বাংলাদেশের
ব্যানবেইসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ১০৯টি মেডিক্যাল কলেজে মোট শিক্ষার্থী ছিলেন ৫১ হাজার ৩১৩ জন। তাঁদের মধ্যে ৬২ দশমিক ৭৯ শতাংশ নারী। অর্থাৎ, মেডিক্যাল কলেজে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের প্রতি তিনজনের প্রায় দুজনই ছাত্রী।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোয়ও নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। দেশের ৩৭টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজে মোট শিক্ষার্থীর ৬১ দশমিক ৫৭ শতাংশ নারী। অন্যদিকে, ৭২টি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে নারী শিক্ষার্থীর হার ৬৩ দশমিক ৬০ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, সরকারি ও বেসরকারি—উভয় ধরনের মেডিক্যাল কলেজেই নারীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। চিকিৎসক হওয়ার জন্য এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি থেকে শুরু করে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে নারীদের এই অংশগ্রহণ দেশের চিকিৎসাশিক্ষায় একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
চিকিৎসাশিক্ষায় নারীদের অগ্রগতির বিষয়টি একেবারে সাম্প্রতিক নয়। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত পরিসংখ্যানেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। ওই ১০ বছরে দেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে মোট ৪৮ হাজার ৭৭৭ জন এমবিবিএস পাস করেন। তাঁদের মধ্যে নারী ছিলেন ২৬ হাজার ৯০১ জন, যা মোট উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর প্রায় ৫৫ শতাংশ।
অর্থাৎ, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এমবিবিএস শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ ও সাফল্য পুরুষদের তুলনায় বেশি থাকার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান সেই ধারাবাহিকতাকেই আরও স্পষ্ট করেছে।
ডেন্টাল শিক্ষায়ও ছাত্রীর সংখ্যা বেশি
চিকিৎসাশিক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা ডেন্টাল শিক্ষায়ও নারীরা এগিয়ে রয়েছেন। ব্যানবেইসের শিক্ষা পরিসংখ্যান-২০২৫ অনুযায়ী, দেশের ৩৫টি ডেন্টাল কলেজ ও ডেন্টাল ইউনিটে শিক্ষার্থী প্রায় সাড়ে সাত হাজার। তাঁদের মধ্যে ৬০ দশমিক ৮৫ শতাংশ নারী।
ডেন্টাল শিক্ষায় নারীদের এই সংখ্যাধিক্য প্রমাণ করে, চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পেশায় প্রবেশের ক্ষেত্রে নারীদের আগ্রহ ও অংশগ্রহণ বাড়ছে। সাধারণ চিকিৎসা ও দন্তচিকিৎসা—দুই ক্ষেত্রেই নারী শিক্ষার্থীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা লক্ষ করা যাচ্ছে।
নার্সিং ও মিডওয়াইফারি শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ আরও বেশি। দেশে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কলেজ এবং ইনস্টিটিউটের সংখ্যা ৪৭৫। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী প্রায় ৪০ হাজার। তাঁদের প্রায় ৯০ শতাংশই নারী।
স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন পর্যায়ে দক্ষ জনবল তৈরিতে চিকিৎসক, দন্তচিকিৎসক, নার্স ও মিডওয়াইফদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে নার্সিং ও মাতৃস্বাস্থ্যসেবায় নারীদের অংশগ্রহণ দীর্ঘদিন ধরেই উল্লেখযোগ্য। তবে এসব পেশায় নারীদের উচ্চ অংশগ্রহণের পাশাপাশি তাঁদের কর্মপরিবেশ, পেশাগত উন্নতি, নেতৃত্বের সুযোগ এবং কর্মজীবনে টিকে থাকার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে পিছিয়ে নারী চিকিৎসকেরা
চিকিৎসাশিক্ষায় নারীদের সংখ্যাধিক্য থাকলেও সরকারি চাকরিতে চিকিৎসক হিসেবে নিয়োগের ক্ষেত্রে একই অনুপাত দেখা যাচ্ছে না। বিভিন্ন বিসিএস পরীক্ষায় চিকিৎসক নিয়োগের সুপারিশসংক্রান্ত পরিসংখ্যানে এ পার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে।
৩৯তম বিশেষ বিসিএসে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) ৬ হাজার ৭৯২ জন চিকিৎসক নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেছিল। তাঁদের মধ্যে পুরুষ ছিলেন ৫৩ শতাংশ এবং নারী ৪৭ শতাংশ। অথচ এ বিসিএসে আবেদনকারীদের মধ্যে ৫৬ শতাংশের বেশি ছিলেন নারী।
একই ধরনের চিত্র দেখা যায় ৪২তম বিশেষ বিসিএসেও। ওই বিসিএসে চার হাজার চিকিৎসক নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়। তাঁদের মধ্যে পুরুষ ছিলেন প্রায় ৫১ শতাংশ এবং নারী ৪৯ শতাংশ। এ পরীক্ষায় আবেদনকারীদের মধ্যে নারীর অংশ ছিল প্রায় ৫৬ শতাংশ।
অর্থাৎ, চিকিৎসক নিয়োগের জন্য আবেদনকারীদের মধ্যে নারীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকলেও চূড়ান্ত সুপারিশের ক্ষেত্রে তাঁদের অনুপাত তুলনামূলক কম ছিল। তবে এই পরিসংখ্যান থেকে এককভাবে এর কারণ নির্ধারণ করা যায় না। নিয়োগের বিভিন্ন পর্যায়ে অংশগ্রহণ, পরীক্ষার ফলাফল, পছন্দের কর্মস্থল এবং অন্যান্য বাস্তবতা বিশ্লেষণ করে বিষয়টি আরও বিস্তারিতভাবে বোঝার প্রয়োজন রয়েছে।
তবু শিক্ষাক্ষেত্রে নারীদের অগ্রগতির সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে তাঁদের অংশগ্রহণের তুলনা করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—মেডিক্যাল কলেজে বেশি সংখ্যায় পড়াশোনা করে চিকিৎসক হওয়ার পর নারীরা কর্মজীবনে সমান সুযোগ পাচ্ছেন কি না।
শিক্ষায় অগ্রগতি ও পারিবারিক উৎসাহ
চিকিৎসাশিক্ষায় নারীদের এগিয়ে থাকার পেছনে কয়েকটি বিষয় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে মেয়েদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, পরীক্ষায় ভালো ফলাফল এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তির প্রতিযোগিতায় সাফল্য এর অন্যতম কারণ।
বাংলাদেশে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক—তিন স্তরেই ছাত্রীদের অংশগ্রহণের হার ৫০ শতাংশের বেশি। বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জনের ক্ষেত্রেও মেয়েদের ভালো ফল করার প্রবণতা দেখা যায়। ফলে উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন শাখায় ভর্তির জন্য প্রতিযোগিতায় তাঁদের অংশগ্রহণ বাড়ছে।
চিকিৎসক হওয়ার প্রতি মেধাবী ছাত্রীদের আগ্রহ এবং পরিবারগুলোর উৎসাহও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। এর পাশাপাশি পারিবারিক ও আর্থসামাজিক অবস্থা, শিক্ষার সুযোগ, পেশা নির্বাচনের পছন্দ এবং ভর্তি পরীক্ষায় সাফল্যের মতো বিষয় নারীদের চিকিৎসাশিক্ষায় অংশগ্রহণকে প্রভাবিত করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ প্রথম আলোকে বলেন, ছাত্রীদের পড়াশোনায় ভালো করা এবং এগিয়ে যাওয়া ইতিবাচক দিক। প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষায় মেধার ভিত্তিতেই তাঁরা মেডিক্যালে ভর্তির ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকছেন।
তবে কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য কিছু প্রতিবন্ধকতা এখনো রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, মফস্সল এলাকায় কর্মপরিবেশ ও অন্যান্য বাস্তবতার কারণে নারী চিকিৎসকদের কাজ করতে নানা অসুবিধার মুখে পড়তে হয়।
অর্থাৎ, শিক্ষায় সাফল্য অর্জনের পর কর্মজীবনে প্রবেশ এবং সেখানে দীর্ঘমেয়াদে কাজ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে নারীদের সামনে ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ থাকতে পারে। এসব প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে কর্মপরিবেশ উন্নত করা গেলে চিকিৎসাসেবায় নারীদের অংশগ্রহণ আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
বিশেষায়িত চিকিৎসায় অংশগ্রহণেও ভারসাম্যের প্রশ্ন
চিকিৎসাশিক্ষায় নারীদের অগ্রগতির পাশাপাশি চিকিৎসার বিভিন্ন বিশেষায়িত শাখায় তাঁদের অংশগ্রহণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ চিকিৎসকদের বিশেষায়িত ক্ষেত্র বেছে নেওয়ার প্রবণতায় পার্থক্য থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
২০০৬ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলে (বিএমডিসি) নিবন্ধিত ৩৪ হাজার ৬৯৭ জন চিকিৎসকের তথ্য বিশ্লেষণ করেছিলেন ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ ও আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) গবেষকেরা। গবেষণায় নিবন্ধিত চিকিৎসকদের মধ্যে ৪৮ শতাংশ পুরুষ এবং ৫২ শতাংশ নারী ছিলেন।
গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, পুরুষ চিকিৎসকদের ৮৭ শতাংশের বিশেষ দক্ষতা ছিল মেডিসিন ও সার্জারি বিষয়ে। অন্যদিকে, নারী চিকিৎসকদের ৯৬ শতাংশের বিশেষ দক্ষতা ছিল গাইনি ও প্রসূতিরোগ বিষয়ে। গবেষণাপত্রটি ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে অনলাইন চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী প্লস ওয়ানে প্রকাশিত হয়।
এই তথ্য থেকে সংশ্লিষ্ট সময়ের চিকিৎসকদের বিশেষায়িত ক্ষেত্র বেছে নেওয়ার প্রবণতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তবে এটি ২০০৬ থেকে ২০১৫ সালের নিবন্ধিত চিকিৎসকদের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। তাই বর্তমান সময়ের সব চিকিৎসকের বিশেষায়িত ক্ষেত্র সম্পর্কে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হালনাগাদ তথ্য প্রয়োজন।
অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, চিকিৎসার কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিশেষায়িত শাখায় নারীদের অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম। অনেক নারী চিকিৎসকের আগ্রহ গাইনি ও প্রসূতিরোগের মতো নির্দিষ্ট কয়েকটি শাখায় বেশি দেখা যায়। চিকিৎসার বিভিন্ন বিশেষায়িত ক্ষেত্রেও নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তাঁর মতে, সব দিক বিবেচনায় নিয়ে এ ক্ষেত্রে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার। বিষয়টি নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
শিক্ষার সাফল্যকে কর্মক্ষেত্রেও কাজে লাগানোর প্রয়োজন
বাংলাদেশের চিকিৎসাশিক্ষায় নারীদের সংখ্যাধিক্য উচ্চশিক্ষায় তাঁদের অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। মেডিক্যাল কলেজে প্রায় ৬৩ শতাংশ, ডেন্টাল শিক্ষায় ৬০ শতাংশের বেশি এবং নার্সিং ও মিডওয়াইফারি শিক্ষায় প্রায় ৯০ শতাংশ নারী শিক্ষার্থীর উপস্থিতি স্বাস্থ্য খাতে নারীদের অবদানের ব্যাপক সম্ভাবনা তুলে ধরে।
তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারীদের সংখ্যাগত অগ্রগতির পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে তাঁদের অংশগ্রহণ, পেশাগত দক্ষতা বিকাশ, বিশেষায়িত চিকিৎসায় প্রবেশ এবং নেতৃত্বের সুযোগও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে কর্মপরিবেশ, নিরাপত্তা, কর্মস্থল নির্বাচন এবং পেশাগত দায়িত্বের সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য রক্ষার মতো বিষয়গুলো নারীদের কর্মজীবনে প্রভাব ফেলতে পারে।
এ ক্ষেত্রে কার্যকর নীতিমালা, উপযোগী কর্মপরিবেশ এবং পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে নারী চিকিৎসকদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে আরও ভালোভাবে কাজে লাগানো সম্ভব।
চিকিৎসাশিক্ষায় নারীদের এই অগ্রগতি তাই শুধু শিক্ষার্থীদের সংখ্যার পরিবর্তন নয়; এটি দেশের স্বাস্থ্য খাতে ভবিষ্যৎ জনবল গঠন এবং চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গেও সম্পর্কিত। শিক্ষায় অর্জিত সাফল্য যাতে কর্মক্ষেত্রেও সমান সুযোগ ও কার্যকর অংশগ্রহণে রূপ নেয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।