ঢাকা

জামায়াতের জেলা নেতৃত্বে ধারাবাহিকতা, বছরের পর বছর দায়িত্বে একই নেতারা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ৭৯টি সাংগঠনিক ইউনিটের মধ্যে অন্তত ১৯টিতে টানা ১০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে আমির পদে আছেন একই ব্যক্তি। কোনো কোনো জেলায় এই মেয়াদ ২০ থেকে ২৮ বছর। দলটির গঠনতন্ত্রে আমির নির্বাচনের নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকলেও দীর্ঘদিন একই ব্যক্তির নেতৃত্বে থাকার বিষয়টি নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা রয়েছে। কুমিল্লা মহানগরে কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের পর বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর খাগড়াছড়ি জেলা শাখার আমির সৈয়দ মো. আবদুল মোমেন। ১৯৯৮ সাল থেকে টানা প্রায় ২৮ বছর ধরে তিনি এই পদে দায়িত্ব পালন করছেন। দলটির সাংগঠনিক কাঠামোয় দীর্ঘ সময় একই ব্যক্তির শীর্ষ পদে থাকার এমন নজির আরও রয়েছে।

সারা দেশে জেলা ও মহানগর মিলিয়ে জামায়াতে ইসলামীর ৭৯টি সাংগঠনিক ইউনিট রয়েছে। এর মধ্যে ৪৩টি ইউনিটের নেতৃত্বের তথ্য সংগ্রহ করেছে প্রথম আলো। জামায়াত নেতা ও পত্রিকাটির জেলা প্রতিনিধিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, ১৯টি ইউনিটে টানা ১০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে আমির পদে রয়েছেন একই ব্যক্তি। আরও ১১টি ইউনিটে আমিরের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের মেয়াদ পাঁচ থেকে নয় বছর।

কোনো কোনো জেলায় দীর্ঘদিন একই ব্যক্তির নেতৃত্বে থাকার বিষয়টি শুধু সাংগঠনিক ধারাবাহিকতার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে নতুন নেতৃত্ব তৈরি, দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র এবং পদ-পদবি ঘিরে প্রতিযোগিতার বিষয়ও জড়িয়ে পড়েছে। দলের একাধিক নেতার ভাষ্য, দীর্ঘদিন শীর্ষ পদে থাকার প্রবণতা নিয়ে জামায়াতের ভেতরে আলোচনা রয়েছে। কুমিল্লা মহানগরে কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবছে দল।

কুমিল্লার সংঘর্ষে সামনে এল দীর্ঘ নেতৃত্বের প্রশ্ন

গত ১৪ অক্টোবর কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের কার্যালয় চত্বরে ককটেল বিস্ফোরণ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ সময় মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি মাহবুবুর রহমানের ব্যক্তিগত গাড়িও ভাঙচুর করা হয়।

কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের আমির হিসেবে কাজী দ্বীন মোহাম্মদ প্রায় ২৮ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। সংঘর্ষের ঘটনার পর ১৬ অক্টোবর তাঁকে আমিরের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় এবং মহানগর কমিটিও ভেঙে দেওয়া হয়।

দলটির দায়িত্বশীল সূত্রের ভাষ্য, কুমিল্লার ঘটনা জামায়াতের সাংগঠনিক রাজনীতির ভেতরে জমে থাকা অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ হতে পারে। দীর্ঘদিন একই ব্যক্তির হাতে নেতৃত্ব থাকা, নতুনদের সুযোগ সীমিত হওয়া এবং পদ-পদবি ঘিরে প্রতিযোগিতা—এসব বিষয় নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা রয়েছে।

কুমিল্লার ঘটনার পর জামায়াতের অন্য একটি জেলার সাবেক প্রচার সম্পাদক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লিখেছেন, ‘কু’ এর “লু” হাওয়া কত দূর ছড়ায় আল্লাহ ভালো জানেন। অধস্তনের অসন্তোষ কেন্দ্রে আমলে নেওয়া জরুরি।’

দলটির ভেতরে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, জামায়াত কি নতুন নেতৃত্ব তৈরি করতে পারছে না, নাকি পুরোনো নেতাদের একটি অংশ দীর্ঘদিন পদ ধরে রাখছেন? কুমিল্লার ঘটনা এই প্রশ্নকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।

গঠনতন্ত্রে মেয়াদ নির্দিষ্ট, কিন্তু একই মুখ দীর্ঘদিন

জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় কমিটি ও আমিরের মেয়াদ তিন বছর। অন্যদিকে জেলা ও মহানগর কমিটির মেয়াদ দুই বছর। উভয় ক্ষেত্রেই রুকনদের গোপন ভোটে আমির নির্বাচিত হওয়ার বিধান রয়েছে।

