ঢাকা

সুরক্ষা থেকে বিলাসিতা—ব্রিকস সম্মেলনে সি চিন পিংয়ের লিমোজিনে কী আছে

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
এনডিটিভি

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আজ শনিবার বসছে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। দুই দিনের এই সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে কয়েকজন বিশ্বনেতার সঙ্গে অংশ নিচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংও।

সি চিন পিংয়ের ভারত সফর ঘিরে যেমন ভূরাজনৈতিক আলোচনা চলছে, তেমনি আলাদা করে নজর কেড়েছে তাঁর সরকারি গাড়ি। বাইরে থেকে দেখতে রাজকীয় লিমোজিনের মতো হলেও গাড়িটির ভেতরে রয়েছে রাষ্ট্রপ্রধানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তৈরি নানা ব্যবস্থা।

চীনা প্রেসিডেন্টের ব্যবহৃত এই গাড়ির মডেল ‘হংছি এন৭০১’। এটি শুধু একটি বিলাসবহুল গাড়ি নয়; বরং সি চিন পিংয়ের বিদেশ সফরে তাঁর নিরাপত্তার জন্য ব্যবহৃত বিশেষায়িত সাঁজোয়া যান।

‘হংছি’—চীনের লাল পতাকার প্রতীক

চীনা ভাষায় ‘হংছি’ শব্দের অর্থ ‘লাল পতাকা’। নামটির সঙ্গে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ঐতিহ্য ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতীকী সম্পর্ক রয়েছে।

গাড়িটি তৈরি করেছে চীনের প্রাচীনতম রাষ্ট্রায়ত্ত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এফএডব্লিউ গ্রুপ। ১৯৫৮ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের জন্য ‘হংছি’ ব্র্যান্ডের গাড়ি তৈরি করে আসছে।

ফলে চীনা প্রেসিডেন্টের জন্য ব্যবহৃত এই গাড়ি কেবল পরিবহনের মাধ্যম নয়, বরং দেশটির রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও নিজস্ব গাড়ি নির্মাণ সক্ষমতারও একটি প্রদর্শন।

বিদেশ সফরে নিজস্ব গাড়ি কেন?

একসময় বিদেশ সফরে চীনা নেতারা সাধারণত আয়োজক দেশের দেওয়া সরকারি গাড়ি ব্যবহার করতেন। সি চিন পিং সেই প্রচলিত রীতিতে পরিবর্তন এনেছেন।

এখন তিনি বিদেশ সফরে গেলে নিজের সাঁজোয়া গাড়িও সঙ্গে নিয়ে যান। বিমানে করে গাড়িটি সংশ্লিষ্ট দেশে নেওয়া হয়। এর আগে রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও মিসর সফরেও এই গাড়ি ব্যবহার করেছেন তিনি।

এ ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বহুল আলোচিত সাঁজোয়া গাড়ি ‘দ্য বিস্ট’-এর সঙ্গে তুলনা করা যায়। যুক্তরাষ্ট্র যেমন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার জন্য বিশেষভাবে তৈরি গাড়ি বিদেশ সফরেও সঙ্গে নিয়ে যায়, চীনও সি চিন পিংয়ের ক্ষেত্রে একই ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা অনুসরণ করছে।

আক্রমণ প্রতিরোধী বর্মে মোড়া

প্রায় ১৮ ফুট দীর্ঘ ‘হংছি এন৭০১’-এর প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্যের পুরোটা প্রকাশ করা হয়নি। তবে প্রকাশ্যে আসা তথ্য অনুযায়ী, গাড়িটির বাইরের কাঠামোতে সামরিক গ্রেডের পুরু আর্মার প্লেট ব্যবহার করা হয়েছে।

গাড়িটির জানালার কাচও বিশেষভাবে সুরক্ষিত। এগুলো বুলেটপ্রুফ হিসেবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে ভারী অ্যাসল্ট রাইফেলের গুলি কিংবা স্নাইপারের আঘাতও ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের সহজে ক্ষতিগ্রস্ত করতে না পারে।

