থের সঙ্গে এএনএলের দাবিকৃত মোট ব্যয়ের বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

হিসাব অনুযায়ী, বিমার ১ কোটি ৬২ লাখ পাউন্ড বাদ দিলে প্রায় ১ কোটি ৮৩ লাখ পাউন্ড অতিরিক্ত খরচের প্রশ্ন সামনে আসে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই অতিরিক্ত অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩০৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা।

অবশ্য শেষ পর্যন্ত বাদীদের কাছ থেকে এএনএল ঠিক কত অর্থ আদায় করতে পারবে, তা পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।

আইনি খরচ নিয়ে বিচারকের অসন্তোষ

মামলার আইনি ব্যয় নিয়ে বিচারপতি এডওয়ার্ড নিকলিনও প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর কাছে এএনএলের ৩ কোটি ৪০ লাখ পাউন্ডের বেশি আইনি খরচের দাবি আপাতদৃষ্টিতে অতিরিক্ত বলে মনে হয়েছে।

বিচারপতি বলেন, এত বড় অঙ্কের খরচের দাবি স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করে—এএনএল যে অর্থ এখন দাবি করছে, তার পুরোটা সত্যিই যুক্তিসংগতভাবে খরচ হয়েছে কি না এবং দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ আদৌ যৌক্তিক কি না।

অর্থাৎ, আদালত এএনএলের দাবি করা পুরো অর্থকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রহণ করেননি। বরং খরচের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি তা যাচাইয়ের সুযোগ রেখেছেন।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিচারপতি এএনএল কত সর্বোচ্চ অর্থ আইনি খরচ হিসেবে আদায় করতে পারবে, তার কোনো নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করেননি।

কেন সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দিলেন না আদালত

আইনি খরচের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে না দেওয়ার বিষয়ে বিচারপতি নিকলিন ব্যাখ্যাও দিয়েছেন।

তাঁর মতে, এ ধরনের সীমা নির্ধারণ করলে সেটি অতিরিক্ত সাধারণীকরণ হয়ে যেতে পারে। এতে অন্যায় হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে এবং ভবিষ্যতে ওই সিদ্ধান্তকে খেয়ালখুশিমতো নেওয়া হয়েছে—এমন সমালোচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তাই এএনএল কত অর্থ আদায় করতে পারবে, সে বিষয়ে তিনি কোনো কঠোর সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করেননি।

ফলে প্রতিষ্ঠানটির দাবিকৃত বিপুল আইনি খরচের কতটা শেষ পর্যন্ত বাদীদের বহন করতে হবে, সেটি এখন পরবর্তী ব্যয় নির্ধারণ প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে।

আপিলের সুযোগ রয়েছে হ্যারি ও অন্যদের

মামলায় পরাজয়ের পর প্রিন্স হ্যারি ও অন্য ছয় বাদীকে আপিলের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আদালত তাঁদের আগামী ২ অক্টোবর পর্যন্ত আপিল করার সময় দিয়েছেন।

তাঁরা যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিল করেন, তাহলে মূল মামলার রায় এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইনি ব্যয়ের বিষয়টি আরও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে যেতে পারে।

অন্যদিকে আপিল না করা হলে বর্তমান রায়ের ভিত্তিতেই আইনি খরচ পরিশোধের প্রক্রিয়া এগোবে।

মামলার সাত বাদী

ডেইলি মেইলের বিরুদ্ধে এই মামলায় বাদী ছিলেন মোট সাতজন। তাঁদের মধ্যে ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য প্রিন্স হ্যারি সবচেয়ে আলোচিত নাম।

অন্য বাদীরা হলেন—

গায়ক এলটন জন;
এলটন জনের স্বামী ডেভিড ফার্নিশ;
লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সাবেক উপনেতা সাইমন হিউজেস;
অধিকারকর্মী ব্যারনেস লরেন্স;
অভিনেত্রী স্যাডি ফ্রস্ট;
অভিনেত্রী লিজ হার্লি।

তাঁদের অভিযোগ ছিল, এএনএল তাঁদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে বেআইনি পদ্ধতি ব্যবহার করেছে। তবে আদালত গত ৭ জুলাই এসব অভিযোগ খারিজ করে দেন।

এএনএল অবশ্য শুরু থেকেই অভিযোগগুলো অস্বীকার করে আসছিল।

শুধু অর্থের হিসাব নয়, বড় আইনি লড়াইয়ের পরিণতি

এই মামলার আর্থিক পরিণতি এখন বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। কারণ, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া মামলায় বাদীদের শেষ পর্যন্ত প্রতিপক্ষের আইনি ব্যয়ের বড় অংশ বহনের ঝুঁকিতে পড়তে হয়েছে।

বিশেষ করে প্রিন্স হ্যারির মতো উচ্চপ্রোফাইল ব্যক্তিত্বের মামলায় কয়েক কোটি পাউন্ডের আইনি খরচের বিষয়টি যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম ও আইনজীবী মহলে আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে।

মামলায় জয়ের পর এএনএল তাদের ব্যয় করা অর্থের বড় অংশ ফেরত পাওয়ার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে বাদীদের সামনে এখন দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—একদিকে রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সিদ্ধান্ত, অন্যদিকে আদালতের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আইনি খরচ পরিশোধের দায়।

সামনে আরও আইনি প্রক্রিয়া

শুক্রবারের আদেশের পরও মামলার আর্থিক বিষয়টি পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি। এএনএল ৩ কোটি ৪৫ লাখ পাউন্ড পর্যন্ত খরচ হয়েছে বলে দাবি করলেও শেষ পর্যন্ত কত অর্থ বাদীদের দিতে হবে, তা নির্ধারণে আরও আইনি যাচাই প্রয়োজন হবে।

এর পাশাপাশি আগামী ২ অক্টোবর পর্যন্ত প্রিন্স হ্যারি ও অন্য বাদীদের আপিল করার সুযোগ রয়েছে। তাঁরা আপিল করলে মামলার মূল রায় ও সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের বিষয়টি নতুন করে আদালতে আলোচিত হতে পারে।

ফলে ডেইলি মেইলের বিরুদ্ধে গোপনীয়তা লঙ্ঘনের অভিযোগে শুরু হওয়া এই দীর্ঘ আইনি লড়াই এখন নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। মামলায় অভিযোগের পক্ষে রায় না পেলেও বাদীদের সামনে এখন মূলত আর্থিক দায় ও সম্ভাব্য আপিল—এই দুই বড় প্রশ্ন। আর এএনএলের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো, দাবি করা বিপুল আইনি খরচের কতটা আদালতের যাচাই শেষে আদায় করা সম্ভব হবে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স