কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার বড়কামতা ইউনিয়নের বটতলী বাজার। সকাল থেকে সন্ধ্যা—এখানকার চায়ের দোকানগুলোতে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু নির্বাচন। সাত বছর ধরে চা বিক্রি করা জীবন চন্দ্র দে জানান, বাজারে ভোট নিয়ে আগ্রহ খুব একটা চোখে পড়ছে না। দোকানে বসে কথোপকথনের মাঝেই শোনা যায়—ভোট দিলেও কী, না দিলেও কী—এমন মন্তব্য।
এই চিত্র শুধু বটতলী বাজারেই নয়। মঙ্গলবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত দেবীদ্বারের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কুমিল্লা–৪ আসনে নির্বাচনী উত্তাপ তুলনামূলকভাবে কম। স্থানীয়দের ধারণা, এ আসনে ফলাফল অনেকটাই অনুমেয়।
চা–দোকানি জীবন চন্দ্র দে বলেন, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আবদুল্লাহই এখানে মূল আলোচনার নাম। তাঁর বিপক্ষে বড় কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী মাঠে নেই। বিএনপির সম্ভাব্য শক্ত প্রার্থী থাকলেও শেষ পর্যন্ত তিনি নির্বাচনের বাইরে ছিটকে পড়ায় ভোটারদের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে—হাসনাতের জয় প্রায় নিশ্চিত। সে কারণেই ভোটের আমেজ তেমন জমছে না।
এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ কুমিল্লা–৪ আসনে ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন। এই আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন চারবারের সাবেক সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী। মনোনয়ন বৈধ হলেও ঋণখেলাপির তথ্য গোপনের অভিযোগে নির্বাচন কমিশন তাঁর প্রার্থিতা বাতিল করে। আদালতে আপিল করেও তিনি প্রার্থী হিসেবে ফিরতে পারেননি।
এই পরিস্থিতিতে হাসনাত আবদুল্লাহকে ঘিরে জয়ের আলোচনা বেশি শোনা গেলেও তিনি নিজে বিষয়টি সহজভাবে নিতে নারাজ। তাঁর ভাষ্য, প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলেও ভোটের মাঠে কোনো শিথিলতা নেই।
মঙ্গলবার সকাল সাড়ে সাতটায় মোহনপুর এলাকায় উঠান বৈঠকের মাধ্যমে দিনের প্রচার শুরু করেন হাসনাত। রাত ৯টা পর্যন্ত ছোট আলমপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় টানা সভা ও উঠান বৈঠক করেন তিনি। এক দিনে মোট ১১টি সভায় অংশ নেন। দুপুরের দিকে বড়কামতা ইউনিয়নের ব্রাহ্মণখাড়া এলাকার বটতলী বাজারে অনুষ্ঠিত হয় তাঁর একটি নির্বাচনী সভা।
সভার ফাঁকে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ভোটের মালিক জনগণ। তিনি জানান, প্রতিটি ভোটারই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণে কর্মী–সমর্থকদের নিয়ে একাধিকবার ভোটারদের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছেন তাঁরা। তাঁর ভাষায়, অন্য প্রার্থীরা যেখানে একবার যাচ্ছেন, সেখানে তাঁদের পাঁচবার যেতে হবে—এমন মানসিকতা নিয়েই তিনি প্রচার চালাচ্ছেন।
নির্বাচিত হলে অগ্রাধিকার কী হবে—এমন প্রশ্নে হাসনাত বলেন, সবার আগে অবকাঠামোগত সমস্যার সমাধানে কাজ করবেন। রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঘাটতি দূর করা এবং দেবীদ্বারকে মাদক, জুয়া ও চাঁদাবাজিমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
নির্বাচনী সভার বক্তব্যে তিনি বলেন, অতীতে ভোটের আগে টাকা, খাবার বা পরিবহন সুবিধা দিয়ে ভোট কেনার যে সংস্কৃতি ছিল, সেটি বদলাতে হবে। ভোটারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ভোট দেওয়ার অধিকার এক দিনের হলেও এর প্রভাব পাঁচ বছর থাকে। তাই এই অধিকার বিক্রি না করে সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার কথাও বলেন।
এই আসনে হাসনাত ছাড়াও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আবদুল করিম (হাতপাখা), ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের ইরফানুল হক সরকার (আপেল) এবং গণ অধিকার পরিষদের মো. আ. জসিম উদ্দিন (ট্রাক) প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন। খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মোহাম্মদ মজিবুর রহমান শুরুতে মনোনয়ন পেলেও পরে হাসনাতের পক্ষে সরে দাঁড়ান।
দেবীদ্বারের বড়কামতা, ইউসুফপুর, মোহনপুর ও জাফরগঞ্জ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় হাসনাত আবদুল্লাহর নির্বাচনী ব্যানার চোখে পড়লেও অন্য প্রার্থীদের তৎপরতা তুলনামূলকভাবে কম। স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, বেশির ভাগ ভোটারের ধারণা—১২ ফেব্রুয়ারি হাসনাতই জয়ী হবেন। তাঁর মতে, এই আসনে ফল এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।