২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তির নীতিমালা প্রকাশ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। নতুন নীতিমালায় একাদশে ভর্তির আবেদন, শিক্ষার্থী নির্বাচন, ফল প্রকাশ, ভর্তি নিশ্চায়ন, ভর্তি কার্যক্রম এবং ক্লাস শুরুর সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। এবারও কোনো ভর্তি পরীক্ষা বা বাছাই পরীক্ষা নেওয়া হবে না। এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতেই একাদশ শ্রেণিতে শিক্ষার্থী নির্বাচন করা হবে।
নীতিমালা অনুযায়ী, আগামী ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন শুরু হবে। শিক্ষার্থীরা ১০ সেপ্টেম্বর রাত ৮টা পর্যন্ত আবেদন করার সুযোগ পাবেন। আবেদন ও ভর্তি-সংক্রান্ত সব কার্যক্রম শেষে আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে একাদশ শ্রেণির ক্লাস শুরু হবে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির নীতিমালা প্রকাশ করে।
নতুন নীতিমালায় কলেজগুলোর মোট আসনের ৯৩ শতাংশ সবার জন্য মেধার ভিত্তিতে উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। বাকি ৭ শতাংশ আসন বিভিন্ন কোটার জন্য সংরক্ষিত থাকবে। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের জন্য ৫ শতাংশ এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এর অধীন দপ্তর-সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য ২ শতাংশ আসন রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
২ সেপ্টেম্বর শুরু, ক্লাস ২৩ সেপ্টেম্বর
নীতিমালায় একাদশে ভর্তির পুরো সময়সূচি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। আবেদন শুরুর পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীদের পছন্দের কলেজ ও বিভাগ নির্বাচন করে আবেদন করতে হবে।
ভর্তির গুরুত্বপূর্ণ সময়সূচি হলো—
২ সেপ্টেম্বর ২০২৬: একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন শুরু
১০ সেপ্টেম্বর রাত ৮টা: সাধারণ আবেদন শেষ
১২-১৩ সেপ্টেম্বর রাত ৮টা পর্যন্ত: পুনর্নিরীক্ষণ বা পুনর্মূল্যায়নে ফল পরিবর্তন হওয়া শিক্ষার্থীদের আবেদন এবং পছন্দক্রম পরিবর্তনের সুযোগ
১৭ সেপ্টেম্বর রাত ৮টা: নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের ফল প্রকাশ
১৯ সেপ্টেম্বর রাত ৮টা: নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের ভর্তি নিশ্চায়নের শেষ সময়
২০-২২ সেপ্টেম্বর: একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি কার্যক্রম
২৩ সেপ্টেম্বর: একাদশ শ্রেণির ক্লাস শুরু
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচিত শিক্ষার্থী ভর্তি নিশ্চায়ন না করলে তার নির্বাচন ও আবেদন বাতিল হয়ে যাবে বলে নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে।
পুনর্নিরীক্ষণের ফল পরিবর্তন হলে আবার আবেদন
এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল পুনর্নিরীক্ষণ বা পুনর্মূল্যায়নের জন্য আবেদন করা শিক্ষার্থীদের বিষয়টিও নতুন ভর্তি নীতিমালায় বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
২ থেকে ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ভর্তি-সংক্রান্ত পুনর্নিরীক্ষণ বা পুনর্মূল্যায়নের ফল পাওয়া শিক্ষার্থীরাও একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য আবেদন করতে পারবেন।
এ ছাড়া ১২ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর রাত ৮টা পর্যন্ত পুনর্নিরীক্ষণ বা পুনর্মূল্যায়নের ফলে যেসব শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তিত হবে, তাঁদের জন্য বিশেষভাবে আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে। একই সময়ে শিক্ষার্থীরা নিজেদের পছন্দক্রম পরিবর্তনও করতে পারবেন।
ভর্তি পরীক্ষা থাকছে না
এবার একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য কোনো বাছাই পরীক্ষা বা ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হবে না। শিক্ষার্থীদের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে মেধাক্রম তৈরি করে কলেজে ভর্তির জন্য নির্বাচন করা হবে।