গাড়ির নিচের অংশও বিশেষভাবে সুরক্ষিত। রাস্তার নিচে পেতে রাখা মাইন কিংবা ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) বিস্ফোরিত হলেও আরোহীদের নিরাপদ রাখার লক্ষ্যেই গাড়ির পাটাতন তৈরি করা হয়েছে।

গুলি লাগলেও চলবে চাকা

গাড়িটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য এর বিশেষ ‘রান-ফ্ল্যাট’ চাকা।

প্রায় ২১ ইঞ্চির এসব চাকা এমনভাবে তৈরি যে গুলিতে টায়ার ক্ষতিগ্রস্ত বা পুরোপুরি বাতাসশূন্য হয়ে গেলেও গাড়িটি চলতে পারে। অর্থাৎ হামলার সময় টায়ার নষ্ট হয়ে গেলেও গাড়িটি থেমে না গিয়ে দ্রুত নিরাপদ স্থানে চলে যেতে সক্ষম।

রাষ্ট্রপ্রধানকে বহনকারী গাড়ির ক্ষেত্রে এই সুবিধা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হামলার সময় গাড়ি থেমে গেলে সেটিই আরোহীদের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।

বিষাক্ত গ্যাস ঠেকাতেও প্রস্তুত

‘হংছি এন৭০১’-এর নিরাপত্তা শুধু গুলি বা বিস্ফোরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গাড়ির কেবিনে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় বায়ু পরিশোধন ব্যবস্থা।

বাইরে রাসায়নিক বা বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়লে কেবিনের ভেতরে বাইরের বাতাস প্রবেশ ঠেকানোর ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি কৃত্রিম অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে বলে প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর ফলে রাসায়নিক হামলা বা বিষাক্ত গ্যাস ব্যবহারের মতো পরিস্থিতিতেও গাড়ির ভেতরের পরিবেশকে নিয়ন্ত্রিত রাখার চেষ্টা করা হয়।

শক্তিশালী ইঞ্জিন, সীমিত উৎপাদন

কয়েক টন ওজনের এই সাঁজোয়া গাড়িকে দ্রুতগতিতে চালানোর জন্য এতে শক্তিশালী ভি-১২ ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে। এই ইঞ্জিন প্রায় ৪০৮ হর্সপাওয়ার শক্তি উৎপাদন করতে পারে।

তবে এটি সাধারণ বাজারের জন্য তৈরি কোনো বিলাসবহুল লিমোজিন নয়। চীনে আগামী এক দশকে এই মডেলের মাত্র প্রায় ৫০টি গাড়ি তৈরি করা হবে বলে জানা গেছে। এগুলো মূলত শীর্ষ পর্যায়ের রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহারের জন্যই নির্ধারিত।

অর্থাৎ গাড়িটির বিরলতা ও সীমিত উৎপাদনও এর বিশেষ মর্যাদাকে নির্দেশ করে।

গাড়ির আড়ালে চীনের কূটনৈতিক বার্তা

সি চিন পিংয়ের বিদেশ সফরে নিজস্ব সাঁজোয়া গাড়ি ব্যবহারের বিষয়টি শুধু নিরাপত্তার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে চীনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও রাষ্ট্রীয় আত্মনির্ভরতার একটি প্রতীকী বার্তাও যুক্ত রয়েছে।

বিশ্বের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে চীন গত কয়েক দশকে নিজস্ব গাড়ি, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও শিল্প সক্ষমতা বাড়িয়েছে। রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহৃত ‘হংছি এন৭০১’ সেই সক্ষমতারই একটি প্রদর্শন হিসেবে সামনে আসে।

বিশেষ করে ব্রিকসের মতো বহুপক্ষীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে চীনা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এই গাড়ির উপস্থিতি আলাদা তাৎপর্য বহন করছে। সি চিন পিংয়ের জন্য তৈরি এই সাঁজোয়া লিমোজিন যেন একই সঙ্গে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং চীনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রদর্শনী।

তাই নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনে বিশ্বনেতাদের বৈঠক ও ভূরাজনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি চীনা প্রেসিডেন্টের ‘হংছি এন৭০১’ও কৌতূহলের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স