আর মাত্র এক সপ্তাহ পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার মধ্য দিয়ে দায়িত্ব শেষ করতে যাচ্ছে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। ক্ষমতা হস্তান্তরের এই সন্ধিক্ষণে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর মনে একটাই প্রশ্ন—এই সরকার তাদের জন্য আসলে কী করে গেল?
শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিনিধিদের কাছে এই প্রশ্নই তুলে ধরেন গুম–ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সদস্যরা। জবাবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, গুমের বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং এ–সংক্রান্ত কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। সরকারের দাবি, গুমের বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’ নীতির ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে বিচার, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের সঙ্গে সরকারের বৈঠক
বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর ধানমন্ডিতে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স (বিলিয়া) মিলনায়তনে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার ও গুম থেকে ফিরে আসা কয়েকজনের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের দুই উপদেষ্টার একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ এই বৈঠকের আয়োজন করে।
বৈঠকে শিল্প এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান সশরীর উপস্থিত ছিলেন। আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল মুঠোফোনে যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন। বৈঠকে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো সরকারের নেওয়া উদ্যোগ সম্পর্কে সরাসরি জানতে চান।
আইন উপদেষ্টার বক্তব্য শেষে তাঁর সঙ্গে কথা বলেন বাগেরহাটে ২০১১ সালে গুমের শিকার হাবিবের মেয়ে জেসমিন। আলাপে একপর্যায়ে আসিফ নজরুল তাঁকে আশ্বাস দিয়ে বলেন, সরকার দায়িত্ব ছাড়ার পরও তাঁরা ব্যক্তিগত ও নাগরিক পর্যায়ে গুম–ভুক্তভোগীদের পাশে থাকবেন।
এরপর ফোনে কথা বলেন ২০১৯ সালে গুম হওয়া বিএনপি নেতা ইসমাইল হোসেন বাতেনের স্ত্রী নাসরীন জাহান স্মৃতি। তিনি প্রশ্ন তোলেন—ভিসা নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও গুমে অভিযুক্তরা কীভাবে বিদেশে যেতে পারছেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কেন এখনো পদোন্নতি পাচ্ছেন। উত্তরে আসিফ নজরুল বলেন, সব মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের দায় তিনি নিতে পারেন না, তবে গুমের বিচার নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে।
নাসরীন জাহান আরও জানতে চান, কীভাবে বিগত শাসনামলের অভিযুক্তরা বিপুল অর্থের বিনিময়ে জামিন পাচ্ছেন। জবাবে আইন উপদেষ্টা বলেন, হাইকোর্টের সিদ্ধান্তের ওপর আইন মন্ত্রণালয়ের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই এবং বিচার বিভাগের বিষয়গুলো প্রধান বিচারপতির এখতিয়ারভুক্ত।
পরিবারগুলোর ক্ষোভ ও হতাশা
বৈঠকে অংশ নিয়ে বরিশালে ২০১২ সালে গুম হওয়া বিএনপি নেতা ফিরোজ খান ও তাঁর ভাইয়ের স্ত্রী আমেনা আক্তার (বৃষ্টি) আবেগাপ্লুত হয়ে অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকার কখনোই গুম–ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর খোঁজ নেয়নি। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, সরকার যদি তাদের জন্য কিছু করে যেতে না পারে, তাহলে অন্তত ভবিষ্যৎ সরকারকে এই পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর পথ তৈরি করে যাক।
গুম থেকে ফিরে আসা এম মারুফ জামান, শিক্ষক ইকবাল চৌধুরী, রহমত উল্লাহ এবং কর্নেল (অব.) হাসিনুর রহমান তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তাঁরা জানান, গুমের কারণে শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির পাশাপাশি পরিবারগুলো চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। বক্তারা যথাযথ ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি জানান।
সরকারের দাবি: বিচার ও কাঠামোগত সংস্কার
বৈঠকের একপর্যায়ে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, বাংলাদেশ গুমসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশনে যুক্ত হয়েছে এবং বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত কমিশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুমের বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
তিনি জানান, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়েছে এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে কার্যকর ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করতে ২০২৫ সালের মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। পাশাপাশি নির্যাতনবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদের আলোকে একটি জাতীয় প্রতিরোধব্যবস্থা গঠন করা হয়েছে।
আইন উপদেষ্টার ভাষায়, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন মানবাধিকার কমিশন গঠিত হবে, যা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী কমিশন হিসেবে কাজ করবে। তিনি বলেন, গুম একটি ভয়াবহ অপরাধ এবং এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান ছিল আপসহীন।
‘এই লড়াই থামবে না’
সমাপনী বক্তব্যে আদিলুর রহমান খান বলেন, গুম–ভুক্তভোগী পরিবারগুলো তাঁর কাছে ব্যক্তিগতভাবে খুব কাছের মানুষ। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে একটি ট্রাস্ট ফান্ড গঠনের বিষয়টি নতুন মানবাধিকার কমিশন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।
তিনি আরও বলেন, গুমের বিচার প্রক্রিয়ায় বহু বাধা ও চ্যালেঞ্জ থাকলেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং গুম কমিশন একসঙ্গে কাজ করে বিষয়টি এগিয়ে নিচ্ছে। তাঁর মতে, গুমের বিরুদ্ধে এই লড়াই এখানেই শেষ নয়—এটি চলমান সংগ্রাম।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর এস এম তাসমিরুল ইসলাম জানান, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে গুম–সংক্রান্ত তদন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে এবং এরই মধ্যে তিনটি মামলা সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন অধিকারের পরিচালক নাসিরউদ্দিন এলান। সংগঠনের পরিচালক তাসলিম ফাহমিনা গুম নিয়ে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এছাড়া বক্তব্য দেন গুম কমিশনের সদস্য সাজ্জাদ হোসেন।