অর্থাৎ শিক্ষার্থীর এসএসসি বা সমমানের পরীক্ষায় অর্জিত ফলই হবে কলেজে ভর্তির ক্ষেত্রে প্রধান ভিত্তি। শিক্ষার্থীরা আবেদন করার সময় পছন্দের কলেজ ও বিভাগ নির্বাচন করবেন এবং মেধাক্রম ও আসনসংখ্যার ভিত্তিতে তাঁদের পছন্দ অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্ধারণ করা হবে।
৯৩ শতাংশ আসন সবার জন্য উন্মুক্ত
একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির মোট আসনের ৯৩ শতাংশ মেধার ভিত্তিতে সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। এসব আসনে কোনো বিশেষ কোটা থাকবে না। এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে মেধাক্রম তৈরি করে শিক্ষার্থী নির্বাচন করা হবে।
অবশিষ্ট ৭ শতাংশ আসন বিভিন্ন কোটার জন্য নির্ধারিত। এর মধ্যে—
৫ শতাংশ: মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পুত্র-কন্যাদের জন্য
১ শতাংশ: শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য
১ শতাংশ: শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন দপ্তর ও সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য
নীতিমালায় বলা হয়েছে, এই কোটাপদ্ধতি শুধু ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রযোজ্য হবে।
মুক্তিযোদ্ধা কোটায় প্রয়োজন হবে প্রমাণপত্র
মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের জন্য সংরক্ষিত কোটায় ভর্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রমাণপত্র বা গেজেটের সত্যায়িত কপি জমা দিতে হবে। ভর্তির সময় এসব কাগজপত্রের মূল কপি দেখাতে হবে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ইস্যু করা মুক্তিযোদ্ধা সনদ যথাযথভাবে যাচাই করে ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তবে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধা বা শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পুত্র-কন্যা পাওয়া না গেলে ওই কোটার আসন খালি রাখা যাবে না। সেসব আসনে মেধাতালিকা থেকে শিক্ষার্থী ভর্তি করতে হবে।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য ২ শতাংশ
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এর অধীন দপ্তর-সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য মোট ২ শতাংশ আসন সংরক্ষণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এর মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য ১ শতাংশ এবং মন্ত্রণালয়ের অধীন দপ্তর বা সংস্থায় কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য আরও ১ শতাংশ আসন থাকবে।
এ কোটায় আবেদন করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারীর দপ্তরপ্রধানের প্রত্যয়নপত্র জমা দিতে হবে।
তবে নির্ধারিত কোটায় আবেদনকারীর সংখ্যা আসনের তুলনায় বেশি হলে ওই কোটার প্রার্থীদের মধ্যেই মেধার ভিত্তিতে শিক্ষার্থী নির্বাচন করা হবে।
জিপিএ সমান হলে যেভাবে মেধাক্রম হবে
একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে দুই বা ততোধিক শিক্ষার্থীর জিপিএ সমান হলে শুধু জিপিএ দিয়ে মেধাক্রম নির্ধারণ করা হবে না। এ ক্ষেত্রে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় সর্বমোট প্রাপ্ত নম্বর বিবেচনায় নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড, কারিগরি শিক্ষা বোর্ড এবং বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে গ্রেড পয়েন্ট ও প্রাপ্ত নম্বর সমতুল্য করে হিসাব করতে হবে। একইভাবে বিভিন্ন বছরের গ্রেড পয়েন্ট ও প্রাপ্ত নম্বরও সমতুল্য করে হিসাব করার নির্দেশনা রয়েছে।
অর্থাৎ জিপিএ একই হলেও মোট নম্বরে যে শিক্ষার্থী এগিয়ে থাকবেন, মেধাক্রমে তিনি অগ্রাধিকার পাবেন।
বিজ্ঞান বিভাগে জটিলতা হলে যে বিষয়গুলোর নম্বর দেখা হবে
বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তির ক্ষেত্রে দুই বা ততোধিক প্রার্থীর মোট নম্বর সমান হলে অতিরিক্ত কিছু বিষয়ের নম্বর বিবেচনা করা হবে।
