ঢাকা

প্রান্তিক অবস্থান থেকে ইংরেজির মূলধারায় উত্তরণ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং

কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল বা জীবনবৃত্তান্ত তৈরির জন্য ইংরেজি শেখার প্রচলিত ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে কর্মক্ষেত্র ও পেশাভিত্তিক ইংরেজি শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বাড়ছে। প্রযুক্তি, ব্যবসা, স্বাস্থ্যসেবা, ফ্যাশনসহ বিভিন্ন খাতে আন্তর্জাতিক পরিসরে কাজের সুযোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্দিষ্ট পেশার প্রয়োজন অনুযায়ী ইংরেজি ব্যবহারের দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ইংরেজি শেখানোর ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে শ্রেণিকক্ষের পাঠ্যসূচি ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলেও কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ দক্ষতার সঙ্গে এর যথেষ্ট সমন্বয় নেই বলে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। ফলে একজন শিক্ষার্থী ব্যাকরণ ও প্রচলিত ইংরেজি ব্যবহারে দক্ষ হলেও পেশাগত প্রতিবেদন লেখা, বিদেশি ক্লায়েন্টের সঙ্গে যোগাযোগ, উপস্থাপনা কিংবা ব্যবসায়িক দর-কষাকষির মতো বাস্তব কাজের ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে পারেন।

এই ব্যবধান দূর করে শিক্ষার্থীদের কর্মক্ষেত্রের উপযোগী ইংরেজি দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়ে আয়োজন করা হচ্ছে দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘ইউল্যাব-টেসল বিডি ২য় আন্তর্জাতিক ইএসপি সম্মেলন’।

ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)-এর সেন্টার ফর ল্যাঙ্গুয়েজ স্টাডিজ (সিএলএস) এবং টেসল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (টেসল বিডি) যৌথভাবে এ সম্মেলনের আয়োজন করছে। আগামী ৯ অক্টোবর ইউল্যাব ক্যাম্পাসে সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হবে। সকাল ৯টায় সম্মেলনের উদ্বোধন করবেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, এমপি।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. মাসুমা হাবিব এবং প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আনিসুল হক। যুক্তরাজ্যের ইএসপি বিশেষজ্ঞ নাইজেল কিলিক সম্মেলনে মূল বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেবেন।

কী এই ইএসপি

‘ইএসপি’ বা ‘ইংলিশ ফর স্পেসিফিক পারপাসেস’ বলতে নির্দিষ্ট পেশা, কর্মক্ষেত্র কিংবা প্রয়োজন অনুযায়ী ইংরেজি ভাষা শেখানোকে বোঝায়। সাধারণ ইংরেজি শিক্ষার ক্ষেত্রে ভাষার মৌলিক দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হলেও ইএসপিতে কোনো নির্দিষ্ট পেশায় ভাষার ব্যবহার কীভাবে করতে হবে, তার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

উদাহরণ হিসেবে একজন প্রকৌশলীর জন্য প্রযুক্তিগত প্রতিবেদন লেখা, পেশাগত উপস্থাপনা দেওয়া কিংবা আন্তর্জাতিক সহকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য যে ধরনের ভাষাগত দক্ষতা প্রয়োজন, তা সাধারণ ইংরেজি শিক্ষার চেয়ে আলাদা। একইভাবে একজন ব্যবসায়িক শিক্ষার্থীর জন্য বিদেশি ক্লায়েন্টের সঙ্গে যোগাযোগ, চুক্তি নিয়ে আলোচনা বা পেশাগত ই-মেইল লেখার দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ।

সম্মেলনটির মূল আলোচনার একটি বিষয় হলো—বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে অর্জিত ইংরেজি দক্ষতা কীভাবে শিক্ষার্থীদের বাস্তব কর্মক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য করে তোলা যায়।

শিক্ষাব্যবস্থা ও কর্মক্ষেত্রের মধ্যে সংযোগ

আয়োজকদের মতে, বর্তমান শ্রমবাজারে শুধু বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান থাকাই যথেষ্ট নয়। শিক্ষার্থীদের পেশাগত যোগাযোগ, সমস্যা সমাধান, উপস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশে কাজ করার সক্ষমতাও প্রয়োজন। কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতের প্রয়োজনের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি থাকলে অনেক শিক্ষার্থী চাকরিতে প্রবেশের পর নতুন করে এসব দক্ষতা অর্জনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সম্মেলনে শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের চাহিদার মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক, শিল্প খাতের প্রতিনিধি এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পেশাগত ইংরেজি দক্ষতা কীভাবে আরও কার্যকরভাবে গড়ে তোলা যায়, সে বিষয়ে মতবিনিময় হবে।

তিনটি প্রধান লক্ষ্য

সম্মেলনটির আয়োজকদের পক্ষ থেকে তিনটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

