ঢাকা

১১ বছর পর মালদ্বীপের কোনো প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানে, আলোচনায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং

জিও নিউজ, ইসলামাবাদ

আগামী দুই বছরের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ১৩ কোটি মার্কিন ডলার থেকে বাড়িয়ে ২০ কোটি ডলারে উন্নীত করতে সম্মত হয়েছে পাকিস্তান ও মালদ্বীপ। প্রতিরক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, মৎস্য ও পর্যটনসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা জোরদারে দুই দেশের মধ্যে একাধিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে।

মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জুর তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরের মধ্যে বুধবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এ কথা জানান। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

গত ১১ বছরের মধ্যে মালদ্বীপের কোনো প্রেসিডেন্টের এটিই প্রথম পাকিস্তান সফর। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৬০তম বার্ষিকীর সময় এ সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ফলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও গভীর ও বহুমুখী করার ক্ষেত্রে সফরটিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাণিজ্য বাড়াতে দুই দেশের লক্ষ্য

ইসলামাবাদে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর ও বিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু উপস্থিত ছিলেন। পরে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে শাহবাজ শরিফ জানান, আগামী দুই বছরের মধ্যে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ২০ কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বর্তমানে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৩ কোটি ডলার। নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জিত হলে তা বর্তমানের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। এ জন্য বাণিজ্যিক যোগাযোগ সম্প্রসারণ, পণ্য কেনাবেচা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন খাতে ব্যবসায়িক সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেন, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়ানোর প্রচেষ্টা আরও জোরদার করা হবে। পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি খাতে মালদ্বীপকে কারিগরি সহায়তা দেওয়ার বিষয়েও পাকিস্তানের আগ্রহের কথা জানান তিনি।

প্রতিরক্ষা থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—বহুমুখী সহযোগিতার উদ্যোগ

দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক ও চুক্তিগুলোতে সহযোগিতার বিস্তৃত ক্ষেত্র অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিরক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি, মৎস্য, পর্যটন ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা।

প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে দুই দেশ। এর আওতায় তথ্যপ্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল দক্ষতা এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মতো বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।

বর্তমান বিশ্বে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তার গুরুত্ব বাড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে দুই দেশের মধ্যে প্রযুক্তিগত জ্ঞান বিনিময় এবং দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।

মাদক পাচার রোধেও সহযোগিতা

মাদকদ্রব্যের অবৈধ পাচার ও অপব্যবহার রোধে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে পাকিস্তান ও মালদ্বীপ। এ ক্ষেত্রে তথ্য বিনিময় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

দুই দেশের চুক্তিতে সামুদ্রিক নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত দেশ দুটির জন্য সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, অবৈধ কার্যক্রম প্রতিরোধ এবং সামুদ্রিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে এসব ক্ষেত্রে সহযোগিতার বাস্তব পরিধি ও নির্দিষ্ট কর্মসূচি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি।

কৃষি ও খাদ্যপণ্যের বাণিজ্য বাড়ানোর উদ্যোগ

বাণিজ্যিক যোগাযোগ সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে মালদ্বীপ স্টেট ট্রেডিং অর্গানাইজেশন এবং ট্রেডিং করপোরেশন অব পাকিস্তানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর লক্ষ্য কৃষিপণ্য, খাদ্যপণ্য এবং অন্যান্য পণ্যের কেনাবেচায় সহযোগিতা বাড়ানো।

এ উদ্যোগের মাধ্যমে দুই দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো এবং পারস্পরিক বাণিজ্যের নতুন সুযোগ তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। নির্ধারিত বাণিজ্য লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

এ ছাড়া পরিবেশ সুরক্ষায় সহযোগিতার ক্ষেত্রেও দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যৌথ উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে এ সমঝোতা ভূমিকা রাখতে পারে।

রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অভ্যর্থনা

বুধবার সকালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হাউসে পৌঁছালে মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জুকে অভ্যর্থনা জানান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। এ সময় তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।

এর আগে গত মঙ্গলবার ফার্স্ট লেডি সাজিদা মোহাম্মদ, মন্ত্রিসভার সদস্য এবং জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলসহ ইসলামাবাদে পৌঁছান প্রেসিডেন্ট মুইজ্জু। তাঁর এ সফরকে কেন্দ্র করে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে একাধিক বৈঠক ও আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।

সফরকালে মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারির সঙ্গেও সাক্ষাৎ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। বৈঠকগুলোতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা।

কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন অধ্যায়

পাকিস্তান ও মালদ্বীপের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৬০তম বার্ষিকীতে প্রেসিডেন্ট মুইজ্জুর সফর দুই দেশের সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার একটি সুযোগ তৈরি করেছে। বাণিজ্য বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা এবং বিভিন্ন খাতে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর সেই প্রচেষ্টারই অংশ।

তবে এসব সমঝোতার প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে চুক্তিগুলোর বাস্তবায়ন, বাণিজ্যিক উদ্যোগের অগ্রগতি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর সহযোগিতার ওপর। আগামী দুই বছরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ২০ কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য অর্জন করতে পারলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে।

সামগ্রিকভাবে, এ সফরের মাধ্যমে পাকিস্তান ও মালদ্বীপ কেবল বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ নয়, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা, পরিবেশ ও মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো ক্ষেত্রেও সহযোগিতার পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স