দলটি এ পদ্ধতিকে নিজেদের গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া হিসেবে তুলে ধরে। তবে ভোটারসংখ্যা, প্রার্থীদের প্রাপ্ত ভোট এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করে না জামায়াত। ফলে দীর্ঘদিন একই ব্যক্তি আমির নির্বাচিত হওয়ার পেছনে কী ধরনের প্রতিযোগিতা কাজ করে, কিংবা কতটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তাঁরা পুনর্নির্বাচিত হন, তা বাইরে থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না।

দলটির একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, জামায়াতের সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালনকারী নেতাদের মধ্যে কেউ কেউ পদ ধরে রাখার প্রবণতা দেখান। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রেও জেলা ও মহানগর আমিরদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। তাঁদের মতে, এই দুই কারণে শীর্ষ পদে দীর্ঘদিন থাকার প্রবণতা তৈরি হতে পারে এবং নতুন নেতৃত্বের সামনে এগিয়ে আসার সুযোগ সীমিত হতে পারে।

তবে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতারা এই অভিযোগ মানতে নারাজ। তাঁদের বক্তব্য, যোগ্যতা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং ইসলামী আন্দোলনের প্রতি একনিষ্ঠতার ভিত্তিতেই আমির নির্বাচিত হন। ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার কারণে কেউ পদে থাকেন—এমন ধারণা সঠিক নয় বলে তাঁরা মনে করেন।

‘ফুল টাইমার’ নেতাদের ভূমিকা

জামায়াতের সাংগঠনিক কাঠামোয় কেন্দ্রীয়, জেলা ও মহানগর পর্যায়ের কিছু নেতা সার্বক্ষণিকভাবে দলীয় কাজে যুক্ত থাকেন। দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এসব নেতার ব্যয়ভার দল বহন করে। ক্ষেত্রবিশেষে তাঁদের গাড়ি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধাও দেওয়া হয়। দলীয় পরিভাষায় তাঁরা ‘ফুল টাইমার’ বা বেতনভুক্ত দায়িত্বশীল হিসেবে পরিচিত।

কিছু ফুল টাইমারকে জামায়াতের অর্থায়নে পরিচালিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পদেও নিয়োগ দেওয়া হয়। সেসব প্রতিষ্ঠান থেকে তাঁরা বেতন পান বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।

দলটির একাধিক নেতার মতে, সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালনকারী নেতাদের মধ্যে কেউ কেউ দীর্ঘদিন একই পদে থাকার আগ্রহ দেখান। এর সঙ্গে নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনাও যুক্ত রয়েছে। জেলা বা মহানগর আমির হওয়ায় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে অগ্রাধিকার পাওয়ার সুযোগ তৈরি হলে পদ ধরে রাখার প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে।

তবে এ বিষয়ে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বক্তব্য ভিন্ন। জামায়াতের বরিশাল অঞ্চলের পরিচালক মুয়াযযম হোসাইন হেলাল প্রথম আলোকে বলেন, রুকনেরা—অর্থাৎ শপথধারী কর্মীরা—পছন্দের ভিত্তিতে ভোট দিয়ে আমির নির্বাচন করেন। দল প্রয়োজন মনে করলে কাউকে দায়িত্ব থেকে সরিয়েও দেয়।

তাঁর বক্তব্য, নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি গণতান্ত্রিক এবং দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করলেই তা অনিয়মের প্রমাণ হয়ে যায় না।

লক্ষ্মীপুর, ঝালকাঠি ও জয়পুরহাটে দীর্ঘ মেয়াদ

জামায়াতের দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, লক্ষ্মীপুর জেলা জামায়াতের আমির রুহুল আমীন ভূঁইয়া প্রায় ২৩ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। ঝালকাঠিতে হাফিজুর রহমান ২২ বছর এবং জয়পুরহাটে ফজলুর রহমান সাঈদ ২০ বছর ধরে জেলা আমিরের পদে রয়েছেন।

রাজবাড়ীর আমির নুরুল ইসলাম ২০০৯ সালে দায়িত্ব পান। এর আগে তিনি দুই বছর ভারপ্রাপ্ত আমির এবং তিন বছর জেলা সেক্রেটারি ছিলেন। দলীয় সূত্রের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, সব মিলিয়ে আমির পদে তাঁর দায়িত্ব পালনের সময়কাল প্রায় ১৯ বছর।

খুলনা জেলা জামায়াতের আমির এমরান হুসাইন ১৮ বছর এবং বরিশালের আবদুল জব্বার ১৭ বছর ধরে একই পদে রয়েছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের দুই জেলা বান্দরবান ও রাঙামাটিতেও দীর্ঘদিন একই ব্যক্তির নেতৃত্ব রয়েছে। বান্দরবানের এস এম আবদুস সালাম আজাদ এবং রাঙামাটির আবদুল আলিম ১৬ বছর ধরে জেলা আমিরের দায়িত্ব পালন করছেন।

