জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে প্রায় ২৯০ জন নেতা–কর্মীকে আটকের ঘটনাকে বাংলাদেশে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের ওপর আক্রমণের সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।
সোমবার নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, রাজনৈতিক বিরোধীদের নির্বিচারে আটক এবং মতপ্রকাশ ও সভা–সমাবেশের স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার পরিস্থিতি নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করছে।
জাসদ কার্যালয়ে পুলিশের অভিযান
এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৬ সেপ্টেম্বর জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পুলিশ অভিযান চালিয়ে দলটির প্রায় ২৯০ জন সমর্থককে আটক করে নিয়ে যায়। এর আগে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) যুবসংগঠন যুবদলের সদস্যরা জাসদের নেতা–কর্মীদের সমাবেশকে আওয়ামী লীগের ‘গোপন বৈঠক’ বলে দাবি করেছিলেন। এরপর পুলিশ সেখানে অভিযান চালায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ২৭ জনকে পরে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করে পুলিশ। তাঁদের বিরুদ্ধে করা অভিযোগে বলা হয়, তাঁরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়েছিলেন। এই স্লোগানটি আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করেছে এইচআরডব্লিউ।
সংস্থাটি বলেছে, রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে সমাবেশ বা বৈঠকের কারণে নেতা–কর্মীদের আটকের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগ এবং তার ভিত্তিতে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জাসদ কার্যালয়ের ঘটনায় আটকের ধরন নিয়ে মানবাধিকার ও রাজনৈতিক অধিকারসংক্রান্ত প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাসদের রাজনৈতিক সম্পর্ক
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪–দলীয় জোটের অন্যতম শরিক দল জাসদ। এই জোট ২০০৯ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে। ২০২৪ সালে ছাত্রদের নেতৃত্বে গণ–অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত দলটি প্রায় দেড় দশক রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল।
এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ওই গণ–অভ্যুত্থানের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দমন–পীড়নে শত শত মানুষ নিহত হন। সে সময় ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয় এবং দলটির বহু নেতা–কর্মী বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হন।
মানবাধিকার সংস্থাটি মনে করে, অতীতে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বর্তমান সময়েও একই ধরনের অধিকার লঙ্ঘন এড়ানো জরুরি।
ক্ষমতায় এসে বিরোধীদের আটকের অভিযোগ
এইচআরডব্লিউ বলেছে, বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তীব্র রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়েছিল। মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দলটি ক্ষমতায় আসে। কিন্তু চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তারা নিজেদের রাজনৈতিক বিরোধীদের নির্বিচারে আটকের মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু করছে বলে অভিযোগ করেছে সংস্থাটি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বর্তমানে আওয়ামী লীগের শত শত নেতা–কর্মী কারাগারে রয়েছেন। তাঁদের বেশির ভাগের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নেই বলেও দাবি করেছে এইচআরডব্লিউ।
সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা জড়ো হয়েছেন—এমন অভিযোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ বারবার অভিযান চালিয়েছে। এসব ঘটনায় রাজনৈতিক পরিচয় বা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগকে আটকের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে মানবাধিকার সংস্থাটি।
বরিশাল ও ঢাকায় আরও আটকের উল্লেখ
২৬ সেপ্টেম্বর জাসদ কার্যালয়ে পুলিশের অভিযানের দিনই বরিশালে ‘নাশকতার পরিকল্পনায় গোপন বৈঠক’ করার অভিযোগে আওয়ামী লীগের ১২ কর্মীকে আটক করার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর দুই দিন পর, ২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় একই ধরনের অভিযোগে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আরও ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে উভয় ঘটনায় আটক ব্যক্তিরা দাবি করেন, তাঁরা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন উদ্যাপনের জন্য জড়ো হয়েছিলেন।
এই ঘটনাগুলোকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে এইচআরডব্লিউ বলেছে, রাজনৈতিক সমাবেশ বা জমায়েতকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করে দেখানোর প্রবণতা নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার চর্চার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রসঙ্গ
এইচআরডব্লিউ তাদের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের মানবাধিকার পরিস্থিতিরও উল্লেখ করেছে। সংস্থাটির মতে, শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, নির্যাতন এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের নির্বিচারে আটকের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ব্যাপকভাবে ঘটেছে।
২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের সময় এসব অভিযোগ আরও তীব্র আকার ধারণ করে বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বিএনপি মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেয়।
তবে এইচআরডব্লিউর অভিযোগ, বর্তমান সরকার এখন যাঁদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মনে করছে, তাঁদের নির্বিচারে আটক করছে। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকার মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য যেসব সংস্কার ও প্রস্তাব করেছিল, নতুন সরকার সেগুলোর কিছু বাতিল করেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অধিকার লঙ্ঘনকে অতীতের দমন–পীড়ন দিয়ে বৈধতা দেওয়া যায় না
এইচআরডব্লিউ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের কথা উল্লেখ করে বলেছে, মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সভা–সমাবেশের স্বাধীনতা সবার জন্য স্বীকৃত অধিকার। কোনো রাজনৈতিক দলের অতীত কর্মকাণ্ড, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা পূর্ববর্তী সরকারের সময় সংঘটিত অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ভিত্তিতে বর্তমান সময়ে একই ধরনের অধিকার খর্ব করা গ্রহণযোগ্য নয় বলে সংস্থাটি মনে করে।
মানবাধিকার সংস্থাটির বক্তব্য, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যেসব নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছিল, সেসব ঘটনা বর্তমানে বিএনপি সরকারের অধীনে একই ধরনের অধিকার লঙ্ঘনকে বৈধতা দেয় না। বরং অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও নির্বিচার আটকের পুনরাবৃত্তি বন্ধ করা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক অধিকার ও আইনের শাসন নিয়ে উদ্বেগ
এইচআরডব্লিউ বলেছে, রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন করতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার এবং সভা–সমাবেশের অধিকার সীমিত করার প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করতে পারে।
সংস্থাটির মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরোধী মত দমন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের এমন অনেক নজির রয়েছে, যেগুলো শেষ পর্যন্ত আরও বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের দিকে নিয়ে গেছে। তাই অতীতের নিপীড়নের প্রতিশোধ নেওয়ার পরিবর্তে সব রাজনৈতিক পক্ষের জন্য সমান অধিকার, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
জাসদের নেতা–কর্মীদের আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এইচআরডব্লিউ মূলত রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে আটক, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সভা–সমাবেশের অধিকার নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। একই সঙ্গে সংস্থাটি বলেছে, বাংলাদেশে অতীতে যে ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে, তার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে হলে বর্তমান সরকারকেও আইনের শাসন ও মৌলিক অধিকারের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা দেখাতে হবে।