বৃদ্ধ বয়সে সন্তানদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে অনেক বাবা-মা নিজেদের সম্পত্তি সন্তানদের লিখে দেওয়ার পর নানা সমস্যার মুখোমুখি হন। কখনো কখনো সম্পত্তি হস্তান্তরের পরই তাঁদের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। নতুন সংশোধিত সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে এমন পরিস্থিতিতে প্রবীণদের সুরক্ষার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন আইনবিদ ও নাগরিক অধিকারকর্মীরা।
সম্পত্তি দিয়ে বিপাকে পড়েছিলেন হালিমা
বরিশালের গৌরনদীর ৮২ বছর বয়সী হালিমা বেগমের ঘটনাটি এর একটি উদাহরণ। তাঁর স্বামী শাহজাহান মৃধা মৃত্যুর আগে ৬৪ শতাংশ জমি স্ত্রীর নামে দিয়ে যান। পরে হালিমা বড় ছেলে মাহাবুব আলম মৃধার সঙ্গে বসবাস করতেন।
একপর্যায়ে হালিমা সেই জমি ছেলের নামে লিখে দেন। এরপর ছেলে তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। সম্পত্তিটি ছেলের নামে চলে যাওয়ায় স্বামীর রেখে যাওয়া জমির ওপরও হালিমার আর কার্যকর দাবি ছিল না।
২০২২ সালের এই ঘটনা তখন সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।
নতুন আইনে কী বদলেছে
সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে নতুন বিধান যুক্ত করে দাতাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার দেওয়া হয়েছে। এখন নির্দিষ্ট পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কেউ সম্পত্তি দান করলেও নিজের জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তি ভোগের অধিকার নিজের কাছে রাখতে পারবেন।
অর্থাৎ, বাবা-মা সন্তানকে সম্পত্তি দান করলেও তাঁরা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগ করতে পারবেন।
নতুন বিধান অনুযায়ী—
- বাবা-মা তাঁদের সন্তানকে সম্পত্তি দান করতে পারবেন।
- দাদা-দাদি বা নানা-নানি নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দিতে পারবেন।
- সন্তান তাঁর বাবা-মা, দাদা-দাদি বা নানা-নানিকে সম্পত্তি দান করতে পারবেন।
- স্বামী ও স্ত্রী পরস্পরের মধ্যে এ ধরনের দান করতে পারবেন।
- দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত সম্পত্তি ভোগের অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন।
- গ্রহীতা দাতার আগে মারা গেলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সম্পত্তি গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে যেতে পারে, তবে দাতার আজীবন ভোগের অধিকার বহাল থাকবে।
আইনবিদদের মতে, এর ফলে সম্পত্তি সন্তান বা অন্য স্বজনের নামে দেওয়ার পরও বৃদ্ধ বাবা-মায়ের থাকার ও সম্পত্তি ব্যবহারের নিরাপত্তা বাড়বে।
দান করা সম্পত্তি কি পরে বাতিল করা যাবে?
নতুন আরেকটি বিধানে বলা হয়েছে, সম্পত্তি নিবন্ধনের পর সাধারণভাবে দান বাতিল করা যাবে না। তবে প্রকৃত প্রয়োজনের ক্ষেত্রে—যেমন চিকিৎসা, আর্থিক, শিক্ষা বা পারিবারিক প্রয়োজন—আইনে নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে দান পরিবর্তন বা বাতিল করার সুযোগ থাকতে পারে।
এর ফলে সম্পত্তি দানের বিষয়ে ভবিষ্যৎ বিরোধ ও মামলা কমতে পারে বলে মনে করছেন আইনবিদেরা।
মুসলিম আইনের সঙ্গে কি বিরোধ তৈরি হবে?
এই সংশোধন নিয়ে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অঙ্গনে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিরোধী দলের কয়েকজন সংসদ সদস্য সংসদে আপত্তি জানান। পরে জামায়াতে ইসলামী আইনটিকে ইসলামি বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক দাবি করে তা প্রত্যাহারের আন্দোলনের কথা জানিয়েছে।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশও আইনটি আরও পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনটির নেতারা প্রবীণদের সুরক্ষার উদ্যোগকে ইতিবাচক বললেও নতুন বিধান যেন ইসলামি মিরাস ও হেবার নিয়মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়, সে বিষয়ে সতর্কতার কথা বলেছেন।
অন্যদিকে আইনবিদদের বক্তব্য, এটি মুসলিম পারিবারিক আইন পরিবর্তন করছে না; বরং সম্পত্তি হস্তান্তরের আইনে একটি নতুন পদ্ধতি যুক্ত করছে। ফলে মুসলিম আইনে প্রচলিত হেবা বা অন্যান্য স্বীকৃত পদ্ধতিও বহাল থাকবে।
আইনবিদদের চোখে কেন গুরুত্বপূর্ণ
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—সম্পত্তি দান করলেও দাতার বার্ধক্যকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে এমন পরিস্থিতিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে বাবা-মা সন্তানকে সম্পত্তি দিয়ে দেওয়ার পর সন্তানের কাছ থেকেই অবহেলা বা নির্যাতনের শিকার হন।
এ ছাড়া দেওয়ানি আদালতে এমন মামলাও দেখা যায়, যেখানে বয়স্ক ব্যক্তি দাবি করেন যে প্রতারণা বা ভুল বুঝিয়ে তাঁর কাছ থেকে সম্পত্তি দানের দলিলে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় দানের শর্ত ও দাতার অধিকার স্পষ্ট হওয়ায় এ ধরনের বিরোধ কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
নারী ও প্রবীণদের জন্য বাড়তি সুরক্ষা
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন ব্যবস্থা বিশেষভাবে নারী ও বয়স্ক মানুষের জন্য কার্যকর হতে পারে। কারণ অনেক নারী জীবনের শেষ পর্যায়ে স্বামী বা সন্তানের ওপর নির্ভরশীল থাকেন এবং নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সম্পত্তি তাঁদের নামে বা তাঁদের কাছ থেকে অন্যের নামে হস্তান্তর করেন।
নতুন বিধানে সম্পত্তি দানের পরও নিজের ভোগের অধিকার ধরে রাখার সুযোগ থাকায় এমন ব্যক্তিরা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ অবস্থানে থাকবেন।
দেশে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৫৩ লাখের বেশি, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ। তাই আইনটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বিপুলসংখ্যক প্রবীণ মানুষ উপকৃত হতে পারেন।
সামনে মূল চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইন পাস করাই শেষ কথা নয়। বাস্তবে বয়স্ক বাবা-মা ও নারীরা যাতে তাঁদের অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সে জন্য নিবন্ধন, দলিল তৈরি এবং আইনি সহায়তার বিষয়গুলোও সহজ ও স্বচ্ছ করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, সংশোধিত আইনটি সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে দাতার অধিকার ও গ্রহীতার মালিকানার মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করেছে। তবে এর বাস্তব প্রয়োগ কেমন হবে এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও পারিবারিক আইনের সঙ্গে এটি কীভাবে সমন্বয় করা হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।