এ ছাড়া সিরাজগঞ্জে শাহীনুর আলম ১৪ বছর এবং গাজীপুরে জাহাঙ্গীর আলম ১৩ বছর ধরে দায়িত্বে রয়েছেন। বগুড়া জেলা ও মহানগর এবং ময়মনসিংহ জেলা ও মহানগর জামায়াতের আমির পদেও একই ব্যক্তিরা ১১ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। টাঙ্গাইল, মেহেরপুর ও পাবনার বর্তমান আমিরদের দায়িত্ব পালনের সময়কাল ১০ বছরে পৌঁছেছে।

এই হিসাব থেকে বোঝা যায়, দীর্ঘ মেয়াদে একই ব্যক্তির নেতৃত্বে থাকার ঘটনা জামায়াতের কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ইউনিটে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমন নজির রয়েছে।

বিরতি দিয়ে আবার দায়িত্বে কুড়িগ্রামের আজিজুর রহমান

কুড়িগ্রাম জেলা জামায়াতের আমির মো. আজিজুর রহমান ১৯৯৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত টানা ২২ বছর এই পদে ছিলেন। তিনি ভূরুঙ্গামারী ডিগ্রি কলেজের—বর্তমানে ভূরুঙ্গামারী সরকারি কলেজ—অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

কলেজটি সরকারীকরণের বিষয় সামনে এলে তিনি জেলা আমিরের পদ ছেড়ে দেন। পরে গত বছরের ডিসেম্বরে আবার তাঁকে জেলা আমিরের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

কুড়িগ্রামের এই উদাহরণে দেখা যায়, দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের পর পদ ছাড়লেও কোনো কোনো নেতা পরে আবার একই দায়িত্বে ফিরে আসছেন। ফলে নেতৃত্বে নিয়মিত পরিবর্তন এবং নতুনদের জন্য জায়গা তৈরির বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

তরুণ নেতৃত্বের অগ্রগতির প্রশ্ন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০২৫ সালের ৭ নভেম্বর ছাত্র সংসদে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেছিলেন, ‘তরুণেরা ককপিটে বসে দেশ পরিচালনা করবে। আমরা পেছন থেকে শক্তি জোগাব।’

তবে জেলা পর্যায়ে দীর্ঘদিন একই ব্যক্তির নেতৃত্বে থাকার প্রবণতা তরুণদের সামনে এগিয়ে আসার সুযোগ সীমিত করছে বলে মনে করেন ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতাদের কেউ কেউ। তাঁদের মতে, দলীয় কাঠামোয় নতুন নেতৃত্ব তৈরির কথা বলা হলেও গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে দীর্ঘদিন একই ব্যক্তির অবস্থান থাকলে তরুণদের জন্য দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ কমে যেতে পারে।

অন্যদিকে জামায়াতের চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক মুহাম্মদ শাহজাহান এ ধারণার সঙ্গে একমত নন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, জেলা আমির যাঁদের নেতা হিসেবে তৈরি করেন, তাঁদের হাতেই পরবর্তী সময়ে নেতৃত্বের ভার ওঠে। তাই নতুন নেতৃত্ব গড়ে ওঠে না—এমন বক্তব্য ঠিক নয়।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন দায়িত্বে থাকা নেতাদের কাজের মধ্য দিয়েই পরবর্তী নেতৃত্ব তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ নেতৃত্বের পরিবর্তন কেবল পদে নতুন কাউকে বসানোর বিষয় নয়; সাংগঠনিকভাবে নতুন নেতৃত্ব প্রস্তুত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

জেলা আমিরদের সংসদ সদস্য হওয়ার প্রবণতা

জামায়াতের জেলা পর্যায়ের নেতৃত্বের সঙ্গে জাতীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নের সম্পর্কও আলোচনায় এসেছে। জেলা আমিরদের মধ্যে পাঁচজন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁরা হলেন নড়াইলের আতাউর রহমান, চুয়াডাঙ্গার মো. রুহুল আমিন, মেহেরপুরের মো. তাজউদ্দীন খান, ঝিনাইদহের আলী আজম মো. আবুবকর এবং পাবনার অধ্যাপক আবু তালেব মণ্ডল।

দলের কয়েকজন নেতার মতে, জেলা বা মহানগর আমিরদের সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা তাঁদের পদে থাকার আগ্রহ বাড়াতে পারে। তবে জেলা আমিরদের মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়টি যে দীর্ঘদিন পদে থাকার প্রধান কারণ, এমন কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দল দেয়নি।

দীর্ঘদিন নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় পরিচিতি দলীয় মনোনয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে নতুনদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ কতটা রয়েছে, সেটিও দলীয় নেতৃত্ব নির্বাচনের কার্যকারিতা মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

