ঢাকা

ভারতের সঙ্গে ১০১ চুক্তি পর্যালোচনা, শিগগির মিলবে ফলাফল: চিফ হুইপ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ভারতের সঙ্গে বিগত সরকারের করা শতাধিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ও চুক্তি পর্যালোচনা করছে বর্তমান সরকার। এসব চুক্তির মধ্যে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের চুক্তিও রয়েছে। পর্যালোচনার ফলাফল শিগগিরই জানানো হবে বলে জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি।

শুক্রবার জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় সরকারদলীয় অন্যান্য হুইপও উপস্থিত ছিলেন। এর আগে বৃহস্পতিবার সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শেষ হয়।

চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের চুক্তির আওতায় বন্ধুরাষ্ট্রের জাহাজ চলাচল এবং এ চুক্তি বাতিলের বিষয়ে এক সাংবাদিক জানতে চাইলে চিফ হুইপ বলেন, ‘আমরা চুক্তিগুলো, মানে সব—১০১টা এমওইউ নিয়ে আলোচনা করছি এবং সেটার ফল অনতিবিলম্বে আপনারা পাবেন।’

তিনি জানান, সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের সঙ্গে করা চুক্তি ও সমঝোতাগুলো পর্যালোচনার কাজ চলছে। পর্যালোচনা শেষে এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করা হবে।

তৃতীয় অধিবেশনে ছয় বিল পাস

চিফ হুইপ বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন নয়টি কার্যদিবস ধরে চলে। এ অধিবেশনে ছয়টি বিল উত্থাপন ও পাস হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন বিধির আওতায় সংসদে ১ হাজার ৬৭৮টি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নিজে ১৫টি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন।

সংবিধান অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পরপর সংসদের অধিবেশন বসার ধারাবাহিকতায় তৃতীয় অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে উল্লেখ করে নূরুল ইসলাম বলেন, আগামী অধিবেশনও একই ধারায় অনুষ্ঠিত হবে।

ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনের ধারা নিয়ে ব্যাখ্যা

ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনে ১৮(ক) ধারা যুক্ত করা এবং পরে সমালোচনার মুখে সেটি বাদ দিয়ে সংসদে বিল পাস করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে চিফ হুইপ বলেন, বিষয়গুলো সব সময় একসঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায় না।

তিনি বলেন, সরকার দেশের আর্থিক অবস্থান শক্তিশালী করতে চায়। সেই লক্ষ্যেই ওই ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। পরে কেউ আগ্রহ না দেখানোয় সেটি বাতিল করা হয়েছে।

সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব

সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের সদস্যসংখ্যা ও সভাপতির পদ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে নূরুল ইসলাম বলেন, অতীতে বিরোধী দল থেকে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করার নজির খুব বেশি নেই।

তবে সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি হিসেবে সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি। চিফ হুইপের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারের অর্থ ব্যয়ের জবাবদিহির ক্ষেত্রে সরকারি হিসাব কমিটি সংসদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কমিটি। সব মন্ত্রণালয়সহ সরকারি অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে এ কমিটির কাছে জবাবদিহি করতে হয়।

নূরুল ইসলাম বলেন, মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত ৩৯টি স্থায়ী কমিটির মধ্যে ২৪টিতে বিরোধী দলের সদস্য রাখা হয়েছে। সংসদে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্বের অনুপাতে হিসাব করলে এই সংখ্যা কিছুটা বেশি।

তিনি জানান, ২২টি কমিটিতে বিরোধী দলের তিনজন করে সদস্য রয়েছেন। অন্য কমিটিগুলোতে রাখা হয়েছে দুজন করে সদস্য।

সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনীতে মা-বাবার অধিকার

তৃতীয় অধিবেশনে পাস হওয়া ছয়টি বিলের মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনীকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন চিফ হুইপ।

তিনি বলেন, নতুন বিধানের মাধ্যমে মা-বাবা জীবদ্দশায় সন্তানকে সম্পত্তি দান বা হস্তান্তর করার পরও ওই সম্পত্তি ভোগ করার অধিকার পাবেন। এর মূল উদ্দেশ্য বৃদ্ধ মা-বাবার সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

