হাজারো কণ্ঠের একসঙ্গে গর্জনে কেঁপে উঠছিল মনুমেন্তাল স্টেডিয়াম। গ্যালারিজুড়ে একই নাম—‘মেসি, মেসি, মেসি’। জাতীয় দলের জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নামতে যাওয়া লিওনেল মেসিকে শেষবারের মতো নিজেদের ভালোবাসা জানাচ্ছিল আর্জেন্টিনার মানুষ।
কারও চোখে পানি, কেউ আবেগে কাঁপছেন। শিশু থেকে শুরু করে প্রবীণ—সবাই যেন একই অনুভূতিতে এক হয়ে গিয়েছিলেন। আর্জেন্টিনার ফুটবল মানেই যাঁদের কাছে মেসি, তাঁদের জন্য এই রাতটা ছিল বিদায়ের রাত।
একটি দেশের মানুষ নানা মত ও পরিচয়ে বিভক্ত হতে পারেন। কিন্তু মেসির বিদায়ের দিনে সেসব বিভাজন যেন কয়েক ঘণ্টার জন্য হারিয়ে গেল। সবাই শুধু একজন মানুষকে ঘিরে এক হয়ে গেলেন—আর্জেন্টিনার ইতিহাসের অন্যতম, হয়তো সর্বকালের সেরা ফুটবলারকে বিদায় জানাতে।
বিদায়ের আগেই ভেঙে পড়েছিলেন মেসি
স্টেডিয়ামে পৌঁছানোর আগেই আবেগ সামলাতে পারছিলেন না মেসি। দলের বাসে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে যেন ফিরে যাচ্ছিলেন নিজের অতীতের দিকে। জাতীয় দলের জার্সিতে কাটানো দুই দশকেরও বেশি সময়ের স্মৃতি একের পর এক চোখের সামনে ভেসে উঠছিল।
মনুমেন্তালে পৌঁছানোর পর আবেগ আরও বেড়ে যায়। সাজানো ড্রেসিংরুম, চারপাশে স্মৃতির আবহ—সবকিছুতেই যেন বিদায়ের ছাপ। পরিবারের সদস্যরা কোথায় আছেন, সেটিও আগে থেকেই নিশ্চিত করে নিয়েছিলেন তিনি।
ওয়ার্মআপের সময় গ্যালারি থেকে যখন হাজারো মানুষ উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে অভিবাদন জানালেন, তখন আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না মেসি। চারদিকে তাকিয়ে হাত নাড়লেন। যেন প্রতিটি দর্শককে আলাদা করে ধন্যবাদ জানাচ্ছিলেন।
জাতীয় সংগীতের সময় ফিরে গেলেন শৈশবে
তিন ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে মাঠে প্রবেশ করেন মেসি। আকাশের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। জাতীয় সংগীত বাজলেও এবার তাঁর কণ্ঠে গান ছিল না। আবেগ যেন গলা আটকে দিয়েছিল।
সম্ভবত মনে পড়ে গিয়েছিল দাদি সেলিয়ার কথা। ছোট্ট মেসির হাত ধরে যিনি তাঁকে মাঠে নিয়ে যেতেন। ফুটবলের প্রতি তাঁর ভালোবাসার শুরুর গল্পে দাদির ভূমিকা ছিল বিশাল।
আজও মেসি তাঁর জীবনের সেই মানুষদের ভুলে যাননি। তাঁর সাম্প্রতিক অ্যালবাম ‘লাস্ট ড্যান্স’ উৎসর্গ করেছেন দাদি সেলিয়া ও বাবা হোর্হের প্রতি। ফুটবলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটা যে কত গভীর, এই বিদায়ের মুহূর্তে সেটিই যেন সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠল।
বিদায়ী ম্যাচেও মেসির জাদু
বিদায়ী ম্যাচের আনুষ্ঠানিকতাগুলোও যথারীতি সম্পন্ন করলেন মেসি। প্রতিপক্ষ বেনিনের অধিনায়কের সঙ্গে উপহার বিনিময় করলেন। সতীর্থদের সঙ্গে আলিঙ্গন করলেন। এরপর শুরু হলো তাঁর জাতীয় দলের জার্সিতে শেষ ম্যাচ।
শুরুতে অবশ্য মেসি কিংবা আর্জেন্টিনা কেউই নিজেদের সেরা ছন্দে ছিল না। বেনিনের খেলোয়াড়েরাও বারবার মেসির কাছে এসে তাঁকে সম্মান জানাচ্ছিলেন।
কিন্তু ম্যাচ যত এগিয়েছে, মেসি ততই নিজের পরিচিত রূপে ফিরেছেন।
দ্বিতীয়ার্ধে নিকোলাস ওতামেন্দির গোলে তাঁর অবদান ছিল সরাসরি। এরপর নিকো পাজকে গোলের সুযোগ তৈরি করে দেন। আর শেষ পর্যন্ত নিজেই পেনাল্টি থেকে গোল করে ম্যাচের স্কোর ৩-০ করেন।
সতীর্থরা তাঁকে ঘিরে ধরলেন। মেসি হাসছিলেন, আর চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা খেলোয়াড়েরা তাঁকেই করে তুলেছিলেন উদযাপনের কেন্দ্রবিন্দু।
জাতীয় দলের জার্সিতে এটি ছিল তাঁর ১২৬তম গোল। বিদায়ের রাতেও যেন দাদি সেলিয়ার জন্য আরেকটি উপহার দিয়ে গেলেন তিনি।
যে স্বপ্নটা ছিল শুধু ফুটবল
ছোটবেলায় মেসির চাওয়া খুব বেশি ছিল না। তিনি শুধু ফুটবল খেলতে চেয়েছিলেন। আজ তাঁর তিন ছেলে থিয়াগো, মাতেও ও সিরোও বল দেখলে ছুটে যায়।
বিশ্বকাপ জয়ের রাতেও তাদের হাতে ছিল ফুটবল। বাবার মতোই তারা ছুটছিল মাঠজুড়ে। সেই দৃশ্যের মধ্যে যেন অনেক বছর আগের ছোট্ট লিওকে দেখা যাচ্ছিল।
