ঢাকা

রুমিনের বক্তব্য ঘিরে সংসদে উত্তপ্ত পরিস্থিতি, গালাগালের অভিযোগ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদে বুধবার ব্যাপক হট্টগোল হয়েছে। বিএনপি সরকারের সমালোচনা করে রুমিন বক্তব্য দেওয়ার সময় দলটির সংসদ সদস্যরা হইচই করে প্রতিবাদ জানান। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে সংসদের স্বাভাবিক কার্যক্রম কিছু সময়ের জন্য ব্যাহত হয়।

হট্টগোলের মধ্যেই রুমিন ফারহানা অভিযোগ করেন, তাঁকে উদ্দেশ করে অশালীন ভাষায় গালাগাল করা হয়েছে। এ ঘটনায় সংসদে উপস্থিত ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল একাধিকবার সদস্যদের শান্ত হওয়ার আহ্বান জানান এবং বলেন, কোনো সদস্যের বক্তব্যে আপত্তি থাকলে নিয়ম অনুযায়ী তার জবাব দেওয়া যেতে পারে; কিন্তু বক্তব্যে বাধা দেওয়া সংসদীয় গণতান্ত্রিক রীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

বুধবার ব্যাংক রেজোল্যুশন (সংশোধন) বিল পাসের আলোচনায় অংশ নিয়ে রুমিন ফারহানা বিএনপি সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা শুরু করলে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। একাদশ জাতীয় সংসদে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য ছিলেন রুমিন। বর্তমান সংসদে তিনি স্বতন্ত্র সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

বিএনপি ক্ষমতায় এলে সংকট হবে—রুমিন

বিলের আলোচনায় অংশ নিয়ে রুমিন ফারহানা বলেন, প্রত্যেক সরকারেরই একটি নির্দিষ্ট চরিত্র থাকে। বিএনপি ক্ষমতায় এলে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট হবে না—এমনটা হতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

রুমিন বলেন, ‘‘বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আর গ্যাস–বিদ্যুৎ সংকট হবে না, এটা হইতে পারে না। বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আবার সারের সংকট হবে না, গরিব কৃষক সারকারখানায় গিয়ে সেটা লুট করবেন না; সেটাও হতে পারে না।’’

তাঁর এ বক্তব্যের পর বিএনপির সংসদ সদস্যরা হইচই করে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেন। তবে সেই হট্টগোলের মধ্যেই রুমিন তাঁর বক্তব্য চালিয়ে যান।

তিনি বলেন, ‘‘বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আর দুর্নীতিতে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হবে না, সেটাও হওয়া সম্ভব না, মাননীয় স্পিকার।’’

এ সময় বিএনপির সদস্যদের হইচই আরও বেড়ে যায়। এরপর রুমিন বিএনপি সরকারের সময়ে ঋণখেলাপির পরিমাণ নিয়েও সমালোচনা করেন।

তিনি বলেন, ‘‘বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আর বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ঋণখেলাপিতে সর্বোচ্চ স্থান অর্জন করবে না, সেটাও হইতে পারে না। সুতরাং বিএনপি ক্ষমতায় আসা মানে ঋণখেলাপিতে সর্বোচ্চ হওয়া, ৬ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকার ওপরে ঋণখেলাপি হওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি।’’

‘মনে হয় যেন আওয়ামী লীগের আমলে ফিরে গেছি’

বিএনপির সদস্যদের হইচইয়ের মধ্যেই রুমিন ফারহানা সংসদের পরিবেশ নিয়ে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘‘মাননীয় স্পিকার, এত অসহিষ্ণু সংসদ, মনে হয় যেন আওয়ামী লীগের আমলে ফিরে গেছি আমরা। মজা, মন্দ না। আওয়ামী লীগকে যখন বলতাম, তখন তারাও হট্টগোল করত। এখন বিএনপি একই ধরনের আচরণ করছে। আরও খারাপ আচরণ।’’

