ঢাকা

ইশতেহারে নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর প্রতিশ্রুতি: জামায়াতের আমির

-

নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সাম্প্রতিক এক বক্তব্য ঘিরে দেশজুড়ে আলোচনা ও সমালোচনার প্রেক্ষাপটে দলটির নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করা হয়েছে। যদিও আনুষ্ঠানিক ইশতেহারে নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর বিষয়টি সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি, তবে ইশতেহার প্রকাশ অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে আবারও এ ইস্যুটি সামনে আনেন জামায়াতের আমির।

বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেন ডা. শফিকুর রহমান। এ সময় তিনি বলেন, নারীদের কর্মঘণ্টা নির্ধারণের বিষয়ে জামায়াতের একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো নারী শিল্পকারখানা বা প্রতিষ্ঠানে যত ঘণ্টা কাজ করবেন, সে সময়ের মজুরি সংশ্লিষ্ট মালিকপক্ষ দেবে এবং নির্ধারিত কর্মঘণ্টার বাইরে অবশিষ্ট অংশের আর্থিক দায়ভার রাষ্ট্র বহন করবে।

ইশতেহারে নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের বিষয়ে একাধিক অঙ্গীকার তুলে ধরা হয়েছে। গ্রামীণ নারীদের স্বাবলম্বী করতে ‘আমার আয়ের সংসার’ নামে একটি প্রকল্প গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে নারীদের কেবল ভাতা নির্ভর না রেখে প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহের মাধ্যমে নিজস্ব আয় ও টেকসই কর্মজীবন নিশ্চিত করার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ইশতেহারে বলা হয়, এককালীন সরকারি সহায়তার মাধ্যমে নারীরা সেলাই, হস্তশিল্প, ফ্রিল্যান্সিং, কৃষিসহ বিভিন্ন উৎপাদনশীল খাতে যুক্ত হয়ে স্বাবলম্বী হতে পারবেন।

এ ছাড়া নারীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত কর্মপরিবেশ এবং ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে ইশতেহারে।

অতীত আন্দোলন ও রাজনৈতিক অবস্থান

ইশতেহার প্রকাশ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে জামায়াতের আমির সাতচল্লিশ, একাত্তর এবং চব্বিশের গণ-আন্দোলন ও বিপ্লবে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর একটি পরিচ্ছন্ন, নৈতিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে জামায়াতে ইসলামী সামনে এগোচ্ছে। অতীতের রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে সরে এসে মেধা, উদ্ভাবন ও আদর্শনির্ভর নেতৃত্বের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার অঙ্গীকার করেন তিনি।

সাড়ে ১৫ বছরের রাজনৈতিক বাস্তবতার কথা তুলে ধরে শফিকুর রহমান বলেন, তৎকালীন সময়ে বিরোধী দল, সুশীল সমাজ, সাংবাদিক সমাজ এমনকি আলেম-ওলামারাও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। ‘আমরা মজলুম ছিলাম,’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর অনেকেই যেন সেই অতীতের বাস্তবতা ভুলে গেছেন।

এ সময় তিনি অভিযোগ করেন, একটি শ্রেণি নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য বিভিন্নভাবে দেশের মানুষকে কষ্ট দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে জামায়াতের ইশতেহারকে জনবান্ধব, ব্যবসাবান্ধব, শান্তিবান্ধব ও শৃঙ্খলাবান্ধব হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

জামায়াতের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এই ইশতেহার কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির দলিল নয়; বরং একটি বৈষম্যহীন ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের রূপরেখা।

২৬ বিষয়ে অগ্রাধিকার

জামায়াতে ইসলামীর ইশতেহারে ‘জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ’ স্লোগানের আলোকে ২৬টি বিষয়ে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থে আপসহীন রাষ্ট্র গঠন; বৈষম্যহীন, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক মানবিক বাংলাদেশ নির্মাণ; যুবকদের ক্ষমতায়ন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁদের অগ্রাধিকার; নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র নিশ্চিত করা।

এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন করে মাদক, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্ত রাষ্ট্র গঠন; প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সমাজ বিনির্মাণ; প্রযুক্তি, কৃষি, শিল্প ও ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি; সরকারি চাকরিতে বিনা মূল্যে আবেদন ও মেধাভিত্তিক নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

ইশতেহারে আরও রয়েছে—ব্যাংকসহ আর্থিক খাত সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব ও স্বচ্ছ অর্থনীতি গঠন; সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিসহ সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করা; কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে কৃষি বিপ্লব; ২০৩০ সালের মধ্যে ভেজালমুক্ত খাদ্যনিরাপত্তা ও ‘তিন শূন্য ভিশন’ বাস্তবায়ন।

শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনমান উন্নয়ন, প্রবাসীদের ভোটাধিকার, সংখ্যালঘু ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিতকরণ, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ও পর্যায়ক্রমে বিনা মূল্যে শিক্ষা, দ্রব্যমূল্যের স্থিতিশীলতা, আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা, স্বল্পমূল্যে আবাসন এবং সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

‘চারদিক থেকে মিসাইল ছোড়া হচ্ছে’

অনুষ্ঠানে সাম্প্রতিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিতর্ক প্রসঙ্গে কথা বলেন জামায়াতের আমির। তাঁর এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত একটি পোস্ট ঘিরে কয়েক দিন ধরে যে আলোচনা–সমালোচনা চলছে, সে বিষয়ে তিনি বলেন, তাঁর অ্যাকাউন্টটি হ্যাক করা হয়েছিল বলে দলটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

এ বিষয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আজ আমি একজন আহত সৈনিক। গত কয়েক দিন ধরে আমার ওপর চারদিক থেকে মিসাইল নিক্ষেপ করা হচ্ছে। আমি কোনো অ্যান্টি-মিসাইল ব্যবহার করব না। বরং যাঁরা সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে আমার চরিত্রহনন করেছেন, আমি তাঁদের সবাইকে ক্ষমা করে দিচ্ছি।’

উপস্থিত অতিথিরা

ইশতেহার প্রকাশ অনুষ্ঠানে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া, খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব তোফাজ্জল হোসাইন মিয়াজী, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মূসা বিন ইযহার, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানসহ ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যভুক্ত বিভিন্ন দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার, জাতিসংঘ ও ইউএনডিপিসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার কূটনীতিকদের উপস্থিতির কথাও এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী।




কমেন্ট বক্স