ঢাকা

মিয়ানমারের জান্তা-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীর মেয়েকে নিষেধাজ্ঞা থেকে অব্যাহতি দিল যুক্তরাষ্ট্র

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং

নিষেধাজ্ঞার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত, ট্রাম্প প্রশাসনের মিয়ানমার নীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত

মিয়ানমারের সামরিক জান্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা এক ব্যবসায়ীর মেয়ের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়ের (ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট) ওয়েবসাইটে গত শুক্রবার প্রকাশিত তথ্য থেকে এ বিষয়টি জানা গেছে। নিষেধাজ্ঞার তালিকা থেকে নিজের নাম বাদ দেওয়ার দাবিতে ওই নারী আদালতে মামলা করেছিলেন। তাঁর নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ার পর আইনজীবী আদালতে মামলাটি প্রত্যাহারের নোটিশ দিয়েছেন।

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হওয়া ওই নারীর নাম থেইন্ট উইন থেট। তাঁর বাবা থেইন উইন জাও মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে সহায়তার অভিযোগে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় এসেছিলেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে থেইন উইন জাও, তাঁর পরিবার এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত শ্বে বায়াইন ফিউ গ্রুপ অব কোম্পানিজের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সমর্থনে গঠিত সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা শুরুর খবর প্রকাশের পর এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘটনা ঘটল। এতে মিয়ানমারের সামরিক শাসকদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আগের নীতির পরিবর্তন নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কারণ জানাল যুক্তরাষ্ট্র

থেইন্ট উইন থেটকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষভাবে মনোনীত ব্যক্তি ও অবরুদ্ধ ব্যক্তিদের তালিকা—স্পেশালি ডেজিগনেটেড ন্যাশনালস অ্যান্ড ব্লকড পারসনস (এসডিএন) তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এ তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সম্পদ সাধারণত অবরুদ্ধ থাকে। পাশাপাশি মার্কিন নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানগুলোর তাঁদের সঙ্গে অধিকাংশ ধরনের লেনদেনের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকে।

নাম প্রত্যাহারের বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেন, এ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে প্রশাসনের সেই মূল্যায়ন প্রতিফলিত হয়েছে যে, মিয়ানমার-সংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত লক্ষ্য অর্জনে থেইন্ট উইন থেটের তালিকাভুক্তি আর কার্যকর ভূমিকা রাখছে না।

মুখপাত্র আরও বলেন, মিয়ানমারের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারগুলো এগিয়ে নিতে প্রশাসন বিভিন্ন উপায় ব্যবহার করছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রতারণাকেন্দ্র বা স্ক্যাম সেন্টার দমন, মার্কিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ উন্নত করা এবং চলমান সহিংসতা ও মানবিক সংকট মোকাবিলায় শান্তিপ্রক্রিয়াকে উৎসাহিত করা।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ওই মুখপাত্র মিয়ানমারের আগের নাম ‘বার্মা’ ব্যবহার করেন। দেশটির সামরিক শাসন ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে এই নামের ব্যবহার দীর্ঘদিন ধরেই দেখা যায়।

সামরিক বাহিনীকে সহায়তার অভিযোগে নিষেধাজ্ঞা

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন সামরিক জান্তার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সামরিক বাহিনীকে সহায়তার অভিযোগে কয়েকটি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে ব্যাপক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সশস্ত্র সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। সামরিক বাহিনী, গণতন্ত্রপন্থী প্রতিরোধগোষ্ঠী এবং বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনের মধ্যে লড়াইয়ে দেশটির বহু মানুষ নিহত ও বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে সংঘাতে আনুমানিক এক লাখ মানুষের মৃত্যুর এবং ৩৫ লাখের বেশি মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে সামরিক জান্তার অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এসব নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য ছিল সামরিক বাহিনীর অর্থের জোগান ও আন্তর্জাতিক লেনদেনের সুযোগ সীমিত করা।

বাবার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ ছিল

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় শ্বে বায়াইন ফিউ গ্রুপ অব কোম্পানিজ, প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা থেইন উইন জাও এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনে।

মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ ছিল, প্রতিষ্ঠানটি মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর পক্ষে জ্বালানি তেল আমদানি ও বিতরণ করত। এ ছাড়া থেইন উইন জাওয়ের পরিবার সামরিক জান্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা অন্তত ২০টি কোম্পানির মালিক বলে মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল।

এসব অভিযোগের ভিত্তিতে থেইন্ট উইন থেটের নামও নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে তিনি দাবি করেন, বাবার ব্যবসায় তাঁর সক্রিয় কোনো ভূমিকা নেই। সেই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞার কারণে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে আদালতে অভিযোগ করেন তিনি।

