ঢাকা

আল–জাজিরাকে মির্জা ফখরুল: সব ধর্ম ও বিশ্বাসের মানুষের সমান অধিকার চায় বিএনপি

-

ধর্মনিরপেক্ষতা নয়; বরং সব ধর্ম ও সব বিশ্বাসের মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করাই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) রাজনৈতিক লক্ষ্য—এমন মন্তব্য করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন।

গত বুধবার সম্প্রচারিত ওই সাক্ষাৎকারে ধর্মনিরপেক্ষতা বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, “না, এটা আমাদের লক্ষ্য নয়। আমাদের লক্ষ্য হলো—সব ধর্ম, সব বিশ্বাসের মানুষের অধিকার থাকবে, তারা যেন তাদের নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে পারে এবং পূর্ণ নাগরিক অধিকার ভোগ করতে পারে।”

বাংলাদেশের জনসংখ্যার বড় অংশ মুসলমান—এ বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষ মুসলমান। সে কারণে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি বাংলাদেশের রাজনীতির বাস্তবতায় মোটেও উপযোগী নয়। তবে যদি আমরা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের অধিকার নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে সেখানে কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়।”

সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে বিএনপির অবস্থান

দেশে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় বিএনপির অতীত রেকর্ড সবচেয়ে ভালো বলে দাবি করেন দলটির মহাসচিব। এ দাবির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রতিটি পরিবর্তনের পর কিছু সমস্যা তৈরি হয়েছে, তবে সেগুলো সাম্প্রদায়িক নয়—সম্পূর্ণ রাজনৈতিক।

মির্জা ফখরুল বলেন, “সব সময় ভারতীয় মিডিয়া এসব ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক হিসেবে তুলে ধরতে চায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এগুলো রাজনৈতিক ঘটনা। কেউ যদি আওয়ামী লীগের সমর্থক হন এবং রাজনৈতিক কারণে তাঁর ওপর হামলা হয়, সেটি সাম্প্রদায়িক নয়—এটি রাজনৈতিক সহিংসতা।”

মানবাধিকার সংস্থার অভিযোগ নিয়ে প্রতিক্রিয়া

সাক্ষাৎকারে আল–জাজিরার সাংবাদিক উল্লেখ করেন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের (২০০১–২০০৬) সময়কালকে সংখ্যালঘুদের জন্য ‘বিপজ্জনক সময়’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল।

এ প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, “আমি তা মনে করি না। আমি কখনো কোথাও এমন কিছু পড়িনি।”

জাতিসংঘের জরিপে সাম্প্রতিক সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা বেড়েছে এবং এতে বিএনপি ও জামায়াত সমর্থকদের প্রতিশোধমূলক হামলার বিষয় উঠে এসেছে—এমন মন্তব্যের জবাবে তিনি বলেন, “এসব প্রতিবেদন সম্পূর্ণ পক্ষপাতদুষ্ট।”

তারেক রহমান ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গ

বিএনপি নির্বাচনে জয়ী হলে এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হলে জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন হবে কি না—এমন প্রশ্নের উত্তরে মির্জা ফখরুল বলেন, তারেক রহমান ইতিমধ্যেই তাঁর রাজনৈতিক পরিকল্পনা জনগণের সামনে উপস্থাপন করেছেন।

তিনি বলেন, “লন্ডন থেকে দেশে ফেরার দিনই বিমানবন্দর ও সড়কে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিল। সেদিন তিনি জনগণের কাছে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—তিনি পরিবর্তন আনবেন। তাঁর একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা আছে এবং সেই পরিকল্পনায় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অন্তর্ভুক্ত।”

মামলার প্রসঙ্গ ও দুর্নীতির অভিযোগ

আল–জাজিরার সাংবাদিক তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ৮০টির বেশি মামলা এবং সেগুলোর বেশির ভাগই দুর্নীতিসংক্রান্ত ছিল—এমন প্রশ্ন তুললে মির্জা ফখরুল বলেন, এসব মামলা ‘হাসিনার ফ্যাসিস্ট শাসনামলে’ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা হয়েছে।

তিনি বলেন, “সব মামলার বিচার হয়েছে, তদন্তও হয়েছে। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগও প্রমাণিত হয়নি।”

তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ

বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতা–কর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, গত ১৫ বছরে বিএনপির অনেক নেতা–কর্মীর জমি, দোকান ও ব্যবসা জোরপূর্বক দখল করে নেওয়া হয়েছিল।

তিনি বলেন, “পরিবর্তনের পর যখন তারা তাদের সম্পত্তি বা ব্যবসা ফিরে পেয়েছে, তখন কিছু অভিযোগ উঠেছে।”
তবে একেবারেই কোনো ঘটনা ঘটেনি—এমন দাবি না করে তিনি বলেন, “হয়তো কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা আছে। পরিবর্তনের সময় প্রতিটি দেশেই এমনটা ঘটে।”

নির্বাচন, দল নিষিদ্ধকরণ ও শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন

আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন অগণতান্ত্রিক হবে কি না—এ প্রশ্নে মির্জা ফখরুল বলেন, যখন কোনো রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে সহিংসতায় জড়িত হয় এবং স্বজন হারানোর ঘটনা ঘটে, তখন জনগণের পক্ষ থেকে বিচার দাবি করাই স্বাভাবিক।

তবে কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে তিনি নন জানিয়ে বলেন, “জামায়াতে ইসলামী যখন নিষিদ্ধ হয়েছিল, তখনও আমি বলেছিলাম—কোনো দল নিষিদ্ধ করলে সমস্যার সমাধান হয় না।”

শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে তিনি বলেন, “আমরা কূটনৈতিকভাবে চেষ্টা করব তাঁকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করতে।”

ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে আশাবাদ

বিএনপি ক্ষমতায় এলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন সম্ভব বলে আশাবাদ প্রকাশ করেন মির্জা ফখরুল। এ প্রসঙ্গে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফর এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে শোকবার্তা পাঠানোর বিষয়টি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, “এটি ভারত সরকার ও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে একটি খুব ভালো ও সৌহার্দ্যপূর্ণ উদ্যোগ।”




কমেন্ট বক্স