ঢাকা

হেবরনে ইসরায়েলি অভিযানের ছাপ, প্রাণচাঞ্চল্য হারিয়ে ‘ভুতুড়ে শহর’

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং

ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরের হেবরন শহরে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। অভিযানের অংশ হিসেবে শহরের বিভিন্ন এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং বাসিন্দাদের জোর করে উচ্ছেদ করার অভিযোগ উঠেছে। শহরের কিছু অংশ এখন ইসরায়েলি সেনাদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় সেখানকার স্বাভাবিক জনজীবন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে এক স্বাধীন সাংবাদিক হেবরনকে ‘ভুতুড়ে শহর’ বলে অভিহিত করেছেন।

গত শুক্রবার বন্দুকধারীর গুলিতে দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার পর শহরটিতে অভিযান জোরদার করে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। ওই ঘটনায় সন্দেহভাজন দুই ফিলিস্তিনি হামলাকারীও নিহত হন। এরপর হামলাকারীদের বসবাসের এলাকা এবং ঘটনার কাছাকাছি বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হয়। এ সময় বাড়িঘর ধ্বংস ও পরিবারগুলোকে উচ্ছেদ করার ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী ও সাংবাদিকেরা।

স্বাধীন সাংবাদিক জ্যাসপার নাথানিয়েল আল–জাজিরাকে বলেন, হেবরনের কিছু এলাকা এখন প্রায় জনশূন্য। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাসিন্দাদের সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সন্দেহভাজন দুই ফিলিস্তিনি হামলাকারীর বসবাসের পাড়াটিতে ইসরায়েলি বাহিনী ব্যাপক তাণ্ডব চালিয়েছে। পুরো পাড়া তছনছ করে দেওয়া হয়েছে এবং সেখানকার পরিবারগুলোকে বাড়িঘর ছেড়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছে।

নাথানিয়েল জানান, উচ্ছেদ করা বাড়িগুলোর গায়ে ‘এক্স’ চিহ্ন এঁকে দিয়েছে সেনারা। এতে বাড়িগুলো চিহ্নিত করে রাখার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এলাকাটিতে বাসিন্দাদের উপস্থিতি খুবই কম; বরং বিভিন্ন স্থানে ইসরায়েলি সেনাদের অবস্থান করতে দেখা যাচ্ছে।

বন্দুকের মুখে কয়েক মিনিটে বাড়িছাড়া পরিবার

যে তল্লাশিচৌকির কাছে দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছিলেন, তার আশপাশেও বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। স্থানীয় পরিবারগুলোকে বন্দুকের মুখে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সাংবাদিকেরা।

এ ধরনের উচ্ছেদের ফলে পরিবারগুলো তাৎক্ষণিকভাবে আশ্রয়হীন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। নিজেদের ঘরবাড়ি ও ব্যক্তিগত সম্পদ ফেলে দ্রুত এলাকা ছাড়তে বাধ্য হওয়ায় তাঁদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ভেঙে পড়েছে। একই সঙ্গে বাড়িঘর ধ্বংসের ঘটনায় দীর্ঘমেয়াদি বাস্তুচ্যুতির আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

হেবরনের পরিস্থিতি নিয়ে নাথানিয়েল বলেন, সেখানে ইসরায়েলি সেনাদের কার্যক্রমের মধ্যে সুস্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা আছে বলে তাঁর মনে হয়নি। তাঁর পর্যবেক্ষণ, সেনাদের অনেককে বিভিন্ন স্থানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে; কিন্তু অভিযানের সামগ্রিক উদ্দেশ্য কী, তা স্পষ্ট নয়।

তবে ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানের প্রকৃত লক্ষ্য ও পরিকল্পনা সম্পর্কে সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

সামরিক অভিযানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজনৈতিক হিসাব

আল–জাজিরার সাংবাদিক নূর ওদেহের মতে, হেবরনে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানকে শুধু নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পুরোপুরি বোঝা যাবে না। তাঁর বিশ্লেষণে, শহরটিতে ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী রাজনীতি, বসতি সম্প্রসারণের আকাঙ্ক্ষা এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে।

ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন–গভির একজন কট্টর ডানপন্থী রাজনীতিক ও ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী। তিনি হেবরন শহরেই বসবাস করেন। বসতি স্থাপনসংক্রান্ত দায়িত্বে থাকা আরেক মন্ত্রীও হেবরনের একজন বসতি স্থাপনকারী বলে নূর ওদেহ উল্লেখ করেছেন।

তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইসরায়েলি সেনাদের ওপর হামলার পর এসব নেতা প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেন। একই সঙ্গে নিজেদের রাজনৈতিক সমর্থকদের মধ্যে আরও শক্ত অবস্থান তৈরির সুযোগও পেয়েছেন তাঁরা। নূর ওদেহের ভাষ্য, হামলার পর যে পদক্ষেপগুলো নেওয়া হয়েছে, তা তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও দৃঢ় করেছে।

ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোতরিচও একজন বসতি স্থাপনকারী, যদিও তিনি হেবরনের বাসিন্দা নন। নূর ওদেহের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্মোতরিচ বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ নিজেই দিয়েছেন বলে দাবি করেছেন।

নূর ওদেহের বিশ্লেষণে, এসব পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে সামরিক অভিযানের পাশাপাশি একটি রাজনৈতিক ও আদর্শিক লক্ষ্যও সামনে এসেছে। তাঁর মতে, হেবরনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং সেখানে ইসরায়েলি উপস্থিতি আরও জোরদার করার বৃহত্তর আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বর্তমান অভিযানের যোগসূত্র রয়েছে।

ফিলিস্তিনি ও ইহুদিদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হেবরন

হেবরন ধর্মীয়, ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শহর। ফিলিস্তিনি ও ইহুদি—উভয় সম্প্রদায়ের কাছেই শহরটির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। এ কারণে হেবরনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই ভূমির মালিকানা, বসতি স্থাপন এবং নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ চলছে।

শহরটির ভেতরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের উপস্থিতি রয়েছে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের বসবাসের এলাকাগুলোতে ইসরায়েলি সেনাদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর ঘটনাও নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে।

নূর ওদেহের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বর্তমানে শহরের বিভিন্ন পাড়ায় সেনাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, বাড়িঘর ধ্বংস এবং এসব এলাকা নিয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়ার মধ্য দিয়ে সংঘাতের পরিধি আরও বিস্তৃত হচ্ছে। এতে সামরিক নিরাপত্তার প্রশ্নের পাশাপাশি ভূখণ্ডের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং বসতি সম্প্রসারণের রাজনৈতিক লক্ষ্যও সামনে চলে আসছে।

উচ্ছেদ ও ধ্বংসযজ্ঞে বাড়ছে উদ্বেগ

হেবরনে সাম্প্রতিক অভিযানের ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা, আশ্রয় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হওয়ার অভিযোগ এবং আবাসিক এলাকায় ধ্বংসযজ্ঞের বর্ণনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরেছে।

শহরের কিছু অংশে বাসিন্দাদের অনুপস্থিতি এবং সেনাদের উপস্থিতি বাড়ার কারণে হেবরনকে ‘ভুতুড়ে শহর’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন জ্যাসপার নাথানিয়েল। তাঁর এই মন্তব্য কেবল জনশূন্যতার চিত্রই তুলে ধরে না; বরং উচ্ছেদ, বাড়িঘর হারানো এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হওয়ার পরিস্থিতির প্রতিও দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

অন্যদিকে, আল–জাজিরার সাংবাদিক নূর ওদেহের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সামরিক অভিযানটি হেবরনের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিরোধকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে। শহরটির বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি এবং বাড়িঘর ধ্বংসের ঘটনা ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের জন্য নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

হেবরনের বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু একটি সামরিক অভিযানের বিবরণে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতি, বসতি স্থাপনকে ঘিরে বিরোধ এবং একটি ঐতিহাসিক শহরের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দীর্ঘদিনের সংঘাত।
(আল–জাজিরা )


নিউজটি আপডেট করেছেন : Desk

কমেন্ট বক্স