আদালতে একাধিকবার আইনি লড়াই

নিষেধাজ্ঞার তালিকা থেকে নিজের নাম বাদ দেওয়ার দাবিতে থেইন্ট উইন থেট প্রথমে বাইডেন প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তবে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালত তাঁর মামলাটি খারিজ করে দেন।

এরপর চলতি বছরের জুলাইয়ে তিনি নতুন করে আদালতে অভিযোগ দায়ের করেন। সেখানে তিনি যুক্তি দেন, বাবার ব্যবসায় তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ নেই এবং পরিবারের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় রাখা ন্যায্য নয়। তিনি আরও দাবি করেন, নিষেধাজ্ঞার ফলে যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর পড়াশোনা ব্যাহত হয়েছে।

থেইন্ট উইন থেট নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছিলেন। পরে তিনি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি স্নাতকোত্তর প্রোগ্রামে ভর্তি হন। তাঁর অভিযোগ অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার কারণে এসব শিক্ষাগত কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

আদালতে দায়ের করা অভিযোগে বলা হয়, তাঁর মার্কিন ক্রেডিট কার্ডগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। বিদেশি ব্যাংক হিসাব ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়; কিছু হিসাব বন্ধ হয়ে যায় বা নতুন হিসাব খোলার সুযোগ বাধাগ্রস্ত হয়। এসব কারণে যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করতেও তিনি সমস্যায় পড়েন বলে অভিযোগে উল্লেখ করেন।

তিনি আরও জানান, বর্তমানে তিনি তাঁর মায়ের সঙ্গে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে বসবাস করছেন। গত বছর তাঁর মাকেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।

মামলার অবসান, আইনজীবীর নোটিশ

থেইন্ট উইন থেটের নাম নিষেধাজ্ঞার তালিকা থেকে বাদ পড়ার পর তাঁর আইনজীবী এরিক ফেরারি গত শুক্রবার ওয়াশিংটন ডিসির ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়ার মার্কিন জেলা আদালতে একটি নোটিশ জমা দেন। এতে তিনি স্বেচ্ছায় মামলাটি প্রত্যাহারের কথা জানান।

ফেরারি নিষেধাজ্ঞা-সংক্রান্ত বিষয়ে বিশেষজ্ঞ একজন আইনজীবী। তবে এ বিষয়ে রয়টার্সের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

মামলা প্রত্যাহারের নোটিশের মাধ্যমে থেইন্ট উইন থেটের আইনি লড়াইয়ের অবসান ঘটলেও তাঁর নাম বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ঘিরে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নীতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সিদ্ধান্তের সমালোচনা মানবাধিকার সংগঠনের

যুক্তরাষ্ট্রের এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে ‘জাস্টিস ফর মিয়ানমার’ নামের একটি সংগঠন। তাদের বক্তব্য, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী যখন বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা বাড়াচ্ছে, তখন জান্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর পরিবারের সদস্যদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার উদ্বেগজনক।

সংগঠনটি বলেছে, সামরিক জান্তার দমন-পীড়নে অর্থ জোগান দেওয়া ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের মার্কিন সরকার ধারাবাহিকভাবে নিষেধাজ্ঞার তালিকা থেকে বাদ দিচ্ছে। তাদের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ জান্তার আর্থিক নেটওয়ার্কের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ দুর্বল করতে পারে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, মিয়ানমারে তাদের নীতিগত লক্ষ্য অর্জনে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। প্রতারণাকেন্দ্র দমন, মার্কিন ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা এবং সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধান এগিয়ে নেওয়ার বিষয়গুলোকে প্রশাসন অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

মিয়ানমার নীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত?

রয়টার্সের আগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ট্রাম্প প্রশাসন মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সমর্থনে গঠিত সরকারের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে। ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর নির্বাচিত নেতাদের ক্ষমতাচ্যুত করা সামরিক নেতৃত্বকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন রাখার যে নীতি যুক্তরাষ্ট্র অনুসরণ করেছিল, নতুন প্রশাসনের উদ্যোগে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

থেইন্ট উইন থেটের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ওই বৃহত্তর নীতিগত পরিবর্তনের আলোচনাকে আরও সামনে এনেছে। তবে শুধু একজন ব্যক্তির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ানমার নীতিতে সম্পূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে বলে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

সামরিক জান্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক গোষ্ঠী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে কীভাবে নেওয়া হয়, তা পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে মিয়ানমারের চলমান সংঘাত, মানবিক সংকট এবং সামরিক বাহিনীর অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপও দেশটির নীতির দিকনির্দেশনা বুঝতে সহায়ক হবে।


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স