নূরুল ইসলামের ভাষ্য, অনেক ক্ষেত্রে মা-বাবা সন্তানকে সম্পত্তি দেওয়ার পর তাঁদের ভরণপোষণ করা হয় না কিংবা তাঁদের বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে হয়। নতুন আইনের মাধ্যমে মা-বাবার জীবদ্দশায় সম্পত্তির ওপর তাঁদের ভোগের অধিকার নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

মানবাধিকার ও গুম প্রতিরোধের আইন

তৃতীয় অধিবেশনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল পাস হয়েছে বলেও জানান চিফ হুইপ।

তিনি বলেন, এসব বিল তৈরির আগে বিভিন্ন অংশীজন, আইনজীবী, বিচারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সাংবাদিকদের মতামত নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ১৬ জন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনা করে তাঁদের পরামর্শও নেওয়া হয়।

চিফ হুইপের দাবি, অধ্যাদেশে শাস্তির ক্ষেত্রে যে সীমা ছিল, সংসদে পাস হওয়া বিলে তা আরও কঠোর করা হয়েছে। এমনকি মৃত্যুদণ্ডের বিধানও রাখা হয়েছে।

প্রতিবেশীসহ সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক চায় সরকার

বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেন নূরুল ইসলাম। তবে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে ব্যক্তিগতভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।

বাংলাদেশ সব প্রতিবেশী রাষ্ট্রসহ বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় বলে মন্তব্য করেন চিফ হুইপ। তবে যেসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থ বেশি, তাদের বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের যথাযথ মর্যাদার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হবে বলে জানান তিনি।

পাঁচ মাসে ২০৫ কোটি ডলার ঋণ পরিশোধ

সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে নূরুল ইসলাম বলেন, বিগত হাসিনা সরকারের রেখে যাওয়া ঋণের বিপরীতে গত পাঁচ মাসে ২০৫ কোটি ডলার পরিশোধ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, এই অর্থ জনগণের করের টাকা। তাই সরকারি অর্থের অপচয় বন্ধে বর্তমান সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। সরকারি অর্থের একটি টাকাও যাতে অপচয় না হয়, সে চেষ্টা করা হচ্ছে।

বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট নিয়ে সরকারের ব্যাখ্যা

দেশের বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যা নিয়ে সরকারের সমালোচনার প্রসঙ্গেও কথা বলেন চিফ হুইপ। তিনি বলেন, নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে দুই থেকে আড়াই বছর সময় লাগে। ফলে চাইলেই দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয়।

বিদ্যুৎ খাতে বিগত সরকারের বিভিন্ন চুক্তি ও দায়মুক্তির সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে। এতে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে।

চিফ হুইপ জানান, বিগত সরকারের করা দায়মুক্তির বিধান বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম নির্ধারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরিবর্তে সরকারকে সরাসরি ক্ষমতা দেওয়ার ব্যবস্থারও সমালোচনা করেন তিনি।

‘জুলাই সনদের পুরোটা বাস্তবায়ন হবে’

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার বলে মন্তব্য করেন নূরুল ইসলাম। তিনি বলেন, জুলাই সনদের বিষয়ে সরকারের অবস্থান দাঁড়ি, কমা ও সেমিকোলন পর্যন্ত পরিষ্কার। সরকার সনদের পুরোটা বাস্তবায়ন করবে।

চিফ হুইপ বলেন, জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই সনদে স্বাক্ষর হয়েছে। এটি বাস্তবায়নের কথা বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বলেছেন। তাই সরকার জুলাই সনদ শতভাগ বাস্তবায়ন করবে।

তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষায়, সংবিধান সংশোধন ছাড়া এ ক্ষেত্রে অন্য কোনো পথ নেই।

বিরোধীপক্ষ থেকে সংবিধান সংশোধন করা হলে তা সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে—এমন বক্তব্যের প্রসঙ্গে নূরুল ইসলাম বলেন, সংস্কার করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতেই হবে।

বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়ন করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সময়ে এতে সংশোধনী আনা হয়েছে। প্রতিবেশী ভারতেও সংবিধান একাধিকবার সংশোধন করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন চিফ হুইপ।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স