গ্রান্দোলির মাঠ কিংবা রোজারিওর রাস্তায় বল নিয়ে ছুটে বেড়ানো সেই ছেলেটিই আজ বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফুটবলার।
বাধা পেরিয়ে এত দূরের পথ
ছোটবেলার স্বপ্ন ছিল নিউয়েলস ওল্ড বয়েজের হয়ে খেলা, আর একদিন আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সি পরা। কিন্তু পথটা সহজ ছিল না।
গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি তাঁর ক্যারিয়ারকে শৈশবেই অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। চিকিৎসা, অসংখ্য ইনজেকশন, পরিবারের কাছ থেকে দূরে চলে যাওয়া—সবকিছুর মধ্য দিয়েই এগিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে।
রোজারিওর সেই ছোট্ট ছেলেটি একসময় স্পেনে পাড়ি জমালেন। নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ, নতুন জীবন। কিন্তু আর্জেন্টিনার হয়ে খেলার স্বপ্নটা কখনো ছাড়েননি।
আজ সেই মানুষটি ৩৯ বছরের বাবা। আন্তোনেলার স্বামী। সেলিয়ার ছেলে, হোর্হের সন্তান। সতীর্থদের বন্ধু এবং নতুন প্রজন্মের অসংখ্য ফুটবলারের অনুপ্রেরণা।
নিকো পাজ কিংবা ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুওনোর মতো তরুণদের কাছে তিনি শুধু একজন কিংবদন্তি নন—তিনি শৈশবের স্বপ্নের বাস্তব রূপ।
একবার বিদায় নিয়েও ফিরে এসেছিলেন
আজ থেকে প্রায় এক দশক আগে মেসি নিজেই জানিয়েছিলেন, জাতীয় দলের হয়ে আর খেলবেন না।
কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের পর চারপাশের সমালোচনা তাঁকে ভেঙে দিয়েছিল। অভিমানে জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
কিন্তু আর্জেন্টিনা কি মেসিকে ছেড়ে থাকতে পারে? মেসিও পারেননি।
সেই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হয়নি। বরং পরবর্তী বছরগুলোতে তিনি এমন এক অধ্যায় লিখেছেন, যা হয়তো কোনো ফুটবলারের পক্ষেই পুনরাবৃত্তি করা সম্ভব নয়।
দ্বিতীয় কোপা আমেরিকা জয়, বিশ্বকাপ জয়—একসময় যে ট্রফিগুলো তাঁর ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা ছিল, সেগুলোও শেষ পর্যন্ত নিজের করে নিয়েছেন।
অপূর্ণ গল্পটা শেষ পর্যন্ত পূর্ণ হলো
৩৫ বছর বয়সে বিশ্বকাপ হাতে তুলেছেন মেসি। ৩৭ বছর বয়সে জিতেছেন আরেকটি কোপা আমেরিকা। ৩৯ বছর বয়সেও বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন।
ক্যারিয়ারের শেষ দিকেও তাঁর পায়ে ছিল সেই পুরোনো জাদু। দুই তরুণ প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে বেরিয়ে যাওয়া, এরপর সতীর্থকে নিখুঁত পাসে গোলের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া—মেসির এমন মুহূর্ত দেখলে মনে হয়, বয়স যেন তাঁর ফুটবলকে স্পর্শই করতে পারেনি।
মেসির সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো ট্রফি নয়
ভবিষ্যতে মানুষ মেসির গোল গুনবে। ট্রফির হিসাব করবে। রেকর্ড নিয়ে আলোচনা করবে। তাঁর অসংখ্য জাদুকরী মুহূর্তের ভিডিও দেখবে।
কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হয়তো অন্য কিছু—নিষ্ঠা।
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিজেকে ধরে রাখা, বারবার ব্যর্থতার পর ফিরে আসা এবং শেষ পর্যন্ত নিজের স্বপ্ন পূরণ করা—এটাই মেসির গল্পের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
ব্যক্তিগত জীবনে কঠিন সময় এলেও মাঠে নিজের দায়িত্ব থেকে সরে যাননি। বাবার অসুস্থতা, পরিবারের নানা চাপ, ক্যারিয়ারের কঠিন সময়—সবকিছুর মাঝেও তিনি মাঠে নেমেছেন এবং নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
বেনিনের বিপক্ষে শেষ ম্যাচেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত নিজেকে উজাড় করে খেলেছেন।
মেসি হয়তো জাতীয় দলের জার্সি তুলে রাখলেন। কিন্তু মেসির গল্প কখনো শেষ হবে না।
কারণ একজন খেলোয়াড় বিদায় নিতে পারেন, কিন্তু তাঁর তৈরি করা স্মৃতি, অনুপ্রেরণা আর ফুটবলের ওপর রেখে যাওয়া ছাপ থেকে যায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম।