ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনে আরব নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলোর রেকর্ড সাফল্যের আভাস পাওয়ার পর ভোট চুরির অভিযোগ তুলেছে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি। দলটির দাবি, আরব দলগুলো ভোটারদের ঘুষ, হুমকি, সহিংসতা ও জালিয়াতির মাধ্যমে নির্বাচনী ফলাফল প্রভাবিত করেছে। এসব অভিযোগ তদন্তে পুলিশ ও দেশটির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেতের হস্তক্ষেপ চেয়েছে লিকুদ পার্টি। তবে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি (সিইসি) জানিয়েছে, নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও ফলাফল নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আরব নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দল রা’আম ও জয়েন্ট লিস্ট উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। ভোট গণনার প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, দল দুটি ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে সম্মিলিতভাবে ১৯টি আসন পেতে পারে। এটি তাদের বর্তমান সম্মিলিত ১০টি আসনের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
আরব দলগুলোর এই উত্থান ইসরায়েলের সরকার গঠনের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দেশটির ১২০ সদস্যের পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। কিন্তু প্রাথমিক ফলাফলের হিসাবে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট এবং তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবির—কোনোটিই এককভাবে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারছে না।
এ পরিস্থিতিতে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে আরব দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। বিশেষ করে আইজেনকট আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের চেষ্টা করতে পারেন—এমন সম্ভাবনাও সামনে এসেছে। নির্বাচনের আগে থেকেই নেতানিয়াহু ও তাঁর দল আরব দলগুলোর সমর্থনে সরকার গঠনের সম্ভাবনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে আসছিল।
আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ লিকুদের
বুধবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে লিকুদ পার্টি অভিযোগ করে, আরব দলগুলো ইসরায়েলের নির্বাচন ‘চুরি’ করেছে। দলটির ভাষ্য, এসব দল সন্ত্রাসবাদ এবং ইহুদি রাষ্ট্র ধ্বংসের পক্ষে অবস্থান নেয়।
লিকুদ পার্টি আরও দাবি করে, নির্বাচনে ভোটারদের কেন্দ্রে আনতে ঘুষ দেওয়া, হুমকি, সহিংসতা, জালিয়াতি এবং অবৈধ সফটওয়্যার ব্যবহারের মতো গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এসব অভিযোগের পক্ষে পুলিশ, শিন বেত ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির কাছে শত শত প্রমাণ জমা দেওয়ার কথাও জানিয়েছে দলটি।
লিকুদের অভিযোগের মধ্যে নগদ অর্থসহ খাম বিতরণ, জাল ভোট প্রদান এবং ভোটকেন্দ্রে সহিংসতার বিষয়ও রয়েছে। দলটি এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
তবে অভিযোগগুলো এখনো তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য প্রতিবেদনে নেই। ফলে লিকুদ পার্টির বক্তব্যকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
জালিয়াতির অভিযোগ নাকচ নির্বাচন কমিটির
লিকুদ পার্টি তদন্তের দাবি জানালেও নির্বাচনে ব্যাপক জালিয়াতির অভিযোগ আগেই নাকচ করেছেন কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির এক কর্মকর্তা। টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি দেশটির টেলিভিশন চ্যানেল ১২-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জালিয়াতির দাবির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন।
কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আগের নির্বাচনগুলোর মতো এবারও নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও ফলাফলে কথিত অনিয়ম নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগ পরীক্ষা করা হচ্ছে।
অর্থাৎ, লিকুদ পার্টি তদন্তের দাবি জানালেও অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়নি। নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ এবং নির্বাচন কমিটির যাচাই—দুটি বিষয়ই ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে চলমান বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে।
ফলাফল চ্যালেঞ্জ করার পরিকল্পনা ছিল, দাবি হিব্রু গণমাধ্যমের
ইসরায়েলের হিব্রু ভাষার গণমাধ্যমগুলো নির্বাচনের আগেই জানিয়েছিল, প্রয়োজনীয় আসন না পেলে লিকুদ পার্টি আরব অধ্যুষিত এলাকাগুলোর নির্বাচনী ফলাফল চ্যালেঞ্জ করতে পারে। এমনকি নির্বাচন ‘চুরি’ হয়েছে বলে দাবি তোলার পরিকল্পনা দলটির ছিল বলেও ওই প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়।
তবে এসব প্রতিবেদন এবং লিকুদ পার্টির বর্তমান অভিযোগের মধ্যে সম্পর্ক থাকলেও, নির্বাচনের ফলাফল চ্যালেঞ্জ করার পরিকল্পনা নিয়ে দলটির পক্ষ থেকে কী ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তা প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।
নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি অভিযোগগুলোর তদন্ত কীভাবে এগোয়, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, আরব দলগুলোর আসনসংখ্যা সরকার গঠনের হিসাব বদলে দিতে পারে এবং সেই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রাজনৈতিক অচলাবস্থাকে আরও জটিল করতে পারে।
৮৫ শতাংশের বেশি ভোট গণনা, এগিয়ে আরব দলগুলো
বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৮৫ শতাংশের বেশি ভোট গণনা শেষ হয়েছিল। তখনকার ফলাফল অনুযায়ী, জয়েন্ট লিস্ট ১২টি এবং রা’আম সাতটি আসন পেতে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোটের আসনসংখ্যা দাঁড়াতে পারে ৫৩টি। গাদি আইজেনকট ও তাঁর মিত্ররা পেতে পারেন ৪৮টি আসন। এই হিসাব অনুযায়ী, সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কোনো পক্ষেরই নিশ্চিত হচ্ছে না।
তবে ভোট গণনা শেষ হওয়ার আগে এসব সংখ্যাকে চূড়ান্ত ফলাফল হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। শেষ পর্যন্ত আসনসংখ্যা কী দাঁড়ায়, তার ওপর সরকার গঠনের সম্ভাব্য সমীকরণ নির্ভর করবে।
আরব দলগুলোর সম্মিলিত আসনসংখ্যা বেড়ে গেলে তারা সরাসরি সরকারে অংশ নেওয়া, বাইরে থেকে সমর্থন দেওয়া কিংবা সরকার গঠনের আলোচনায় শর্ত আরোপের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে যেতে পারে। এ কারণেই তাদের নির্বাচনী সাফল্য ইসরায়েলের রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
সরকারে অংশ নিতে চায় রা’আম
রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে রা’আম দলের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা ইয়োভ সেগালোভিৎ জানিয়েছেন, তাঁর দল পরবর্তী জোট সরকারের অংশ হতে চায়। তবে তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যাঁকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করা হবে, তাঁকে অবশ্যই আরব ভোটারদের স্বার্থ বিবেচনায় নিতে হবে।
এ অবস্থান থেকে বোঝা যায়, সরকার গঠনের আলোচনায় আরব জনগোষ্ঠীর স্বার্থ ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে। তবে রা’আম কোন শর্তে কোনো জোটকে সমর্থন দেবে কিংবা কোন দলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে সমঝোতায় যাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ইসরায়েলের রাজনীতিতে আরব দলগুলোর অংশগ্রহণ ও সরকার গঠনে তাদের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। এবারের নির্বাচনে তাদের আসনসংখ্যা বাড়ার আভাস সেই বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে।
ইহুদি-আরব জোট গঠনের আহ্বান বামপন্থী দলের
নির্বাচনী অচলাবস্থা কাটাতে ইহুদি-আরব জোট গঠনের আহ্বান জানিয়েছে বিরোধী বামপন্থী দল ডেমোক্র্যাটস। দলটির নেতা ইয়ার গোলান ‘পরিবর্তনকামী জোটের’ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, যেন তাঁরা রা’আম ও জয়েন্ট লিস্টের সঙ্গে জোট গঠনের বিরোধিতা থেকে সরে আসেন।
গোলানের এই আহ্বান বাস্তবায়িত হলে সরকার গঠনের আলোচনায় আরব দলগুলোর ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে বিরোধী শিবিরের অন্য দলগুলো এ প্রস্তাবে সম্মত হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
সব মিলিয়ে, ইসরায়েলের নির্বাচনে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সম্ভাব্য রেকর্ড সাফল্য সরকার গঠনের হিসাবকে জটিল করে তুলেছে। একদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে দুই প্রধান রাজনৈতিক শিবিরের অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে নির্বাচনী জালিয়াতির অভিযোগ ও তার তদন্তের দাবি—দুই বিষয়ই রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করছে। শেষ পর্যন্ত সরকার গঠনে কোন দল বা জোট সফল হবে, তা নির্ভর করবে চূড়ান্ত ফলাফল, দলগুলোর পারস্পরিক সমঝোতা এবং আরব দলগুলোর অবস্থানের ওপর।