ঢাকা

নাগরিকত্ব নিয়ে স্পষ্ট জবাব না দেওয়া পর্যন্ত হুমায়ুন কবিরের মন্তব্য প্রত্যাহারের দাবি বিজেআইএমের

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের দেওয়া মন্তব্যকে ‘অপেশাদার ও আক্রমণাত্মক’ আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশি জার্নালিস্টস ইন ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া (বিজেআইএম)। সংগঠনটি বলেছে, একজন মন্ত্রিসভা সদস্যের কাছ থেকে এ ধরনের আচরণ প্রত্যাশিত পেশাদারত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

একই সঙ্গে হুমায়ুন কবিরের মন্তব্য প্রত্যাহার এবং তাঁর নাগরিকত্বের অবস্থা ও মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালনের সাংবিধানিক যোগ্যতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট জবাব দেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

সোমবার দেওয়া এক বিবৃতিতে বিজেআইএম বলেছে, সরকারি দায়িত্ব পালনের সাংবিধানিক যোগ্যতা নিয়ে সাংবাদিকদের করা সরাসরি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সংবাদমাধ্যমকে উপহাস করেছেন এবং প্রশ্নটির পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকার ইঙ্গিত দিয়েছেন। সংগঠনটির মতে, এ ধরনের বক্তব্য সাংবাদিকদের ভয় দেখাতে পারে এবং ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা দুর্বল করতে পারে।

নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্নের জবাব না দেওয়ার অভিযোগ

বিজেআইএমের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের একটি সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে হুমায়ুন কবিরের নাগরিকত্ব নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলা হয়েছে। মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়ার আগে তিনি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছিলেন কি না—প্রতিবেদনে মূলত সেই প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে।

সংগঠনটির মতে, হুমায়ুন কবির দীর্ঘ সময় ব্রিটেনের রাজনৈতিক ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকায় তাঁর নাগরিকত্বের বিষয়টি জনস্বার্থে প্রশ্ন তোলার মতো একটি বিষয়।

বিজেআইএমের বিবৃতি অনুযায়ী, হুমায়ুন কবির ব্রিটিশ লেবার পার্টির হয়ে বেনশাম ম্যানর এলাকার কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে ২০১৯ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত তিনি ক্রয়ডনের মেয়র হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

এ কারণে মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব নেওয়ার আগে তাঁর ব্রিটিশ নাগরিকত্বের বর্তমান অবস্থা কী ছিল এবং বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা তিনি কীভাবে পূরণ করেছেন—এ বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য জনসমক্ষে দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছে সংগঠনটি।

সাংবাদিকদের প্রশ্নে প্রতিমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া

সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিয়মিত ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকেরা হুমায়ুন কবিরের নাগরিকত্বের বিষয়টি জানতে চান। প্রশ্নের জবাবে ক্যামেরার সামনে তিনি বলেন, ‘কোন নিউজপেপার? কার এত জ্বালা যে কাজ করতে দেবে না, হ্যাঁ? তো তার জ্বালা কেন হচ্ছে? তার কি ২০০৮-এর জ্বালা উঠছে নাকি আবার? মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের জ্বালা উঠছে তার আবার? নাকি?’

বিজেআইএম বলেছে, সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রীর এই ধরনের বিদ্রূপাত্মক ও আক্রমণাত্মক ভাষা গ্রহণযোগ্য নয়। সংগঠনটির মতে, প্রশ্নটির বিষয় ছিল একজন মন্ত্রিসভা সদস্যের সাংবিধানিক যোগ্যতা; তাই এর জবাব হওয়া উচিত ছিল তথ্যভিত্তিক ও সুনির্দিষ্ট।

সংগঠনটি আরও বলেছে, প্রতিমন্ত্রী মূল প্রশ্নটির সরাসরি উত্তর দেননি। বরং তাঁর বক্তব্যে প্রশ্নকারী সংবাদমাধ্যমের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে—এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে।

‘এ ধরনের আচরণ সাংবাদিকদের ভয় দেখাতে পারে’

বিজেআইএমের মতে, সাংবাদিকেরা সরকারি কর্মকর্তাদের বৈধ ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রশ্ন করলে তাঁদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে চিহ্নিত করা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য উদ্বেগজনক।

সংগঠনটি বলেছে, একজন মন্ত্রিসভা সদস্য এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার এ ধরনের আচরণ শুধু অশোভন নয়; এটি স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের মৌলিক ভূমিকার জন্যও ক্ষতিকর। এ ধরনের আচরণ এমন একটি ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করতে পারে, যেখানে সাংবাদিকেরা সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে নিজেরাই সীমাবদ্ধতা আরোপ করতে শুরু করবেন।

বিজেআইএমের ভাষ্য অনুযায়ী, সাংবাদিকদের এভাবে নিরুৎসাহিত করা হলে সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড নিয়ে জনস্বার্থে প্রশ্ন তোলার সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের সক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

