বর্তমান সরকারের ছয় মাসের কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করে সরকারের গতি ও অগ্রগতি হতাশাজনক বলে মন্তব্য করেছে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি। দলটির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেছেন, সরকারের পূর্ণাঙ্গ সফলতা বা ব্যর্থতার হিসাব করার জন্য ছয় মাস হয়তো চূড়ান্ত সময় নয়, তবে এই সময়ের কর্মকাণ্ড, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন ও অগ্রাধিকার দেখে সরকারের গতিপথ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। সেই বিবেচনায় সরকারের কার্যক্রমে তাঁরা আশাবাদী হওয়ার মতো যথেষ্ট অগ্রগতি দেখছেন না।
সোমবার সকালে রাজধানীর বিজয়নগরে এবি পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘সরকারের ছয় মাস: প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা! জনগণের সামনে পূর্ণাঙ্গ খতিয়ান’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে মজিবুর রহমান মঞ্জু এসব কথা বলেন। বর্তমান সরকারের ছয় মাসের কর্মকাণ্ডের পর্যালোচনা তুলে ধরতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, সরকারের মূল্যায়নের জন্য ছয় মাসকে একেবারে কম সময় বলা যায় না। আবার এই সময়ের ভিত্তিতে সরকারের পূর্ণাঙ্গ সফলতা বা ব্যর্থতার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও ঠিক হবে না। তবে ছয় মাসের সার্বিক মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে, সরকারের গতি ও অগ্রগতি হতাশাজনক।
তাঁর অভিযোগ, দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিবর্তে সরকার দলীয়তন্ত্রকে প্রাধান্য দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’—এই নীতির পরিবর্তে সরকারের কর্মকাণ্ডে ‘সবার আগে দলীয়তন্ত্র’কে গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
অর্থনীতি ও জনজীবনে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি নেই
সংবাদ সম্মেলনে এবি পার্টির পক্ষ থেকে বলা হয়, অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য, শাসনব্যবস্থা, উৎপাদন ব্যবস্থাপনা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং গণতান্ত্রিক চর্চার উন্নয়ন—এসব সূচক বিবেচনায় গত ছয় মাসে আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি।
দলটির নেতাদের দাবি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আগের চেয়েও খারাপ হয়েছে। বিশেষ করে অর্থনীতি ও জনজীবনের ওপর এর প্রভাব বেশি পড়ছে। তাঁদের মতে, মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও সেই অনুপাতে জীবনমানের উন্নতি হয়নি। বরং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, সরকারের ছয় মাসে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুযায়ী মানুষের জীবনমান উন্নত হয়নি; বরং তা আরও অধঃপতনের দিকে গেছে।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সাধারণ মানুষ যে চাপে পড়েছে, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে দলটি। এবি পার্টির নেতারা বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জীবনযাপন ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ
এবি পার্টির সংবাদ সম্মেলনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতিকে। দলটির নেতাদের মতে, সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনা বর্তমানে অত্যন্ত হতাশাজনক অবস্থায় রয়েছে।
তাঁদের দাবি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটের কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে শত শত কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে এক হাজারের বেশি নতুন শিল্পকারখানা চালু করার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
দলটির চেয়ারম্যান বলেন, জ্বালানি সংকট শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহ বা শিল্পকারখানার উৎপাদনের ওপর প্রভাব ফেলছে না; এর সঙ্গে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং বাজারব্যবস্থাও জড়িত। শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হলে তার প্রভাব কর্মসংস্থান ও সাধারণ মানুষের আয়েও পড়ে।
মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, জ্বালানি সংকটের সমাধানে সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে এক টেবিলে বসে আলোচনা করার পরামর্শ তাঁরা সরকারকে দিয়েছিলেন। কিন্তু সরকার তাঁদের সেই পরামর্শ গ্রহণ করেনি।
তাঁর মতে, জ্বালানি খাতের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে সমন্বিত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। সরকার এককভাবে সমস্যার সমাধান করতে না পারলে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজে বের করা উচিত।
নতুন কর্মসংস্থানের বদলে বেকারত্ব বাড়ছে: এবি পার্টি
সরকার নতুন কর্মসংস্থান তৈরির প্রত্যাশা দেখালেও বাস্তবে বেকারত্ব বেড়েছে বলে দাবি করেছে এবি পার্টি।
মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, দেশের অর্থনীতি সামগ্রিকভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে। বিনিয়োগ ও উৎপাদন কার্যক্রমে কাঙ্ক্ষিত গতি না থাকলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা কঠিন। ফলে একদিকে কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা বাড়ছে, অন্যদিকে বাস্তবে বেকারত্বের চাপও বাড়ছে।
শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ নিয়ে দলটি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে উৎপাদন ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এর ফলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির বদলে বিদ্যমান কর্মসংস্থানও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
প্রশাসনে দলীয়করণের অভিযোগ
