ঢাকা

ট্রাম্পের চাহিদা, ভারতের খরচ: রুশ তেল প্রশ্নে বিশ্লেষণ

-

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তির সময় জানিয়েছিলেন, চুক্তির অংশ হিসেবে নয়াদিল্লি রাশিয়ার তেল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং এর বদলে ভারত যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলা থেকে অপরিশোধিত তেল কিনবে।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের পক্ষে রাশিয়া থেকে তেল ত্যাগ করা এবং ভেনেজুয়েলার তেল আমদানিতে পরিবর্তন আনা কোনো সহজ কাজ নয়।

ট্রাম্পের পরিকল্পনা ও বাণিজ্য চাপে ভারত

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন রুশ তেলের ওপর মূল্যসীমা নির্ধারণ করে। এর ফলে ভারত ও অন্যান্য দেশ সস্তা রুশ তেল কিনতে শুরু করে। যুদ্ধের আগে ভারতের মোট তেলের মাত্র ২.৫ শতাংশই আসে রাশিয়া থেকে। তবে এখন তা প্রায় ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে।

শাস্তিস্বরূপ, গত বছর ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের ওপর বাণিজ্য শুল্ক ৫০ শতাংশে বৃদ্ধি করেছিলেন। সোমবার নয়াদিল্লির সঙ্গে চুক্তিতে তিনি এটিকে কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনেন। এছাড়া ভেনেজুয়েলার তেল খাতে মার্কিন নিয়ন্ত্রণ কার্যত দেশটির তেল শিল্পে প্রভাব বিস্তার করছে।

ভারতের রুশ তেল কেনা ও শোধনাগারের অবস্থা

বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলার জানাচ্ছে, ভারত বর্তমানে দৈনিক প্রায় ১১ লাখ ব্যারেল রুশ অপরিশোধিত তেল আমদানি করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় শোধনাগার নায়ারা এনার্জি রাশিয়ার মালিকানাধীন এবং এতে রসনেফট-এর ৪৯.১৩ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। এই শোধনাগার ভারতের রুশ তেলের প্রায় ৪০ শতাংশ সরবরাহ করে।

শোধনাগারগুলো হঠাৎ রাশিয়ার তেল বন্ধ করলে মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি পাবে। হরদীপ সিং, ভারতের পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসমন্ত্রী বলেন, “তেল সরবরাহ বিঘ্নিত হলে বিশ্বকে মারাত্মক পরিণতির মুখে পড়তে হবে। রাশিয়াকে তেলের বাজার থেকে বাইরে রাখার সামর্থ্য বিশ্বের নেই।”

প্যারিসভিত্তিক জ্বালানি বিশ্লেষক জর্জ ভোলোশিনও বলেন, “ভারত যদি রাশিয়া থেকে তেল আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম এক লাফে বাড়বে, যা ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।”

ভেনেজুয়েলার তেলের জটিলতা

ভেনেজুয়েলার তেল ভারতের পক্ষে সহজ বিকল্প নয়। এর কারণ:

  • দূরত্ব ও পরিবহন খরচ: ভেনেজুয়েলা রাশিয়ার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ দূরে এবং জাহাজ ভাড়া অনেক বেশি।

  • মূল্য ও বৈশিষ্ট্য: রুশ ইউরাল তেলের ক্ষেত্রে ছাড় বারেলপ্রতি ১০–২০ ডলার, তবে ভেনেজুয়েলার তেলের ছাড় মাত্র ৫–৮ ডলার।

  • ভারী তেল পরিশোধন সমস্যা: ভারতীয় অনেক শোধনাগার ভেনেজুয়েলার ভারী তেল পরিশোধনে সক্ষম নয়।

বিশ্লেষক সুমিত পোখরানা মনে করান, রাশিয়ার তেলের পরিবর্তে ভেনেজুয়েলার তেলে ভারতের বার্ষিক আমদানির ব্যয় ৯০০ কোটি থেকে ১,১০০ কোটি ডলারে পৌঁছতে পারে, যা ভারতের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য বাজেটের সমান।

বিকল্প উৎস ও বর্তমান অবস্থান

ভারত বর্তমানে ৪০টি দেশের দিকে নজর দিয়ে জ্বালানি সংগ্রহের উৎস বৃদ্ধি করছে। রাশিয়া থেকে আমদানির পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য ও ওপেকভুক্ত দেশগুলো থেকেও তেল আমদানি বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে ভারতের মোট তেলের প্রায় ২৭ শতাংশ আসে রাশিয়া থেকে, এবং ৫৩ শতাংশ আসে ইরাক ও সৌদি আরবের মতো দেশ থেকে।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিও বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ভারত প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টন মার্কিন অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৯২ শতাংশ বৃদ্ধি।


বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা

বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, হঠাৎ রুশ তেল বন্ধ করলে শুধু আমদানির খরচই বাড়বে না, বরং শোধনাগারের কার্যক্ষমতাও প্রভাবিত হবে। অনেক ছোট শোধনাগার ভেনেজুয়েলার ভারী তেল ব্যবহার করতে পারবে না। এছাড়া, ছায়া ট্যাংকার ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে, জাহাজ ভাড়া ও ফ্রেইট চার্জও বাড়বে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভারতের উপর ক্রমবর্ধমান চাপ দিয়ে রাশিয়ার তেল ত্যাগ এবং ভেনেজুয়েলার তেল গ্রহণ নিশ্চিত করতে চাইছেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করলে মূলধন খরচ বৃদ্ধি, শোধনাগারগুলোর সীমাবদ্ধতা এবং বাজার অস্থিতিশীলতা–এর মতো জটিল সমস্যার সম্মুখীন হবে। ফলে রাশিয়ার তেল ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া ভারতের জন্য সহজ হবে না, বরং খরচ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করবে।




কমেন্ট বক্স