রাজধানীর পুরান ঢাকার লালবাগে নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন পর ব্যবসায়ী শেখ ওয়াসিম ওরফে রনীর (৪৭) মরদেহ মাটির নিচ থেকে উদ্ধারের ঘটনায় তাঁর বন্ধু মাসুম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
শুক্রবার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা লালবাগ থানার এসআই বেলায়েত হোসাইন মাসুমকে আদালতে হাজির করেন। সেখানে মাসুম নিজ ইচ্ছায় ঘটনার বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে সম্মতি জানান। পরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সারাহ্ ফারজানা হক তাঁর জবানবন্দি রেকর্ড করেন। জবানবন্দি শেষে আদালত মাসুমকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
তদন্ত কর্মকর্তা জানান, বৃহস্পতিবার রাতে মাসুমকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের কাছে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওয়াসিম ও মাসুম একই এলাকায় বেড়ে উঠেছেন এবং একই স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। তাঁরা দীর্ঘদিনের বন্ধু ছিলেন। তবে দুজনের ব্যবসা ছিল আলাদা। ওয়াসিম জমি কেনাবেচার মধ্যস্থতার কাজ করতেন, আর মাসুম ইমিটেশন গয়নার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
মাটির নিচে মিলল মরদেহ
শুক্রবার ভোরে লালবাগের বি সি দাস স্ট্রিটে একটি পাঁচতলা ভবনের পাশের জায়গায় মাটি খুঁড়ে ওয়াসিমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, উদ্ধারের সময় ওয়াসিমের হাত-পা বাঁধা ছিল এবং তাঁর মুখ পলিথিন দিয়ে মোড়ানো অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়।
এর আগে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে মাসুমকে সঙ্গে নিয়ে ওই ভবনে অভিযান চালায় পুলিশ। সেখানে তাঁর ইমিটেশন গয়না তৈরির কারখানা ছিল।
পুলিশের দাবি, ওয়াসিমের কাছে পাওনা তিন লাখ টাকার একটি চেক নিতে তিনি মাসুমের কাছে গিয়েছিলেন। টাকা নিয়ে বিরোধের জেরেই হত্যাকাণ্ড ঘটে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে।
পাওনা টাকা নিয়ে বিরোধ
পুলিশ জানায়, ওয়াসিম নিখোঁজ হওয়ার পর মঙ্গলবার তাঁর ভাই শেখ আবদুল করিম লালবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। জিডি করার সময় মাসুমও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
পরে তদন্তে নেমে ওয়াসিমের মুঠোফোনসহ বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে মাসুমকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে মাসুম ওয়াসিমকে হত্যার কথা স্বীকার করেন।
তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওয়াসিমের কাছে মাসুমের তিন লাখ টাকা পাওনা ছিল। টাকা ফেরতের জন্য ওয়াসিম নিয়মিত চাপ দিচ্ছিলেন। মঙ্গলবার টাকা দেওয়ার কথা বলে মাসুম তাঁকে নিজের কারখানায় ডেকে নেন।
সেখানে দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে মাসুম ওয়াসিমের মাথায় আঘাত করে তাঁকে ফেলে দেন। পরে শ্বাসরোধ করে তাঁর মৃত্যু ঘটানো হয় বলে পুলিশের কাছে মাসুম স্বীকার করেছেন।
হত্যার পর মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে ওয়াসিমের হাত-পা বেঁধে এবং মুখে স্কচটেপ ও পলিথিন পেঁচিয়ে মাটির নিচে পুঁতে রাখা হয় বলে তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। পরে মরদেহের ওপর বালি ও সিমেন্ট দিয়ে জায়গাটি ঢেকে দেওয়া হয়েছিল।
পরিবারের অভিযোগ
ওয়াসিম লালবাগের স্থায়ী বাসিন্দা হলেও স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে শনির আখড়া এলাকায় বসবাস করতেন। এ ঘটনায় তাঁর স্ত্রী নুসরাত জাহান শুক্রবার লালবাগ থানায় হত্যা মামলা করেন।
ওয়াসিমের মেয়ে সুমাইয়া আক্তার জানান, প্রায় পাঁচ মাস আগে তাঁর বাবা মাসুমকে তিন লাখ টাকা ধার দিয়েছিলেন। মাসুম তাঁর বাবার বন্ধু ছিলেন বলেও তিনি জানান।
সুমাইয়ার ভাষ্য, গত দুই থেকে তিন মাস ধরে পাওনা টাকা ফেরত চাইলেও মাসুম তা পরিশোধ করছিলেন না। ঘটনার দিন চেক আনতে যাওয়ার কথা বলে ওয়াসিম বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন।
সুমাইয়া বলেন, “বাবা চেক আনতে গিয়েছিলেন। মাকে বলে গিয়েছিলেন। আমি বিচার চাই।”