এরপর সংসদ সদস্যদের ঋণখেলাপি হওয়া এবং নির্বাচনের আগে ঋণখেলাপির তালিকা থেকে নাম কাটানোর প্রসঙ্গও তোলেন রুমিন।

তিনি বলেন, ‘‘এই সংসদে বেশির ভাগ সংসদ সদস্য ঋণখেলাপি হিসেবে পরিচিত। নির্বাচনের আগে নামটা কাটানোর জন্য হাইকোর্টে গিয়ে রিট করা, এগুলো আমাদের পুরোনো সংস্কৃতি। এগুলো আমরা বহুত দেখেছি।’’

মাইক বন্ধের পরও চলতে থাকে হট্টগোল

রুমিন ফারহানার জন্য নির্ধারিত বক্তব্যের সময় শেষ হয়ে গেলে তাঁর মাইক বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু তখনো সংসদে হইচই-হট্টগোল চলছিল। রুমিন মাইক ছাড়াই দাঁড়িয়ে কথা বলতে থাকেন।

এ সময় তিনি স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে অভিযোগ করেন, তাঁকে অশালীন ভাষায় গালাগাল করা হয়েছে। ডেপুটি স্পিকার তাঁকে বারবার আসনে বসার অনুরোধ করলেও তিনি দাঁড়িয়ে থেকে কথা বলতে থাকেন।

হট্টগোলের মধ্যে এনসিপির সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদও দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানান। মাইক ছাড়া তাঁকে বলতে শোনা যায়, একজন সংসদ সদস্যকে এভাবে গালাগাল করা যায় না।

এ সময় সভাপতির আসনে থাকা ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বারবার সদস্যদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনিও দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেন। তবে কিছু সময় ধরে সংসদে হইচই অব্যাহত থাকে।

‘কথা বলার স্বাধীনতা আছে’

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, একজন সংসদ সদস্য বক্তব্য দিচ্ছেন এবং তাঁর কথা বলার স্বাধীনতা রয়েছে। কোনো সদস্যের বক্তব্যে আপত্তি থাকলে তা সংসদীয় নিয়মের মধ্যেই মোকাবিলা করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ডেপুটি স্পিকার বলেন, ‘‘একজন সদস্য বক্তব্য রাখছেন। তাঁর কথা বলার স্বাধীনতা আছে। কিন্তু অন্য সদস্যরা ওনার বক্তব্যে বাধা প্রদান, সেটা কিন্তু গণতান্ত্রিক রীতিনীতির বাইরে।’’

রুমিন তখনো দাঁড়িয়ে কথা বলার চেষ্টা করছিলেন। তাঁকে বসার অনুরোধ করেন ডেপুটি স্পিকার।

চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনির উদ্দেশে কায়সার কামাল বলেন, ‘‘সংসদ সদস্যদের প্রত্যেকের এখানে লিবার্টি আছে, তাঁরা তাঁদের বক্তব্য উপস্থাপন করবেন। আপনাদের টার্ন যখন আসে, আপনারা তখন সেটা খণ্ডন করবেন। কিন্তু বক্তব্য প্রদানে বাধা কোনো অবস্থাতেই কাম্য নয়।’’

এরপর বিলের আলোচনায় অংশ নেওয়ার জন্য আরেক স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য শেখ মুজিবুর রহমানকে আহ্বান জানান তিনি। তখনো সংসদে হইচই চলছিল। রুমিন ফারহানা ও আবদুল হান্নান মাসউদকে দাঁড়িয়ে কিছু বলতে দেখা যায়। তাঁদেরও বসার অনুরোধ করেন ডেপুটি স্পিকার। পরে শেখ মুজিবুর রহমান বক্তব্য দেন।

‘অসংসদীয় হলে স্পিকার রুলিং দিতে পারেন’

পরিস্থিতির মধ্যে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান দাঁড়িয়ে বলেন, কোনো সংসদ সদস্যের বক্তব্য অসংসদীয় হলে স্পিকার তা রুলিংয়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে পারেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীও এর জবাব দিতে পারেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

শফিকুর রহমান বলেন, ‘‘আজকে উনি কী বললেন, আমরা তো একেবারেই বুঝতে পারলাম না। উনি কি গালি দিলেন না দোয়া দিলেন, কিছুই বুঝলাম না। এখন আসলেই কি তিনি বক্তব্য রাখতে পারলেন?’’