অতীতের প্রবণতার সঙ্গে তুলনা

বিজেআইএমের বিবৃতিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অতীতের একটি প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়েছে। সংগঠনটি বলেছে, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ ধরনের প্রবণতা প্রায়ই দেখা গেছে।

সংগঠনটির দাবি, সাংবাদিকদের প্রশ্নকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে আখ্যায়িত করা বা তাঁদের কটাক্ষ করার প্রবণতা স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের জন্য ইতিবাচক নয়। বর্তমান সরকারের ক্ষেত্রেও একই ধরনের আচরণ যাতে ফিরে না আসে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে তারা।

বিজেআইএম মনে করে, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের প্রতি রাষ্ট্রীয় আচরণের মানও পরিবর্তিত হওয়া উচিত। সাংবাদিকদের কাজকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে না দেখে জনস্বার্থে তথ্য অনুসন্ধানের দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

মন্তব্য প্রত্যাহারের দাবি

হুমায়ুন কবিরের বক্তব্যের নিন্দা জানানোর পাশাপাশি তাঁকে প্রকাশ্যে তাঁর মন্তব্য প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে বিজেআইএম।

সংগঠনটির মতে, প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে সাংবাদিকদের প্রতি যে কটাক্ষ ও আক্রমণাত্মক মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে, তা প্রত্যাহার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নাগরিকত্বের প্রশ্নটি এড়িয়ে না গিয়ে যথাযথ তথ্যের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার করা উচিত।

বিজেআইএম বলেছে, নাগরিকত্বের অবস্থা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা রাজনৈতিক বিতর্ক হিসেবে উড়িয়ে না দিয়ে সাংবিধানিক ও আইনগত অবস্থানের আলোকে স্পষ্ট করা দরকার।

নাগরিকত্ব ও সাংবিধানিক যোগ্যতার স্পষ্ট ব্যাখ্যা চায় সংগঠনটি

বিজেআইএমের বিবৃতিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে হুমায়ুন কবিরের নাগরিকত্বের অবস্থা এবং মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালনের সাংবিধানিক যোগ্যতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের ওপর।

সংগঠনটি বলেছে, হুমায়ুন কবির ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছিলেন কি না—এ বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য দেওয়া প্রয়োজন। যদি তিনি নাগরিকত্ব ত্যাগ করে থাকেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া ও তারিখ সম্পর্কেও পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেওয়া যেতে পারে বলে সংগঠনটির বক্তব্য।

তবে শুধু প্রশ্নকারী সংবাদমাধ্যমের সমালোচনা না করে মূল প্রশ্নের উত্তর দেওয়াই অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে বিজেআইএম। কারণ মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে একজন ব্যক্তির সাংবিধানিক যোগ্যতা জনস্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

‘সাংবাদিকেরা প্রতিপক্ষ নন’

বিজেআইএমের বিবৃতিতে সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলা হয়েছে, সাংবাদিকেরা কোনো প্রতিপক্ষ নন, যাঁদের কটাক্ষ বা ভয় দেখাতে হবে। তাঁরা নাগরিকদের পক্ষ থেকে প্রশ্ন করেন এবং জনস্বার্থে তথ্য তুলে ধরেন।

সংগঠনটির ভাষ্য, একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংবাদমাধ্যম নাগরিক ও তাঁদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে প্রশ্ন করা, তথ্য চাওয়া এবং প্রয়োজন হলে জবাবদিহি নিশ্চিত করার চেষ্টা করা সাংবাদিকতার মৌলিক দায়িত্বের অংশ।

তাই সরকারি দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের উচিত সাংবাদিকদের প্রশ্নকে গণতান্ত্রিক জবাবদিহির স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখা।

স্বাধীন ও ভয়মুক্ত পরিবেশের আহ্বান

বিজেআইএম সরকারকে নিশ্চিত করতে বলেছে, সংবাদমাধ্যম যেন সততা, স্বাধীনতা ও ভয়মুক্ত পরিবেশে কাজ করতে পারে। সংগঠনটির মতে, সাংবাদিকেরা যদি সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া বা ব্যক্তিগত আক্রমণের আশঙ্কা করেন, তাহলে তা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য ক্ষতিকর হবে।

সরকারি কর্মকর্তা ও মন্ত্রীদের কাছ থেকে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে পেশাদারত্ব, সংযম ও তথ্যভিত্তিক অবস্থান প্রত্যাশিত বলেও সংগঠনটি মনে করে।

সবশেষে বিজেআইএম হুমায়ুন কবিরকে তাঁর বিতর্কিত মন্তব্য প্রত্যাহার করার পাশাপাশি নাগরিকত্বের অবস্থা এবং মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালনের সাংবিধানিক যোগ্যতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট জবাব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনটির মতে, রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রশ্নের তথ্যভিত্তিক উত্তর দেওয়াই একজন সরকারি দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাছ থেকে প্রত্যাশিত আচরণ।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স