জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের প্রশংসার জবাবে তাঁকে ১৫০ টাকার দুপুরের খাবারের দাওয়াত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে প্রধানমন্ত্রীর এই আমন্ত্রণ গ্রহণের পাশাপাশি বিরোধীদলীয় নেতা বলেছেন, তিনি একা খাবেন না; দেশের ১৮ কোটি মানুষকে সঙ্গে নিয়ে খেতে চান।
সোমবার জাতীয় সংসদে ‘তীব্র জ্বালানি ও গ্যাস–সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে বেকারত্ব সৃষ্টি এবং দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে মারাত্মক বিপর্যয় রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ’ বিষয়ে ৬৮ বিধির সাধারণ আলোচনার এক পর্যায়ে এ কথোপকথন হয়।
আলোচনায় বিরোধীদলীয় নেতা প্রধানমন্ত্রীর স্বল্পমূল্যের জীবনযাপন ও দুপুরের খাবারের প্রসঙ্গ তুলে তাঁর প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর লাঞ্চের খরচ ১০০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে—এ বিষয়টি তাঁকে উৎসাহিত করে।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা উৎসাহিত হই যখন দেখি—মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর লাঞ্চের খরচ ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। আমার ভালো লাগে। এত কম টাকায় আমিও খাইতে পারি না। একদম প্লেইনলি বলতেছি।’
‘আসুন, খাওয়াব’
বিরোধীদলীয় নেতার এ মন্তব্যের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হাত দিয়ে ইশারা করে তাঁকে দুপুরের খাবারের আমন্ত্রণ জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আসুন, খাওয়াব।’
এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও মাইক ছাড়াই বিরোধীদলীয় নেতাকে খাওয়ানোর কথা বলেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর দিকে ইশারা করে বলেন, ‘আপনাকে খাওয়ানো হবে।’
জবাবে শফিকুর রহমান প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, তিনি একা খাবেন না। তাঁর ইচ্ছা, দেশের সব মানুষকে সঙ্গে নিয়ে খাওয়া।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘খাওয়ায় দেবেন? অনেক ধন্যবাদ। কিন্তু আমি তো একা খাব না। আমি তো ১৮ কোটি মানুষ নিয়ে খেতে চাই। আমি সবাইকে নিয়ে খেতে চাই। তারপরও ধন্যবাদ এই প্রস্তাবটি দেওয়ার জন্য।’
প্রধানমন্ত্রীর সাদামাটা জীবনযাপনের প্রশংসা
সংসদে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত জীবনযাপন নিয়েও প্রশংসা করেন বিরোধীদলীয় নেতা। তাঁর ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রী সাদামাটা জীবনযাপন করেন এবং সাধারণভাবে চলাফেরা করেন।
শফিকুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী ‘একেবারে পস, স্যুটেড-ব্যুটেড’ জীবনযাপন করেন না; বরং সাধারণভাবে চলেন। তাঁর মতে, একজন সরকারপ্রধানের এমন সাদামাটা জীবনযাপন মানুষের জন্য উৎসাহব্যঞ্জক হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘তিনি সাদামাঠা জীবন যাপন করেন, সুন্দর। একেবারে পস, স্যুটেড-ব্যুটেড নয়। প্লেইন পথে চলেন। এটা উৎসাহিত হওয়ার মতো বিষয়।’
অনুসারীদের আচরণ নিয়ে সমালোচনা
প্রধানমন্ত্রীর জীবনযাপনের প্রশংসা করলেও তাঁর অনুসারীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা করেন বিরোধীদলীয় নেতা। তাঁর মতে, কেউ যদি প্রধানমন্ত্রীকে নিজের ‘আইকন’ হিসেবে বিবেচনা করেন, তাহলে তাঁর জীবনযাপন ও মূল্যবোধ থেকেও অনুসরণ করার চেষ্টা করা উচিত।
শফিকুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর জীবনযাপন প্রশংসনীয় হলেও তাঁর অনুসারীদের কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে অনেক সময় এর বিপরীত চিত্র দেখা যায়।
তিনি বলেন, ‘কিন্তু তাঁর (প্রধানমন্ত্রী) জীবনযাপন নিয়ে অ্যাপ্রিসিয়েশন করতে দেখি, তারা আবার উল্টোপাল্টাও চলেন। তিনি যদি এসব মানুষের আইকন হয়ে থাকেন, তাহলে তো তাঁকে অনুসরণ করা উচিত। সকল ক্ষেত্রেই তাঁকে অনুসরণ করা উচিত। এটা তো আমরা দেখি না। আমরা ঠিক তার বিপরীতটা দেখি।’
‘আইকন বললে তাঁকে ফলো করতে হবে’
বিরোধীদলীয় নেতা আরও বলেন, কাউকে আইকন হিসেবে অভিহিত করার আগে তাঁর জীবনযাপন ও কর্মকাণ্ড অনুসরণের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা উচিত। তাঁর মতে, শুধু রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য কাউকে আইকন বলা যথেষ্ট নয়; বরং তাঁর ভালো দিকগুলো অনুসরণ করার মানসিকতাও থাকতে হবে।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা আশা করি, এখন থেকে আইকন বলার আগে সাবধান হয়ে বলবেন। আর আইকন বললে তাঁকে ফলো করতে হবে।’
তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীও একজন মানুষ এবং তিনি ভুলের ঊর্ধ্বে নন। তাই তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্ত বা বক্তব্যের সঙ্গে অন্ধভাবে একমত হওয়ার প্রয়োজন নেই।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীও মানুষ। তিনি ভুলের ঊর্ধ্বে নন। তাঁর সবকিছুতে হ্যাঁ বলা যাবে না।’
জ্বালানি ও গ্যাস–সংকট নিয়ে সংসদে আলোচনা
প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার এ কথোপকথন হয় জাতীয় সংসদে জ্বালানি ও গ্যাস–সংকট নিয়ে সাধারণ আলোচনার মধ্যে। আলোচনার বিষয় ছিল তীব্র জ্বালানি ও গ্যাস–সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে বেকারত্ব সৃষ্টি এবং এর ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে সম্ভাব্য মারাত্মক বিপর্যয় ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।
আলোচনার এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত জীবনযাপন ও স্বল্পমূল্যের দুপুরের খাবারের প্রসঙ্গ ওঠে। সেখান থেকেই বিরোধীদলীয় নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে সংক্ষিপ্ত এই কথোপকথন হয়।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে শফিকুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে অনুসরণ করার ক্ষেত্রে অন্ধ সমর্থনের পরিবর্তে তাঁর ভালো দিকগুলো অনুসরণ করা উচিত। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, প্রধানমন্ত্রীর সব সিদ্ধান্তকে প্রশ্নহীনভাবে সমর্থন না করে প্রয়োজন অনুযায়ী গঠনমূলক সমালোচনাও থাকা দরকার।