ঢাকা

সিএনএনের বিশ্লেষণ: এপস্টেইনের পার্টি ও অভিজাতদের বিচার নিয়ে প্রশ্ন

-

যুক্তরাষ্ট্রে আলোচিত-সমালোচিত অর্থ বিনিয়োগকারী ও শিশু ও নারী নিপীড়ক জেফরি এপস্টেইন–সম্পর্কিত লাখ লাখ নথি, ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করেছে দেশটির বিচার বিভাগ। এসব নথি প্রকাশের পর এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বিখ্যাত ব্যক্তিরা প্রবল সমালোচনার মুখে পড়েছেন।সিএনএনের সাংবাদিক স্টিফেন কোলিনসন লিখেছেন, এপস্টেইনের নেটওয়ার্কের কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তিদের নৈতিক জবাবদিহিতা এখন এক বিতর্কিত প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে উগ্র ডানপন্থীরা এ বিষয়কে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে।

এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক: সম্পদ, ক্ষমতা ও প্রভাব

এপস্টেইনের সামাজিক ও ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত ছিল। ধনসম্পদ, খ্যাতি, ক্ষমতা ও প্রভাব-প্রতিপত্তিসম্পন্ন একটি অভিজাত গোষ্ঠী নিয়মিতভাবে তাঁর পার্টি ও ইভেন্টে অংশ নিত।

  • অনেকেই টেলিভিশন বা গণমাধ্যমে পরিচিত, ক্রীড়া দলের মালিক, ব্যবসায়ী ও বিনোদন ব্যক্তিত্ব।

  • মার্কিন প্রেসিডেন্ট, রাজপুত্র, যুবরাজ্ঞী, মন্ত্রিসভার সদস্য ও মন্ত্রীসহ বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতা এপস্টেইনের যোগাযোগে ছিলেন।

  • এপস্টেইনের সহযোগী ও বন্ধুদের মধ্যে অনেকেই অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও সামাজিক কাঠামোতে প্রভাবশালী।

কোলিনসন উল্লেখ করেছেন, এপস্টেইনের সামাজিক কার্যক্রম, ইয়ট পার্টি, নৈশভোজ ও ব্যক্তিগত জেটের ব্যবহার শুধু তার ব্যক্তিগত মুগ্ধতা নয়, বরং বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কৌশল ছিল।

নৈতিক দায় বনাম ফৌজদারি অপরাধ

যুক্তরাষ্ট্রের হাউস ওভারসাইট কমিটির ডেমোক্র্যাট সদস্যরা জানিয়েছেন, “জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে পার্টি করা নিজে কোনো অপরাধ নয়।”

  • ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ বলেছেন, মামলা চালানোর ক্ষেত্রে প্রমাণের মানদণ্ড কঠোর।

  • তবে কোলিনসন উল্লেখ করেছেন, এই মন্তব্যে ভুক্তভোগীদের মানসিক ও সামাজিক কষ্ট উপেক্ষা করা হয়েছে।

সাবেক ও বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট, বিভিন্ন রাজপুত্র ও যুবরাজ্ঞী, মন্ত্রিসভার সদস্যরা এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন এবং কোনো ফৌজদারি অভিযোগ নেই।

তবে সদ্য প্রকাশিত নথি ও অভিযোগপত্র এপস্টেইনের বিকৃত জগতের চিত্র তুলে ধরেছে।

  • নিউইয়র্কের ম্যানহাটন ও ফ্লোরিডার পাম বিচে অসংখ্য কিশোরীকে প্রলুব্ধ ও নির্যাতনের তথ্য উপস্থিত।

  • ফ্লোরিডায় অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে পতিতাবৃত্তির দুটি অভিযোগে দোষ স্বীকার করে ১৩ মাস কারাভোগ।

  • কেন্দ্রীয় পর্যায়ে মামলা হয়নি, ফলে অনেক প্রভাবশালী বন্ধুরা দায় থেকে বেঁচে গেছেন।

বিশ্বজুড়ে প্রভাব

এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক ইউরোপের রাজপরিবার ও সরকারের মধ্যেও ধাক্কা দিয়েছে।

  • সাবেক যুবরাজ অ্যান্ড্রু ও ভার্জিনিয়া জিউফ্রের মামলা নিষ্পত্তি।

  • রাজা তৃতীয় চার্লস অ্যান্ড্রুর রাজকীয় উপাধি বাতিল।

  • নরওয়ের যুবরাজ্ঞী মেত্তে-মারিত এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্কের জন্য অনুতাপ প্রকাশ করেছেন।

এই নথি প্রকাশের ফলে প্রভাবশালীরা জনসমক্ষে আত্মসমালোচনার সময়ের মধ্য দিয়ে যাওয়ার চাপ পাচ্ছেন।

ট্রাম্প ও রাজনৈতিক প্রভাব

ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘকাল এপস্টেইনের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন।

  • ২০০২ সালে তিনি এপস্টেইনকে ‘দারুণ মানুষ’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

  • ২০২৫ সালে ট্রুথ সোশ্যালে তিনি এপস্টেইন ও তাঁর বন্ধুদের সমালোচনা করেছেন।

কোলিনসন উল্লেখ করেছেন, ধনী ও প্রভাবশালীদের নৈতিক দুর্বলতা জনজীবন ও জনপ্রিয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান ত্বরান্বিত করতে পারে। ট্রাম্প ক্ষমতা ছাড়ার পরও এ ধরনের প্রভাব মার্কিন গণতন্ত্রকে প্রভাবিত করতে পারে

সামাজিক নেটওয়ার্ক ও প্রযুক্তি

এপস্টেইনের যোগাযোগে ইলন মাস্কসহ প্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক শীর্ষ ব্যক্তিরা ছিলেন।

  • ২০১৩ সালে ই-মেইল আদান-প্রদান।

  • দ্বীপে আয়োজিত পার্টি ও নেটওয়ার্কিংয়ে সম্ভাব্য সম্পর্ক।

  • মাস্ক দাবি করেছেন, তিনি কখনো পার্টিতে অংশ নেননি।

কোলিনসন উল্লেখ করেছেন, এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত, এবং নতুন নথি প্রকাশের পর বিদেশে থাকা সহযোগীদের হিসাব-নিকাশের চাপ বেড়েছে।

নৈতিক দায় ও প্রশ্নবোধ

কোলিনসন শেষ করেছেন, “এপস্টেইনের সঙ্গে পার্টি করা ফৌজদারি অপরাধ নাও হতে পারে, তবে নৈতিক দায়ের প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে

  • কিশোরী ও ভুক্তভোগীদের প্রতি দায়।

  • প্রভাবশালী বন্ধুরা এবং নেটওয়ার্কের মধ্যে থাকা ব্যক্তিরা কতটা সচেতন ছিলেন।

  • জনজীবন ও রাজনৈতিক প্রভাবের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব।

এপস্টেইনের মৃত্যু ২০১৯ সালে আত্মহত্যার মাধ্যমে হলেও নথিপত্রে প্রকাশিত তথ্য তার অপরাধের বিস্তৃতি এবং অভিজাত সমাজের নৈতিক দায়ের প্রশ্ন জনসমক্ষে রেখে গেছে।




কমেন্ট বক্স