প্রথমে সাধারণ গণিত এবং উচ্চতর গণিত/জীববিজ্ঞানে প্রাপ্ত নম্বর বিবেচনা করা হবে। এরপরও যদি শিক্ষার্থীদের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করা না যায়, তাহলে পর্যায়ক্রমে ইংরেজি, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন বিষয়ে প্রাপ্ত নম্বর বিবেচনায় নেওয়া হবে।
এভাবে নির্ধারিত বিষয়গুলোর নম্বর পর্যায়ক্রমে বিবেচনা করে সমান ফল করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে মেধাক্রম নির্ধারণ করা হবে।
মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে মেধাক্রম
মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও জিপিএ ও মোট নম্বর সমান হলে নির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক নম্বর বিবেচনা করা হবে।
প্রথমে ইংরেজি, এরপর গণিত এবং তারপর বাংলা বিষয়ে প্রাপ্ত নম্বর পর্যায়ক্রমে বিবেচনায় নেওয়া হবে।
অর্থাৎ এসব বিভাগে সমান ফলের ক্ষেত্রে ইংরেজিতে বেশি নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থী অগ্রাধিকার পাবেন। ইংরেজির নম্বরও সমান হলে গণিত এবং এরপর বাংলার নম্বর বিবেচনা করা হবে।
এক বিভাগের শিক্ষার্থী অন্য বিভাগে আবেদন করলে
এক বিভাগের প্রার্থী অন্য বিভাগে ভর্তির ক্ষেত্রে জিপিএ সমান হলে প্রথমে সর্বমোট প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে মেধাক্রম নির্ধারণ করা হবে।
এ ক্ষেত্রেও সমতা দূর করা সম্ভব না হলে পর্যায়ক্রমে ইংরেজি, গণিত ও বাংলা বিষয়ে প্রাপ্ত নম্বর বিবেচনা করা হবে।
ফলে শিক্ষার্থীরা এসএসসি পর্যায়ে যে বিভাগে পড়াশোনা করেছে, তার বাইরে অন্য বিভাগে একাদশে ভর্তির সুযোগ পেলে মেধাক্রম নির্ধারণের জন্য নির্ধারিত এই নিয়মও প্রযোজ্য হবে।
সময়মতো নিশ্চায়ন না করলে আবেদন বাতিল
১৭ সেপ্টেম্বর রাত ৮টায় একাদশে ভর্তির জন্য নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের ফল প্রকাশ করা হবে। ফল প্রকাশের পর নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের ভর্তি নিশ্চায়নের জন্য ১৯ সেপ্টেম্বর রাত ৮টা পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে।
এই সময়ের মধ্যে নির্বাচিত শিক্ষার্থী ভর্তি নিশ্চায়ন না করলে তার নির্বাচন এবং আবেদন—দুটিই বাতিল হয়ে যাবে। তাই ফল প্রকাশের পর শিক্ষার্থীদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিশ্চায়নের কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে।
এরপর ২০ থেকে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কলেজগুলোতে ভর্তি কার্যক্রম চলবে। সব প্রক্রিয়া শেষে ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে একাদশ শ্রেণির ক্লাস শুরু হবে।
শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়
একাদশে ভর্তির নতুন নীতিমালায় ভর্তি পরীক্ষা না থাকলেও শিক্ষার্থীদের পছন্দক্রম নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ মেধাক্রম, আসনসংখ্যা এবং শিক্ষার্থীর পছন্দের সমন্বয়ের ভিত্তিতেই কলেজ নির্বাচন হবে।
বিশেষ করে যেসব শিক্ষার্থী ফল পুনর্নিরীক্ষণ বা পুনর্মূল্যায়নের জন্য আবেদন করেছেন, তাঁদের জন্য নির্ধারিত অতিরিক্ত সময়সীমা গুরুত্বপূর্ণ। ফল পরিবর্তিত হলে ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বরের বিশেষ সময়ে আবেদন এবং পছন্দক্রম পরিবর্তনের সুযোগ নিতে হবে।
অন্যদিকে কোনো কোটায় আবেদন করতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রমাণপত্র যথাযথভাবে প্রস্তুত রাখতে হবে। কোটায় আবেদনকারীর সংখ্যা বেশি হলে ওই কোটার মধ্যেও মেধার ভিত্তিতে নির্বাচন করা হবে।
সব মিলিয়ে ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে এসএসসি ও সমমানের ফলই মূল ভিত্তি থাকছে। ভর্তি পরীক্ষা না থাকলেও জিপিএ সমান হলে মোট নম্বর এবং নির্দিষ্ট বিষয়ের নম্বরের ভিত্তিতে মেধাক্রম নির্ধারণের বিস্তারিত নিয়ম নির্ধারণ করে দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ফলে শিক্ষার্থীদের আবেদন করার আগে নীতিমালার সব শর্ত ও সময়সূচি ভালোভাবে জেনে নেওয়া জরুরি।