সরকারের সুশাসন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে এবি পার্টি। মজিবুর রহমান মঞ্জুর অভিযোগ, প্রশাসনের বিভিন্ন নিয়োগপ্রক্রিয়ায় দলীয় লোক নিয়োগের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
এর পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্যাম্পাসভিত্তিক সহিংসতার ঘটনাও সরকারের সুশাসন নিয়ে গুরুতর সংশয় তৈরি করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এবি পার্টির নেতাদের মতে, একটি সরকারের গ্রহণযোগ্যতা শুধু অর্থনীতি বা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভর করে না। প্রশাসনে নিরপেক্ষতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করাও সরকারের কার্যকারিতা মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
তাঁদের দাবি, প্রশাসনে দলীয় প্রভাব বাড়লে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই নিয়োগ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও নিরপেক্ষতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতেও প্রশ্ন
সরকার খাল খনন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং ধর্মীয় পুরোহিতদের ভাতা চালুসহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে সামাজিক অর্থনীতিতে গতি আনার যে লক্ষ্য সরকারের রয়েছে, তার দৃশ্যমান প্রভাব সমাজে দেখা যাচ্ছে না বলে দাবি করেছে এবি পার্টি।
সংবাদ সম্মেলনে দলটির নেতারা বলেন, এসব কর্মসূচি নিয়ে একদিকে কাঙ্ক্ষিত সুফল দেখা যাচ্ছে না, অন্যদিকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগও সামনে আসছে।
তাঁদের মতে, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির প্রকৃত সুফল নিশ্চিত করতে হলে উপকারভোগী নির্বাচন, অর্থ বিতরণ, স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবায়ন এবং তদারকির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় এসব কর্মসূচির উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে।
‘বিরোধী দলের আন্দোলনের দরকার হবে না’
সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করতে গিয়ে এবি পার্টির নেতারা বলেন, যেভাবে জনদুর্ভোগ বাড়ছে, তাতে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর আলাদা করে আন্দোলন করার প্রয়োজন নাও হতে পারে। সাধারণ নাগরিকরাই একসময় ধৈর্য হারিয়ে রাজপথে নেমে আসতে পারেন।
তাঁদের মতে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে জনমনে অসন্তোষ আরও বাড়বে।
এবি পার্টি মনে করে, সরকারের উচিত পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আগেই জনগণের দুর্ভোগ কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। শুধু নতুন কর্মসূচি ঘোষণা নয়, সেগুলোর বাস্তবায়ন এবং সুফল মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
রাজনৈতিক সহিংসতা ফিরে আসার অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার সংস্কৃতি আবার ফিরে আসছে, যা তাঁরা চাননি।
তবে তিনি বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক সহনশীলতা এখনো রয়েছে—এটিকে সরকারের একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর প্রত্যাশা, সরকারের পুরো মেয়াদজুড়েই এই রাজনৈতিক সহনশীলতা বজায় থাকবে।
ফুয়াদের বক্তব্যে সরকারকে সমালোচনা করার পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিবেশে সহনশীলতা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি মনে করেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও সহিংসতার পরিবর্তে শান্তিপূর্ণ ও সাংবিধানিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ছয় মাসের মূল্যায়নে এবি পার্টির অবস্থান
এবি পার্টির মূল্যায়নে বর্তমান সরকারের ছয় মাসে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো কাঙ্ক্ষিত গতি ও অগ্রগতির অনুপস্থিতি। অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য, শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনা—বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকার প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি বলে মনে করছে দলটি।
তবে দলটির চেয়ারম্যানও স্বীকার করেছেন, ছয় মাসের ভিত্তিতে সরকারের পূর্ণাঙ্গ সফলতা বা ব্যর্থতার চূড়ান্ত হিসাব করা ঠিক হবে না। তাঁর মূল সমালোচনা সরকারের বর্তমান গতি, অগ্রাধিকার এবং বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে প্রতিশ্রুতির ব্যবধান নিয়ে।
এবি পার্টির মতে, সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনীতিতে গতি ফেরানো, দ্রব্যমূল্যের চাপ কমানো, শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং প্রশাসনে নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা করা। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম, জাতীয় নির্বাহী পরিষদের (এনইসি) সদস্য আব্বাস ইসলাম খান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক আব্দুল হালিম, মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক সেলিম খান, শ্রমবিষয়ক সম্পাদক শাহ আব্দুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক (বরিশাল) গাজী নাসির, কর্মসংস্থানবিষয়ক সম্পাদক সফিউল বাশার, মহানগর উত্তরের সদস্যসচিব সামিউল ইসলাম সবুজ, মহানগর দক্ষিণের সদস্যসচিব বারকাজ নাসির আহমদ, সহকারী প্রচার সম্পাদক আজাদুল ইসলাম আজাদসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়নে এবি পার্টির এই বক্তব্য মূলত অর্থনীতি, জনদুর্ভোগ, জ্বালানি সংকট ও সুশাসনকে কেন্দ্র করে সরকারের কার্যক্রমের সমালোচনা। দলটির দাবি, মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে সরকারের বাস্তব কর্মকাণ্ডের যে ব্যবধান তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত কমাতে না পারলে জনঅসন্তোষ আরও বাড়তে পারে।