বোয়েলো ও অস্টেন নামের দুটি শক্তিশালী ঝড়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ইউরোপের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন দেশ। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানিতে দেড় লাখের বেশি বাড়িঘর বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও মুঠোফোনের নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে গেছে, ব্যাহত হয়েছে সড়ক ও রেল যোগাযোগ। ঝড়ের কারণে শতাধিক ফ্লাইট বাতিল ও কিছু ফ্লাইটের রুট পরিবর্তন করা হয়েছে। ঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও যোগাযোগব্যবস্থা স্বাভাবিক করতে কাজ করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মীরা।
ইউরোপের উত্তরাঞ্চলে শরৎকালের প্রথম বড় ঝড়ের তাণ্ডবে জনজীবন ও পরিবহনব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে বয়ে যাওয়া বোয়েলো ও অস্টেন নামের দুটি ঝড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানির বিভিন্ন এলাকা। নেদারল্যান্ডস ও বেলজিয়ামেও ঝড়ের প্রভাব পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে ৮২ হাজারের বেশি, ফ্রান্সে প্রায় ৬০ হাজার এবং জার্মানিতে অন্তত ১০ হাজার বাড়িঘরের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। তবে ঝড়ের সর্বোচ্চ তীব্রতার সময় এসব দেশের আরও অনেক বাড়ি বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়েছিল। বিভিন্ন এলাকায় গাছ উপড়ে পড়া, বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে যাওয়া এবং স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
ঝড়ের কারণে বিমান চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামের শিফল বিমানবন্দরসহ ইউরোপের বিভিন্ন বিমানবন্দরে ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি কয়েকটি এলাকায় জরুরি সেবা পরিচালনা ও যোগাযোগব্যবস্থাও ব্যাহত হয়েছে।
যুক্তরাজ্যে চার লাখের বেশি বাড়িতে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন
ঝড়ের তাণ্ডবে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ও পরিবহনব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির এনার্জি নেটওয়ার্কস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ঝড়ের সময় চার লাখের বেশি বাড়িঘরের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। পরে অনেক এলাকায় সরবরাহ পুনরুদ্ধার করা হলেও ৮২ হাজারের বেশি বাড়ি বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন ছিল বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
স্কটল্যান্ডের পশ্চিমাঞ্চলের আর্গাইল অ্যান্ড বিউট কাউন্সিল এলাকায় ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৩৫ কিলোমিটার বেগে বাতাস বয়ে যায়। প্রবল বাতাসে গাছ উপড়ে পড়ে এবং বিদ্যুতের তার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে বিভিন্ন স্থানে সড়ক ও রেলপথ বন্ধ হয়ে যায়। ঝড়ের কারণে স্বাভাবিক যাতায়াত ব্যাহত হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
ইংল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলেও ঝড়ের প্রভাব পড়েছে। শুক্রবার স্টর্ম অস্টেনের প্রবল বাতাসে ব্রাইটনের পুরোনো জেটির একটি অংশ উড়ে যায় বলে জানিয়েছে এনার্জি নেটওয়ার্কস অ্যাসোসিয়েশন। ২০০৩ সালে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে জেটিটি অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে।
ঝড়ের কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরুদ্ধার, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামত এবং যোগাযোগব্যবস্থা সচল করার কাজ চালাতে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। বিশেষ করে গাছ ও বিদ্যুতের তার পড়ে যেসব সড়ক ও রেলপথ বন্ধ হয়ে গেছে, সেগুলো সচল করা জরুরি হয়ে উঠেছে।
ফ্রান্সে প্রায় তিন লাখ বাড়ি বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন
ইংলিশ চ্যানেলের অপর পারে ফ্রান্সের উত্তরাঞ্চলেও অস্টেন ঝড় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। দেশটির বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এনেদিস জানিয়েছে, শনিবার ঝড়ের তীব্রতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছালে প্রায় ২ লাখ ৮৮ হাজার বাড়িতে বিদ্যুৎ ছিল না।
রোববার দুপুর পর্যন্তও প্রায় ৫৯ হাজার বাড়িতে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন বাড়িগুলোর বেশির ভাগ নরম্যান্ডি ও ব্রিটানি অঞ্চলে অবস্থিত।
বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরুদ্ধারে এনেদিসের প্রায় ২ হাজার ৬০০ কর্মী ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা কাজ করছেন। ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎ লাইন মেরামত এবং সরবরাহব্যবস্থা সচল করাই তাঁদের প্রধান কাজ।
ফ্রান্সে ঝড়ের প্রভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের দৈনন্দিন কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে ক্ষতিগ্রস্ত লাইন ও অবকাঠামোর অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে।
