আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটার এলাকা পরিবর্তন করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও দলটির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। প্রস্তাবিত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই তাঁদের এই ভোটার এলাকা পরিবর্তন বলে জানিয়েছে দলটি।
ভোটার এলাকা পরিবর্তনের পর আসিফ মাহমুদ এখন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতাধীন আফতাবনগর এলাকার ভোটার হয়েছেন। অন্যদিকে, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার ভোটার থেকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) আওতাধীন ঢাকা-৮ সংসদীয় আস এলাকার ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন।
এনসিপির শীর্ষ পর্যায়ের এই দুই নেতার ভোটার এলাকা পরিবর্তনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দলটির নীতিনির্ধারণী ফোরাম রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য ও মিডিয়া উপ-কমিটির প্রধান সারোয়ার তুষার। তিনি জানিয়েছেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই তাঁদের ভোটার এলাকা পরিবর্তন করা হয়েছে।
সিটি নির্বাচনের প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি
সারোয়ার তুষারের বক্তব্য অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এনসিপি নিজেদের রাজনৈতিক কৌশল অনুযায়ী প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে আসিফ মাহমুদ ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে দুই সিটি করপোরেশনের ভিন্ন এলাকায় ভোটার হিসেবে স্থানান্তর করা হয়েছে।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর প্রসঙ্গে সারোয়ার তুষার বলেন, ‘নাসির (নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী) তো ঢাকা থেকে ইলেকশন করেছে, ভবিষ্যতে (সিটি করপোরেশন নির্বাচন) এখান থেকেই করবে।’
অর্থাৎ, এনসিপির এই দুই নেতার ভোটার এলাকা পরিবর্তনকে দলটি আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থিতার সঙ্গে যুক্ত করে দেখছে।
আসিফ মাহমুদ উত্তরের ভোটার
এত দিন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত ছিলেন এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। সম্প্রতি তাঁর ভোটার এলাকা পরিবর্তন করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন আফতাবনগর এলাকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
নিজের ভোটার এলাকা পরিবর্তনের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে জানিয়েছেন আসিফ মাহমুদ। সেখানে তিনি ভোটার এলাকা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া ও নির্বাচন কমিশনের অনুমোদনের বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
আসিফ মাহমুদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভোটার এলাকা পরিবর্তনের জন্য তিনি নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত ফরম-১৩-এর মাধ্যমে আবেদন করেন। আবেদন জমা দেওয়ার পর প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই এবং দাপ্তরিক নথিপত্র পরীক্ষা শেষে নির্বাচন কমিশন তাঁর আবেদন অনুমোদন করে।
এর ফলে তাঁর ভোটার নিবন্ধন এখন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকায় স্থানান্তরিত হয়েছে।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী দক্ষিণের ভোটার
অন্যদিকে, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকা থেকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকায় ভোটার হিসেবে স্থানান্তরিত হয়েছেন।
তাঁকে ঢাকা-৮ সংসদীয় আসনের অন্তর্ভুক্ত এলাকায় ভোটার করা হয়েছে। দলীয় সূত্র বলছে, ভবিষ্যতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনায় রেখেই এই পরিবর্তন করা হয়েছে।
এনসিপির পক্ষ থেকে অবশ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি, আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আসিফ মাহমুদ ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী কোন পদে বা কোন নির্দিষ্ট ওয়ার্ড থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। তবে ভোটার এলাকা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত তাঁদের সম্ভাব্য প্রার্থিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
জামায়াতের সঙ্গে জোটে প্রভাব পড়বে কি?
এনসিপির দুই নেতার ভোটার এলাকা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে দলটির রাজনৈতিক কৌশল নিয়েও আলোচনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির রাজনৈতিক সমঝোতা বা জোটের ক্ষেত্রে এ সিদ্ধান্তের কোনো প্রভাব পড়বে কি না, সে প্রশ্নও উঠেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সারোয়ার তুষার বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে এনসিপি নিজেদের মতো করে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত আগেই জানিয়েছে। ফলে দুই নেতার ভোটার এলাকা পরিবর্তনের সঙ্গে জোটের কোনো বিরোধ নেই বলে তাঁর বক্তব্য।
সারোয়ার তুষার বলেন, ‘না, আমাদের তো জোটে আগে থেকেই বলা আছে যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আমরা আমাদের মতো করে করব; যার যার মতো হবে। সেটা আমাদের নিজস্ব কৌশল হিসেবে আমরা এখন দুইজনকে দুই জায়গায় স্থানান্তরিত করলাম।’
তাঁর এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক সমঝোতা বা জোটের বাইরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলটি নিজস্ব সাংগঠনিক ও নির্বাচনী কৌশল অনুসরণ করতে চায়।
ফরম-১৩–এর মাধ্যমে ভোটার এলাকা পরিবর্তন
নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, একজন ভোটার এক ভোটার এলাকা থেকে অন্য ভোটার এলাকায় নিবন্ধন স্থানান্তর করতে চাইলে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় আবেদন করতে হয়। এ ক্ষেত্রে ফরম-১৩ ব্যবহার করা হয়।
আসিফ মাহমুদের ভোটার এলাকা পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। আবেদন পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট তথ্য ও দাপ্তরিক নথিপত্র যাচাই-বাছাই করে নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নেয়। অনুমোদনের পর তাঁর ভোটার নিবন্ধন নতুন এলাকায় স্থানান্তরিত হয়েছে।
ভোটার এলাকা পরিবর্তনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে মূলত আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটার হওয়া রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়ায় বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের ভোটার তালিকা ও নির্বাচনী এলাকার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এনসিপির কৌশল
জাতীয় নাগরিক পার্টির দুই শীর্ষ নেতার ভোটার এলাকা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে ঘিরে দলটির সম্ভাব্য নির্বাচনী প্রস্তুতির বিষয়টি সামনে এসেছে। আসিফ মাহমুদকে উত্তর সিটি করপোরেশনের আফতাবনগর এলাকায় এবং নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ঢাকা-৮ এলাকার ভোটার করা হয়েছে।
এনসিপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলটি নিজস্ব কৌশল অনুযায়ী প্রার্থী দেবে। ফলে জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক সমীকরণের পাশাপাশি সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলটির আলাদা নির্বাচনী পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে দুই নেতার ভোটার এলাকা পরিবর্তন হলেও তাঁদের চূড়ান্ত নির্বাচনী পদ, ওয়ার্ড বা প্রার্থিতার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত বিষয়টি সম্ভাব্য প্রার্থিতার পর্যায়েই থাকছে।
আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো যখন সম্ভাব্য প্রার্থী ও নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণে ব্যস্ত, তখন এনসিপির এই দুই শীর্ষ নেতার ভোটার এলাকা পরিবর্তন দলটির ঢাকার স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিকল্পনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।