ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের প্রায় পাঁচ মাস পর মঙ্গলবার রাজ্যের দুটি আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। আসন দুটি হলো পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম ও মুর্শিদাবাদের রেজিনগর। সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ চলে।
উপনির্বাচন ঘিরে ক্ষমতাসীন বিজেপি ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেখা গেছে। বিজেপির দাবি, দুই আসনেই ভোট অবাধ, শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্নে হয়েছে। তবে কংগ্রেস, সিপিএম, তৃণমূল কংগ্রেসের মমতা ও ঋতব্রত অংশ এবং আমজনতা উন্নয়ন পার্টি ভোটে অনিয়ম, বুথ দখল ও ভোট লুটের অভিযোগ তুলেছে।
বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, উপনির্বাচনের নামে দুই আসনেই ‘প্রহসন’ হয়েছে। অনেক ভোটার ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজেদের ভোট দিতে পারেননি বলেও দাবি করেছে তারা। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ভোটারদের আঙুলে কালি লাগানোর অভিযোগ
বিরোধী দল ও কয়েকজন ভোটারের অভিযোগ, ভোটাররা কেন্দ্রে যাওয়ার আগেই বিজেপির কর্মী পরিচয়ধারী ব্যক্তিরা তাঁদের আঙুলে কালি লাগিয়ে দিয়েছেন। এরপর তাঁদের বলা হয়েছে, ভোট দেওয়া হয়ে গেছে, তাঁরা যেন বাড়ি ফিরে যান।
বিরোধীদের আরও অভিযোগ, বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের বাধা দেওয়া হয়েছে এবং কিছু কেন্দ্রে বিজেপির কর্মী পরিচয়ধারী ব্যক্তিরা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ভোট দিয়েছেন।
দুই আসনের বিভিন্ন ভোটারের কাছ থেকেও এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে বিরোধী দলগুলো। তাঁদের অভিযোগ, ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পর ভোটার স্লিপও কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
নন্দীগ্রামে ভোটের সময় বিজেপির ‘বাইক বাহিনী’ তাণ্ডব চালিয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে বিজেপি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ভোট শান্তিপূর্ণ হওয়ার দাবি করেছে।
‘আমাদের কোনো কেন্দ্রে এজেন্ট দিতে দেওয়া হয়নি’
নন্দীগ্রামের কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধান অভিযোগ করেছেন, তাঁর দলের নির্বাচনী এজেন্টদের বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের কোনো কেন্দ্রে এজেন্ট দিতে দেওয়া হয়নি। তাড়িয়ে দিয়েছে এজেন্টদের।’
কংগ্রেসের পক্ষ থেকে ভোটের পরিবেশ নিয়ে আরও অভিযোগ তোলা হয়েছে। দলটির নেতারা দাবি করেছেন, ভোটকেন্দ্রে বিরোধী দলের এজেন্ট ও ভোটারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে।
অন্যদিকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নন্দীগ্রামে নিজের ভোট দেওয়ার পর দাবি করেন, দুই আসনেই শান্তিপূর্ণভাবে ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে।
রেজিনগরে হুমায়ুন কবীর আটক
ভোটের দিন সকালে রেজিনগরে আমজনতা উন্নয়ন পার্টির কার্যালয় থেকে দলটির প্রধান হুমায়ুন কবীরকে আটক করে পুলিশ। আইন অমান্যের অভিযোগে তাঁকে রেজিনগর থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
হুমায়ুন কবীর মুর্শিদাবাদের নওদা আসনের বিধায়ক। আটকের পর তিনি অভিযোগ করেন, তাঁদের ভোট করতে দেওয়া হয়নি এবং বুথ দখল করে নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের ওরা ভোট করতে দেয়নি। বুথ দখল করে নিয়েছে। আমরা বিষয়টি নির্বাচন কমিশনে জানিয়েছি।’
হুমায়ুন কবীরের আটকের প্রতিবাদে এবং ভোটে অনিয়মের অভিযোগ তুলে কংগ্রেস রেজিনগর থানা ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করে। কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরী সেখানে অবস্থান ধর্মঘটেও অংশ নেন।
কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতি শুভংকর সরকার দুই আসনের নির্বাচনকে ‘প্রহসনমূলক’ আখ্যা দিয়ে নির্বাচন বাতিল করে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে দলটির পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের কাছেও অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
কেন উপনির্বাচন হলো
সদ্য অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনে একই সঙ্গে দুটি আসনে জয় পাওয়ায় নওদা ও রেজিনগরের মধ্যে একটি আসন ছাড়েন হুমায়ুন কবীর। তিনি রেজিনগর আসন ছেড়ে নওদা ধরে রাখেন। ফলে রেজিনগরে উপনির্বাচনের প্রয়োজন হয়।
একইভাবে শুভেন্দু অধিকারী পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম ও কলকাতার ভবানীপুর—দুই আসনে জয়ী হয়েছিলেন। তিনি ভবানীপুর আসন ছেড়ে নন্দীগ্রাম রাখেন। এ কারণে নন্দীগ্রামেও উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
নন্দীগ্রামে প্রার্থীদের লড়াই
নন্দীগ্রামে কংগ্রেসের প্রার্থী কারাবন্দী মিলন প্রধান। সিপিএমের প্রার্থী শান্তি গোপাল গিরি। বিজেপি প্রার্থী করেছে হাসি রানী রথকে।
হাসি রানী রথ বিজেপি নেতা ও শুভেন্দু অধিকারীর আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথের মা। বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার দুই দিন পর, ৬ মে উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামে চন্দ্রনাথ রথ নিহত হন।
এই আসনে তৃণমূল কংগ্রেসের বিদ্রোহী ঋতব্রত অংশের প্রার্থী মো. এহতেশামুল হক।
নন্দীগ্রামের ফলাফল তাই বিজেপির জন্যও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিধানসভা নির্বাচনে আসনটি ধরে রাখার পর উপনির্বাচনেও দলটি একই অবস্থান ধরে রাখতে পারে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আগ্রহ রয়েছে।
রেজিনগরে বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা
রেজিনগরে আমজনতা উন্নয়ন পার্টির প্রার্থী গোলাম নবী আজাদ। তিনি দলটির নেতা এবং হুমায়ুন কবীরের ছেলে।
এই আসনে বিজেপির প্রার্থী জেলা বিজেপির নেতা শাখারভ সরকার। তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী রবিউল আলম চৌধুরী এবং কংগ্রেসের প্রার্থী আবদুল্লাহ হিল কাফি। সিপিএমের প্রার্থী সইফ আসাদ আলি। এ ছাড়া তৃণমূলের ঋতব্রত অংশের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন শফিউদ্দিন শেখ।
ফলে রেজিনগরে একাধিক দলের প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে। হুমায়ুন কবীরের রাজনৈতিক প্রভাবের পাশাপাশি বিজেপি, তৃণমূল, কংগ্রেস ও বামপন্থী প্রার্থীদের ভোটের সমীকরণও ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
জনপ্রিয়তার পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকেরা
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই দুই উপনির্বাচন পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। বিধানসভা নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস পর একই আসনে ভোট হওয়ায় দলগুলোর ভোটের ব্যবধান ও জনসমর্থনের পরিবর্তন নিয়ে তুলনা করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে নন্দীগ্রামে বিজেপি আসনটি ধরে রাখতে পারে কি না এবং বিধানসভা নির্বাচনের তুলনায় দলটির ভোট বাড়ে নাকি কমে—তা রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রেজিনগরেও রয়েছে ভিন্ন সমীকরণ। হুমায়ুন কবীরের দল আসনটি ধরে রাখতে পারে কি না, নাকি বিজেপি বা অন্য কোনো দল সেখানে জয় পায়—সেদিকেও নজর রয়েছে।
তবে ভোটের দিন বিরোধী দলগুলোর তোলা বুথ দখল, ভোট লুট, ভোটারদের বাধা দেওয়া ও এজেন্ট বের করে দেওয়ার অভিযোগের কারণে নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন কী ব্যবস্থা নেয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দুই আসনে ভোট গণনা হবে ৯ অক্টোবর। সেদিনের ফলেই স্পষ্ট হবে, বিধানসভা নির্বাচনের পর কয়েক মাসের ব্যবধানে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর ভোটের সমীকরণে কতটা পরিবর্তন এসেছে।