বাসস, ঢাকা
শিক্ষকতাকে কোনোভাবেই ‘উপায়হীন বিকল্প’ কিংবা সাধারণ চাকরির মতো পেশা হিসেবে দেখতে চায় না সরকার। বরং শিক্ষাজীবনে সবচেয়ে মেধাবী ও যোগ্য শিক্ষার্থীরা যাতে কর্মজীবনে শিক্ষকতাকেই প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নেন, সে লক্ষ্যেই শিক্ষক নিয়োগ ও দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেছেন, শিক্ষকদের সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে রাষ্ট্রের মর্যাদা ও ভাবমূর্তি সরাসরি জড়িত। সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকলে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল হয়।
আজ সোমবার দুপুরে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে জাতীয় পর্যায়ের ‘গুণী শিক্ষক সম্মাননা’ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে নির্বাচিত শিক্ষকদের সম্মাননা দেওয়া হয়।
এ বছরের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য—‘শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানো: পেশা সুরক্ষার ৬০ বছর, মর্যাদা উন্নয়ন এবং আমাদের ভবিষ্যৎ গঠন’।
প্রধানমন্ত্রী দেশের সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ, মাদ্রাসা, কারিগরি প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানান। পাশাপাশি নিজেদের মেধা ও যোগ্যতার স্বীকৃতি হিসেবে ‘গুণী শিক্ষক’ সম্মাননা পাওয়া শিক্ষকদের অভিনন্দন জানান তিনি।
তারেক রহমান বলেন, শিক্ষকেরা যদি শিক্ষার্থীদের কাছে ‘প্রয়োজন এবং প্রিয়জন’ হয়ে উঠতে পারেন, তাহলে শিক্ষাদীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা এবং ভবিষ্যতের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা অনেক সহজ হবে।
শিক্ষকরাই শিক্ষার্থীদের আদর্শ রোল মডেল
পারিবারিক পাঠশালার গণ্ডি পেরোনোর পর প্রতিটি শিক্ষার্থীর সামনে শিক্ষক-শিক্ষিকারাই অন্যতম ‘আদর্শ রোল মডেল’ হয়ে ওঠেন বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তাই শিক্ষকেরা যাতে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সামনে নিজেদের রোল মডেল হিসেবে তুলে ধরতে পারেন, সে ধরনের পরিকল্পনা সরকার প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করছে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের এই সময়ে প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতির বাইরে গিয়ে কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। এ কারণে ‘শিখন’ ও ‘শিক্ষণ’ পদ্ধতির কৌশলে পরিবর্তন আনা এবং সময়োপযোগী সিলেবাস আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি।
বাস্তবতার নিরিখে সরকার নতুন সিলেবাস প্রণয়ন করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, এ বছরের মধ্যেই শিক্ষার্থীরা নতুন সিলেবাস অনুযায়ী বই হাতে পাবে।
শিক্ষার্থীরা যাতে বইবিমুখ হয়ে না ওঠে, সে জন্য শিখন ও শিক্ষণ পদ্ধতির গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের মনে ‘কেন’ এবং ‘কীভাবে’—এই প্রশ্নগুলো জাগিয়ে তুলতে হবে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি করতে পারলে তারা একপর্যায়ে নিজেরাই নিজেদের শিক্ষক হয়ে উঠতে পারে।
আনন্দময় শিক্ষায় গুরুত্ব
‘আনন্দময় শিক্ষা’ এখন সারা বিশ্বে, বিশেষ করে স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে বলে উল্লেখ করেন তারেক রহমান।
তিনি জানান, বাংলাদেশেও এবার প্রথমবারের মতো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের হাতে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ শিরোনামে নতুন একটি বই তুলে দেওয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্যও এ ধরনের বই দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি শিক্ষকদের সামনেও নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের টিচার্স ট্রেনিং কলেজগুলোকে আরও আধুনিক করা জরুরি।
শহর-গ্রামের শিক্ষাবৈষম্য কমানোর উদ্যোগ
মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাব্যবস্থার ব্যাপ্তি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে বর্তমানে প্রায় ২১ হাজার মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে তিন লাখের বেশি শিক্ষক কোটিরও বেশি শিক্ষার্থীকে শিক্ষা দিচ্ছেন। এ পর্যায়ের শিক্ষার বড় একটি অংশ বেসরকারি ও এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল।
তিনি বলেন, শিক্ষার সুযোগের ক্ষেত্রে শহর ও গ্রামের মধ্যে এখনো কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। তবে শহর কিংবা গ্রাম—সব এলাকার শিক্ষার্থী যাতে দক্ষ শিক্ষক ও আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা পায়, তা নিশ্চিত করতে সরকারের নানামুখী পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, এর মূল ভিত্তি হচ্ছে সমান সুযোগ, মানসম্মত শিক্ষা এবং বৈষম্যহীন প্রবেশাধিকার।
কর্মসংস্থানের পাশাপাশি নৈতিকতা ও চরিত্র গঠন
কর্মমুখী শিক্ষা প্রয়োজন হলেও কর্মসংস্থানই শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য নয় বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, নৈতিকতা ও চরিত্র গঠনও শিক্ষার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
তিনি বলেন, জ্ঞান যদি নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত না হয়, তাহলে সেই জ্ঞান সমাজের কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণের কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি নৈতিক মূল্যবোধ ও মানবিক গুণাবলিতে সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
বেতন-অবসর ভাতায় হয়রানি বন্ধের নির্দেশ
শিক্ষকদের বেতন ও অবসর ভাতা পাওয়ার ক্ষেত্রে হয়রানি বন্ধে সরকারের নির্দেশনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, একজন শিক্ষককে শুধু বেতন কিংবা অবসর ভাতার জন্য কষ্ট করে বিভিন্ন অফিসে ঘুরতে হবে না। যথানিয়মে ও যথাসময়ে তাঁর প্রাপ্য অর্থ ব্যাংকের মাধ্যমে পৌঁছে দিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের শিক্ষকেরাই জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। তাই তাঁদের পেশাগত মর্যাদা, অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষার মানোন্নয়নেও গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশ্ব শিক্ষক দিবস
শিক্ষকদের মর্যাদা, অধিকার ও পেশাগত উন্নয়ন এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরতে প্রতিবছর ৫ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালন করা হয়।
অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন সভাপতিত্ব করেন। এতে আরও বক্তব্য দেন জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহদী আমিন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. সেলিম ভূঁইয়া।