প্রধান বিরোধী দল হওয়ার পর বাড়ছে অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা

বর্তমান সংসদে ৭৬টি আসন নিয়ে প্রধান বিরোধী দলের অবস্থানে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। সংসদীয় রাজনীতিতে এটিকে দলটির অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর দলটির রাজনৈতিক তৎপরতা ও প্রভাব বেড়েছে। নতুন নেতা-কর্মী ও সমর্থক যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য আখতারুজ্জামানও জামায়াতে যোগ দিয়েছেন।

দলটির কয়েকজন নেতার ধারণা, রাজনৈতিক প্রভাব ও সাংগঠনিক পরিসর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পদ-পদবি এবং মনোনয়ন ঘিরে অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতাও বেড়েছে। আগে তুলনামূলকভাবে সীমিত পরিসরে যে অসন্তোষ প্রকাশ পেত, এখন তা আরও প্রকাশ্য হয়ে উঠতে পারে।

দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়া কিংবা মনোনয়ন নিয়ে বিরোধের ঘটনাও এ ক্ষেত্রে আলোচনায় এসেছে।

গত ১২ অক্টোবর চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার উথলী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে জামায়াতের যুব বিভাগের ইউনিয়ন শাখার সভাপতি আহাদ আলী দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নিজেকে চেয়ারম্যান প্রার্থী ঘোষণা করেন। দল অন্য একজনকে মনোনয়ন দেওয়ার পরও তিনি নিজের প্রার্থিতা ঘোষণা করেন। পরে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

এ ছাড়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা) আসনে জামায়াত প্রার্থী ঘোষণা করার পর স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। এ নিয়ে দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতি ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনাও ঘটে।

দলটির শীর্ষ নেতারা সাধারণত জামায়াতকে সুশৃঙ্খল সংগঠন হিসেবে তুলে ধরেন এবং বলেন, নেতা-কর্মীরা কেন্দ্রের নির্দেশনার বাইরে গিয়ে কাজ করেন না। তবে স্থানীয় পর্যায়ে প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে বিরোধ ও কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা সেই সাংগঠনিক শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।

জোটের সিদ্ধান্তের বাইরে প্রার্থী হওয়ার ঘটনাও রয়েছে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে একাধিক নেতা নির্বাচনে অংশ নেন।

নরসিংদী-২ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক গোলাম সারোয়ার ওরফে সারোয়ার তুষারকে জোটের প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু জামায়াতের নেতা আমজাদ হোসাইন দল ও জোটের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন।

চট্টগ্রাম-৮ আসনটি ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী এনসিপির জুবাইরুল হাসানের জন্য ছেড়ে দিয়েছিল জামায়াত। তবে দলটির নেতা আবু নাছের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেননি এবং নির্বাচন থেকেও সরে দাঁড়াননি।

জামায়াতের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রার্থী হওয়া কিংবা পদ-পদবি নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া ভবিষ্যতে দলটির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। কুমিল্লার ঘটনাকে এ কারণেই গুরুত্ব দিয়ে দেখছে দলটি।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম অবশ্য মনে করেন, কুমিল্লার মতো ঘটনা অন্য কোথাও ঘটবে না।

নেতৃত্বে পরিবর্তন নাকি অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা?

জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্রে আমির নির্বাচনের নির্দিষ্ট মেয়াদ ও গোপন ভোটের বিধান রয়েছে। কিন্তু জেলা ও মহানগর পর্যায়ে দীর্ঘ সময় একই ব্যক্তির নেতৃত্বে থাকার ঘটনা দলটির সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এনেছে। নিয়মিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একই ব্যক্তি বারবার নির্বাচিত হচ্ছেন, নাকি নতুনদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ সীমিত—এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না হওয়ায় বিষয়টি পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

একদিকে দীর্ঘদিন দায়িত্বে থাকা নেতাদের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা, স্থানীয় পরিচিতি ও কর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ককে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতার কারণ হিসেবে দেখা যেতে পারে। অন্যদিকে, একই ব্যক্তির হাতে দীর্ঘদিন শীর্ষ পদ থাকলে নতুন নেতৃত্বের বিকাশ, অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা এবং কর্মীদের অসন্তোষ প্রকাশের সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

কুমিল্লার সংঘর্ষের পর দলটির ভেতরে এ নিয়ে নতুন করে ভাবার আলোচনা শুরু হয়েছে বলে দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে। জামায়াতের রাজনৈতিক প্রভাব ও সংসদীয় উপস্থিতি বাড়ার এই সময়ে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং নতুনদের জন্য সুযোগ তৈরি করার মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য আনা হবে, সেটিই এখন দলটির সাংগঠনিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স