এরপর চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, তাঁরা সংসদে সব সমস্যার সমাধান চান। তবে সংসদে কেউ নিজেরাই সমস্যা তৈরি করলে সেটি সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।

বর্তমান সরকার একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি ও ভঙ্গুর রাজনৈতিক পরিস্থিতি পেয়েছে উল্লেখ করে চিফ হুইপ বলেন, একজন সংসদ সদস্য বক্তব্য দেওয়ার সময় তাঁর নিজেরও কিছু বিষয় বিবেচনায় রাখা দরকার। তিনি বলেন, মাত্র কয়েক দিন আগেও রুমিন ফারহানা বিএনপির পক্ষে কথা বলেছেন।

চিফ হুইপের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন ডেপুটি স্পিকার

চিফ হুইপের বক্তব্যের পর ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল আবারও সংসদে শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়টি তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ‘‘চিফ হুইপ হিসেবে আপনারও কিন্তু রেসপন্সিবিলিটি আছে, হুইপিং দ্য মেম্বারস অব দ্য পার্লামেন্ট। একজন সম্মানিত সদস্য, উনি কথা বলতে পারবেন, অসংসদীয় হলে সেটা এই চেয়ার থেকে এক্সপাঞ্জ করা হবে। কিন্তু সেটাকে বাধাগ্রস্ত করা, এটা ঠিক না। আর চিফ হুইপ হিসাবে আপনার মূল দায়িত্ব হাউসের শৃঙ্খলা রাখা।’’

ডেপুটি স্পিকারের বক্তব্যে সংসদীয় কার্যক্রমে সদস্যদের বক্তব্য দেওয়ার অধিকার এবং একই সঙ্গে সংসদের শৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্ব—দুই বিষয়ই গুরুত্ব পায়।

‘অপ্রাসঙ্গিক আলোচনা চলে আসছে’

পরে ব্যাংক রেজোল্যুশন (সংশোধন) বিলের আলোচনায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বক্তব্য দেন। সংসদে চলা বিতর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আলোচনার বিষয়টি তিনি বুঝতে পারছেন না।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘‘আমি তো বিষয় কী, সেটাই বুঝতে পারছি না। আমি কী বললাম, আলোচনা কী হলো?’’

তিনি এ ধরনের আলোচনাকে দুঃখজনক উল্লেখ করে বলেন, একটি সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক আলোচনা সংসদে চলে এসেছে।

গালাগালের অভিযোগ রুমিনের

সংসদের ঘটনা নিয়ে পরে রুমিন ফারহানা প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপির সংসদ সদস্যরা তাঁকে অশালীন ভাষায় গালাগাল করেছেন। এ সময় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

একই ঘটনায় সংসদে বিরোধী দলের সদস্যরা রুমিনের বক্তব্যের ধরন নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। অন্যদিকে রুমিনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাঁর বক্তব্যে আপত্তি থাকলে সংসদীয় নিয়ম অনুযায়ী তার জবাব দেওয়া যেত; কিন্তু তাঁকে গালাগাল ও হট্টগোল করে বক্তব্যে বাধা দেওয়া হয়েছে।

ফলে একটি বিলের আলোচনাকে কেন্দ্র করে বুধবার জাতীয় সংসদে রাজনৈতিক বক্তব্য, পাল্টাপাল্টি প্রতিবাদ এবং সংসদীয় আচরণ নিয়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স