প্রথমত, শ্রেণিকক্ষের সঙ্গে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও বাস্তব কর্মক্ষেত্রের সংযোগ আরও শক্তিশালী করা। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার সময়ই ভবিষ্যৎ পেশায় প্রয়োজনীয় ভাষাগত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবেন।

দ্বিতীয়ত, চাকরি-উপযোগী ইংরেজি দক্ষতা তরুণদের ক্যারিয়ার উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক কর্মপরিবেশে কাজের সক্ষমতা এবং জাতীয় অর্থনীতিতে তাঁদের সম্ভাব্য অবদানকে কীভাবে বাড়াতে পারে, তা তুলে ধরা।

তৃতীয়ত, স্নাতক পর্যায়ে ইংরেজি শিক্ষাকে আরও পেশাভিত্তিক ও ব্যবহারিক করে তুলতে নীতিনির্ধারকদের জন্য বাস্তবসম্মত ও কার্যকর পরামর্শ তৈরি করা।

শুধু ভাষা শিক্ষা নয়, কর্মদক্ষতার অংশ

বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন এবং কর্মক্ষেত্রের আন্তর্জাতিকীকরণের ফলে ভাষা ব্যবহারের ধরনও বদলে যাচ্ছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল যোগাযোগ ও বৈশ্বিক ব্যবসার বিস্তারের কারণে বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ যেমন বেড়েছে, তেমনি পেশাগত যোগাযোগে দক্ষতার প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে।

এ অবস্থায় শিক্ষার্থীদের শুধু ইংরেজি ভাষার নিয়ম শেখানোর পরিবর্তে তাঁরা বাস্তব জীবনে ভাষাটি কীভাবে ব্যবহার করবেন, সেদিকে নজর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। চাকরির আবেদন, পেশাগত ই-মেইল, প্রতিবেদন লেখা, বৈঠকে বক্তব্য দেওয়া, উপস্থাপনা, সাক্ষাৎকার এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগ—এসব ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট ধরনের ভাষাগত দক্ষতা প্রয়োজন।

আয়োজকদের মতে, তাই পেশাভিত্তিক ইংরেজিকে শিক্ষার গৌণ বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ পেশার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইংরেজি শিক্ষাকে আরও ব্যবহারিক করে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।

নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা

শিক্ষাব্যবস্থায় টেকসই পরিবর্তন আনতে শুধু বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষকদের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়—এ ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারক, শিল্প খাত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিল্প খাতের পরিবর্তিত চাহিদা সম্পর্কে জানতে হবে। শিক্ষকদের বুঝতে হবে, কর্মক্ষেত্রে নতুন স্নাতকদের কাছ থেকে কী ধরনের যোগাযোগ দক্ষতা প্রত্যাশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নীতিনির্ধারকদেরও শিক্ষার্থীদের ভাষাগত দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে সম্পর্ককে শিক্ষানীতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

এ ধরনের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা থেকে কর্মজীবনে প্রবেশের সময় শিক্ষার্থীদের যে দক্ষতার ঘাটতি তৈরি হয়, তা কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন আয়োজকেরা।

বৈশ্বিক কর্মবাজারের জন্য প্রস্তুতি

বাংলাদেশের তরুণদের একটি বড় অংশ এখন দেশীয় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কোম্পানি, বিদেশি প্রতিষ্ঠান ও বৈশ্বিক অনলাইন কর্মবাজারে কাজের সুযোগ খুঁজছেন। ফলে ইংরেজিতে পেশাগত যোগাযোগের সক্ষমতা তাঁদের কর্মজীবনে নতুন সুযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

এ ক্ষেত্রে বিশেষায়িত ইংরেজি শিক্ষা শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ বিষয়ে অর্জিত জ্ঞানকে বাস্তব কর্মক্ষেত্রে কার্যকরভাবে প্রয়োগে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক কর্মপরিবেশে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে যোগাযোগ করার সক্ষমতাও তৈরি হতে পারে।

আয়োজকদের লক্ষ্য, ইএসপি শিক্ষাকে শ্রেণিকক্ষের সীমিত বা ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে না দেখে দেশের উচ্চশিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থার সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা। তাঁদের মতে, পেশাভিত্তিক ইংরেজি শিক্ষাকে দৃশ্যমান ও যুগোপযোগী করা গেলে দেশের মানবসম্পদের দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কর্মবাজারে বাংলাদেশি তরুণদের অংশগ্রহণের সুযোগও বাড়তে পারে।

‘ইউল্যাব-টেসল বিডি ২য় আন্তর্জাতিক ইএসপি সম্মেলন’কে এই বৃহত্তর লক্ষ্য বাস্তবায়নের একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখছেন আয়োজকেরা। বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প খাত, শিক্ষক ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য আরও কর্মমুখী ও বাস্তবভিত্তিক ইংরেজি শিক্ষা গড়ে তোলাই সম্মেলনের অন্যতম উদ্দেশ্য।


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স