জার্মানিতে হাসপাতালের সেবা সীমিত, আহত দুজন
জার্মানির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেও অস্টেন ঝড়ের প্রভাব পড়েছে। ফ্রাইবুর্গ ইম ব্রাইসগাউ শহর ও আশপাশের এলাকায় রোববার প্রায় ১০ হাজার বাড়িতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এতে জরুরি সেবার ওপরও চাপ তৈরি হয়।
বিদ্যুৎবিভ্রাটের কারণে শহরটির প্রধান হাসপাতাল কেবল জরুরি রোগীদের চিকিৎসা দিতে বাধ্য হয়। একই সময়ে মুঠোফোনের নেটওয়ার্কও বন্ধ হয়ে যায়। বিদ্যুৎ সরবরাহ ও যোগাযোগব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি জরুরি সেবার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সমস্যায় পড়তে হয়।
জার্মানির পুলিশ জানিয়েছে, শনিবার নাসটাটেন শহরে শরৎকালীন মেলা চলার সময় ঝড়ের বাতাসে নির্মাণকাজে ব্যবহৃত একটি মাচা উড়ে যায়। এতে দুজন গুরুতর আহত হন।
দেশটির আবহাওয়া সংস্থা ডিডব্লিউডি পূর্বাভাস দিয়েছে, রোববার জার্মানির উত্তর উপকূলে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১০০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো বাতাস বয়ে যেতে পারে। এ কারণে ঝড়ের প্রভাব আরও কিছু এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসেও ঝড়ের প্রভাব
ঝড়ের প্রভাব শুধু যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। নেদারল্যান্ডস ও বেলজিয়ামেও প্রবল বাতাসে জনজীবন ব্যাহত হয়েছে।
শনিবার বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে গাছ পড়ে চারজন আহত হন। ঝড়ের কারণে বিভিন্ন এলাকায় গাছপালা ও স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দেয়। প্রবল বাতাসের কারণে স্থানীয় পর্যায়ে চলাচল ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সতর্কতা প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে একই সময়ে ঝড়ের প্রভাব পড়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ, পরিবহন এবং জরুরি সেবার ওপর সম্মিলিত চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কিছু এলাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনতে সময় লাগছে।
শতাধিক ফ্লাইট বাতিল, ব্যাহত বিমান চলাচল
ঝড়ের কারণে উত্তর ইউরোপজুড়ে বিমান চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বিভিন্ন বিমানবন্দরে শতাধিক ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে এবং কিছু উড়োজাহাজকে বিকল্প পথে পরিচালিত করা হয়েছে।
ইউরোপের অন্যতম ব্যস্ত বিমানবন্দর নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামের শিফলে রোববার কয়েক ডজন ফ্লাইট বাতিল করা হয়। বিমানবন্দরটির ওয়েবসাইটের তথ্যের ভিত্তিতে এএফপি জানিয়েছে, সেখানে প্রায় ৯০টি ফ্লাইট বাতিলের হিসাব পাওয়া গেছে। এর বেশির ভাগই প্যারিস, রোম ও ডাবলিনসহ ইউরোপের বিভিন্ন শহরগামী ফ্লাইট।
শুধু উড্ডয়নের ফ্লাইট নয়, শিফল বিমানবন্দরে অবতরণের কথা ছিল—এমন কয়েক ডজন ফ্লাইটও বাতিল করা হয়। ফলে যাত্রীদের যাত্রাসূচিতে পরিবর্তন আনতে হয়েছে এবং বিমানবন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।
ইংল্যান্ডের উত্তরাঞ্চল ও স্কটল্যান্ডেও উড়োজাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটেছে। প্রবল বাতাসের কারণে নিরাপদ উড্ডয়ন ও অবতরণ নিশ্চিত করতে বিমান সংস্থাগুলোকে ফ্লাইট বাতিল বা সময়সূচি পরিবর্তনের মতো সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
বিমান চলাচলে এমন বিঘ্নের ফলে শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ যাত্রীরা নয়, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মধ্যে সংযোগকারী ফ্লাইটের যাত্রীরাও ভোগান্তিতে পড়তে পারেন। তবে বাতিল ফ্লাইটের কারণে মোট কতজন যাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট হিসাব দেওয়া হয়নি।
চরম আবহাওয়া নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ঝড়ের এই তাণ্ডবের মধ্যে আবহাওয়াবিশেষজ্ঞরা ভবিষ্যতে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন। তাঁদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে আবহাওয়ার ধরন আরও বৈরী হয়ে উঠতে পারে।
তবে নির্দিষ্ট এই দুটি ঝড়ের তীব্রতা বা ক্ষয়ক্ষতির সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক নির্ধারণ করতে আলাদা বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। সাধারণভাবে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন আবহাওয়ার বিভিন্ন চরম পরিস্থিতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে—এমন উদ্বেগ দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ করে আসছেন বিশেষজ্ঞরা।
বর্তমানে ইউরোপের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরুদ্ধার, সড়ক ও রেলপথ সচল করা এবং বিমান চলাচল স্বাভাবিক করার কাজ চলছে। ঝড়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামত এবং জরুরি সেবা চালু রাখাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার।