চীনে গত মাসে অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড হিউম্যানয়েড রোবট গেমস’-এ মানুষের মতো দেখতে রোবটগুলোকে দেখা গেছে লাফাতে, বক্সিং করতে, নাচতে এমনকি দ্রুতগতিতে দৌড়াতেও। কিছু রোবট ১০০ মিটার দৌড়ে এমন গতি তুলেছে, যা কিংবদন্তি স্প্রিন্টার উসাইন বোল্টের সঙ্গে তুলনা করার মতো। দর্শকদের জন্য এসব ছিল বিনোদনের নতুন অভিজ্ঞতা। রোবটের সাফল্যের পাশাপাশি হোঁচট খাওয়া বা পড়ে যাওয়ার দৃশ্যও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিম ও হাস্যরসের উপকরণ হয়েছে।
কিন্তু এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা যে শুধু বিনোদন বা শিল্পক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়, সেই ইঙ্গিত মিলেছে ওই আয়োজনের মাত্র দুই দিন পরই। চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) সরকারি সংবাদপত্র ‘পিএলএ ডেইলি’ গবেষকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, গবেষণাগারে তৈরি অত্যাধুনিক প্রযুক্তিকে দ্রুত সামরিক প্রশিক্ষণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিয়ে আসতে। দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হিসেবে রোবটকে ‘যোদ্ধা’ হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনাও সেখানে উঠে এসেছে।
রয়টার্স চীনের সামরিক বাহিনীর শতাধিক ক্রয়সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি, গবেষণাপত্র, পেটেন্ট, সরকারি নথি, প্রকাশনা এবং প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন তথ্য পর্যালোচনা করে দেখেছে, সামরিক কাজে হিউম্যানয়েড রোবট ব্যবহারের বিষয়ে চীনের গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা গত দুই বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তবে এখনো চীনের কোনো সক্রিয় সামরিক ইউনিটে অস্ত্রধারী হিউম্যানয়েড রোবট মোতায়েন করা হয়েছে—এমন প্রমাণ পায়নি রয়টার্স। প্রযুক্তিটি এখনো নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে রয়েছে। রোবট চালাতে বিপুল শক্তি প্রয়োজন, আর নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের বাইরে বাস্তব পরিস্থিতিতে এগুলোর নির্ভরযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে।
তারপরও সামরিক গবেষণায় হিউম্যানয়েড রোবটের প্রবেশ বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের প্রযুক্তি কীভাবে বদলে যাচ্ছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিচ্ছে।
চীনের রোবটশিল্পই পিএলএর বড় শক্তি
সামরিক খাতে হিউম্যানয়েড রোবট নিয়ে চীনের আগ্রহের পেছনে দেশটির দ্রুত বিকাশমান বেসামরিক রোবটশিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ব্যাংক অব আমেরিকা (বিওএ) গ্লোবাল রিসার্চের হিসাবে, ২০২৫ সালে বিশ্বে সরবরাহ করা হিউম্যানয়েড রোবটের প্রায় ৯৫ শতাংশই তৈরি করেছে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সামরিক বাহিনীকে নতুন প্রযুক্তি তৈরি করতে একেবারে শূন্য থেকে শুরু করতে হচ্ছে না। বরং বেসামরিক শিল্পে তৈরি প্রযুক্তি, যন্ত্রাংশ, সফটওয়্যার ও দক্ষতাকে সামরিক প্রয়োজনে ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
রয়টার্সের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চীনা সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে হিউম্যানয়েড রোবট কীভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে, তা বোঝার জন্য পরীক্ষা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে রোবট এবং সেগুলোকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি কেনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হচ্ছে সেনাসদস্যদের সঙ্গে রোবটের সমন্বয়। অর্থাৎ ভবিষ্যতে রোবটকে মানুষের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং মানুষের সঙ্গে একই সামরিক ইউনিটে কাজ করতে সক্ষম একটি ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।
২০২৫ ও ২০২৬ সালে এসব গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে রোবটের চারপাশের পরিবেশ বুঝতে পারা, বিভিন্ন বস্তু ধরা ও নাড়াচাড়া করা এবং রোবটকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের সক্ষমতা।
যুদ্ধক্ষেত্রে রোবটের প্রয়োজন কেন?
সামরিক বাহিনীর কাছে রোবটের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো—এগুলোকে এমন জায়গায় পাঠানো সম্ভব হতে পারে, যেখানে মানুষকে পাঠানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের যন্ত্র ও মহাকাশ প্রকৌশলের অধ্যাপক ডেনিস হং বলেন, মানুষকে যেখানে পাঠাতে চাওয়া হয় না, সেখানে রোবট পাঠানো যেতে পারে। তাঁর মতে, একটি রোবট হারানোর বিনিময়ে যদি একজন মানুষের জীবন বাঁচানো যায়, তাহলে প্রয়োজনে রোবটকে বিসর্জন দেওয়া সম্ভব।
এই ধারণাই সামরিক রোবট গবেষণার অন্যতম ভিত্তি। যুদ্ধক্ষেত্রে নজরদারি, বিপজ্জনক এলাকায় প্রবেশ, বিস্ফোরক বা বিপজ্জনক পদার্থ মোকাবিলা, রসদ বহন কিংবা আহতদের উদ্ধারের মতো কাজে রোবট ব্যবহার করা গেলে সেনাসদস্যদের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ইতিমধ্যে দেখিয়েছে, আধা-স্বয়ংক্রিয় ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ব্যবস্থা কীভাবে যুদ্ধের ধরন বদলে দিতে পারে। সেখানে এআই-নির্ভর ড্রোন পথ নির্ধারণ, লক্ষ্য শনাক্তকরণ ও নজরদারিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। রোবট ব্যবহার করে রসদ পরিবহন ও হতাহতদের উদ্ধারের ঘটনাও দেখা গেছে।
চীনের সামরিক বাহিনী এই যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করছে—এমন তথ্য আগেও রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
শহুরে যুদ্ধে রোবটের নতুন পরিকল্পনা
চীনের সামরিক গবেষণায় হিউম্যানয়েড রোবটের সম্ভাব্য ব্যবহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে উঠে এসেছে শহুরে যুদ্ধ।
ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব ডিফেন্স টেকনোলজি (এনইউডিটি)–এর গবেষকেরা এমন একটি ভবিষ্যৎ যুদ্ধপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করেছেন, যেখানে ছয়টি যুদ্ধরোবটকে দুটি আক্রমণকারী দলে ভাগ করা হবে। এসব দলে হিউম্যানয়েড রোবটের পাশাপাশি রোবট-কুকুর ও চালকবিহীন যানও থাকবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব রোবট স্থলসেনাদের সঙ্গে সমন্বয় করে শত্রুর নিয়ন্ত্রণে থাকা ভবনে প্রবেশ, তল্লাশি ও ভবনটি শত্রুমুক্ত করার কাজে অংশ নিতে পারে। এক তলা থেকে অন্য তলা কিংবা এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে যাওয়ার মতো জটিল পরিবেশেও তাদের ব্যবহারের কথা বিবেচনা করা হচ্ছে।
২০২৫ সালের আগস্টে এনইউডিটির শিয়ান পরীক্ষাকেন্দ্রের গবেষকেরা প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে এমন একটি শহুরে আক্রমণকারী বাহিনীর মডেল তুলে ধরেন। গবেষকেরা ধরে নিয়েছেন, এ ধরনের প্রযুক্তি আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছরের মধ্যে বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
তবে গবেষণাপত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট নয়। রোবট কখন ও কীভাবে শক্তি প্রয়োগ করবে, কী ধরনের অস্ত্র বহন করবে কিংবা বেসামরিক মানুষের মুখোমুখি হলে কীভাবে আচরণ করবে—এসব প্রশ্নের উত্তর সেখানে দেওয়া হয়নি।
ভবন, সুড়ঙ্গ কিংবা জাহাজের ভেতরে ব্যবহারের সম্ভাবনা
তাইওয়ানের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি রিসার্চের গবেষক জুও-মিন চৌ মনে করেন, হিউম্যানয়েড রোবটের ভারসাম্য, পরিবেশ বোঝার ক্ষমতা এবং দীর্ঘ সময় কাজ করার সক্ষমতা উন্নত হলে এগুলো ভবন, সুড়ঙ্গ কিংবা জাহাজের ভেতরের মতো জটিল স্থানে ব্যবহার করা যেতে পারে।
হিউম্যানয়েড রোবটের দুটি হাত ও দুটি পা থাকার কারণে তাত্ত্বিকভাবে মানুষের মতো করে হাঁটা, সিঁড়ি বা অন্য কোনো স্থানে ওঠা এবং বিভিন্ন বস্তু ধরা বা সরানোর মতো কাজ করা সম্ভব।
তবে সব ধরনের সামরিক কাজে হিউম্যানয়েড রোবটই সবচেয়ে কার্যকর—এমন নয়। নজরদারি কিংবা রসদ পরিবহনের মতো তুলনামূলক সহজ কাজে চার পা, ট্র্যাক বা চাকার ওপর চলা রোবট অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও সহজ হতে পারে।
এ ধরনের রোবটের নকশা তুলনামূলক সরল হওয়ায় বড় পরিসরে উৎপাদন ও মোতায়েনও সহজ। ফলে হিউম্যানয়েড রোবটের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি দেখা দিতে পারে এমন জায়গায়, যেখানে মানুষের মতো শরীরের কাঠামোই বিশেষ সুবিধা দেয়।
সহায়তা থেকে সরাসরি যুদ্ধে?
চীনের সামরিক বাহিনীর প্রকাশিত বিভিন্ন ভাষ্য থেকে বোঝা যায়, হিউম্যানয়েড রোবটের সম্ভাব্য ভূমিকা শুধু রসদ বহন বা নজরদারিতে সীমাবদ্ধ রাখার চিন্তা নেই।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে ‘পিএলএ ডেইলি’–তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, হিউম্যানয়েড রোবটের ভূমিকা ভবিষ্যতে যুদ্ধক্ষেত্রে সহায়তাকারী প্রযুক্তি থেকে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণের পর্যায়ে যেতে পারে।
সেখানে এমন একটি সম্ভাবনাও আলোচনা করা হয়, যেখানে একজন মানুষ কোনো ব্যক্তিকে বৈধ লক্ষ্য হিসেবে শনাক্ত করার পর রোবটকে তার ওপর গুলি চালানোর অনুমতি দিতে পারে।
এটি সামরিক রোবট ব্যবহারের সবচেয়ে বিতর্কিত সম্ভাবনাগুলোর একটি। কারণ, অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত যদি কোনো পর্যায়ে মানুষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে লক্ষ্য শনাক্তকরণ, বেসামরিক মানুষ ও যোদ্ধাকে আলাদা করা এবং আত্মসমর্পণকারী বা আহত ব্যক্তিকে শনাক্ত করার মতো জটিল পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেওয়া হবে—সেটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
তাইওয়ান ঘিরে ভবিষ্যৎ সংঘাতের কল্পচিত্র
চীনের সামরিক বাহিনী ভবিষ্যৎ সংঘাতে রোবটের ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে প্রকাশ্যেও কিছু চিত্র তুলে ধরেছে।
গত ডিসেম্বরে পিএলএর ইস্টার্ন থিয়েটার কমান্ড কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি একটি ভিডিও প্রকাশ করে। সেখানে একটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ সংঘাতের দৃশ্য দেখানো হয়, যেখানে রোবটকে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে দেখা যায়।
এ ধরনের ভিডিওকে বাস্তব সামরিক পরিকল্পনার সরাসরি প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে এটি চীনা সামরিক চিন্তায় রোবট ও এআইয়ের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তার একটি প্রকাশ্য উদাহরণ।
শত্রুপক্ষের এলাকায় অনুপ্রবেশের মহড়া
সামরিক কাজে হিউম্যানয়েড রোবট নিয়ে চীনের আগ্রহ বিশেষভাবে বাড়তে শুরু করে ২০২৪ সাল থেকে।
ওই বছর এনইউডিটি ও চীনের একাডেমি অব মিলিটারি সায়েন্সেস একটি প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিবিষয়ক ফোরামের আয়োজন করে। সেখানে হিউম্যানয়েড রোবটের সামরিক ব্যবহার নিয়ে আলাদা অধিবেশন রাখা হয়।
২০২৫ সালে এনইউডিটি হিউম্যানয়েড রোবটকে আরও স্পষ্টভাবে যুদ্ধক্ষেত্রের সম্ভাব্য সরঞ্জাম হিসেবে উপস্থাপন করে। ওই বছরের জুনে একটি প্রতিযোগিতায় রোবটকে শত্রুপক্ষের এলাকায় অনুপ্রবেশ, ওই এলাকার মানচিত্র তৈরি এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্য খুঁজে বের করার কাজ দেওয়া হয়।
আরেকটি মহড়ায় সামরিক ঘাঁটিতে পরিচয় যাচাই, শৃঙ্খলা পর্যবেক্ষণ এবং নিরাপত্তা টহলের কাজেও রোবট ব্যবহার করা হয়।
সামরিক বিশ্ববিদ্যালয়টি ওই প্রতিযোগিতাকে হিউম্যানয়েড রোবটকে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে যাওয়ার পথে কার্যকারিতা যাচাইয়ের একটি পরীক্ষাক্ষেত্র হিসেবে বর্ণনা করে।
রোবট কিনতেও এগোচ্ছে পিএলএ
গবেষণা ও মহড়ার পাশাপাশি চীনের সামরিক বাহিনীর ক্রয়সংক্রান্ত নথিতেও হিউম্যানয়েড রোবটের প্রতি আগ্রহের প্রমাণ মিলেছে।
২০২৫ সালের মে মাসে পিএলএ হিউম্যানয়েড রোবট কেনা, সেগুলো স্থাপন এবং প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের জন্য একটি দরপত্র আহ্বান করে। চার মাস পর আরেকটি ক্রয় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। ওই বিজ্ঞপ্তিতে যোগাযোগের ঠিকানা হিসেবে এনইউডিটির একটি ই-মেইল ব্যবহার করা হয়েছিল।
সেখানে এমন একটি ব্যবস্থা চাওয়া হয়, যার মাধ্যমে হিউম্যানয়েড রোবট আশপাশের পরিবেশ বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বুঝতে এবং বিভিন্ন কাজ নির্ভুলভাবে সম্পন্ন করতে পারে।
তবে এসব দরপত্রের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত কেনাকাটা সম্পন্ন হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত করতে পারেনি রয়টার্স। কোনো প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়ে থাকলে সেটি কোন প্রতিষ্ঠান এবং কী ধরনের রোবট সরবরাহ করা হয়েছিল, সে তথ্যও প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
আরেকটি সামরিক ক্রয়সংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, চলতি বছরের জুনে পিএলএ হিউম্যানয়েড রোবটের ক্যামেরা, রাডার এবং চলাচলসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের একটি ব্যবস্থা তৈরিতে প্রায় ৩ লাখ ডলার বরাদ্দ করে। কোন ধরনের ভূখণ্ডে রোবট চলতে পারবে, সে তথ্য সংগ্রহের বিষয়টিও এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এসব উদ্যোগ থেকে বোঝা যায়, চীনের সামরিক গবেষণা শুধু রোবটের শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। রোবট যাতে বাস্তব পরিবেশ বুঝতে পারে, বিভিন্ন বস্তু ব্যবহার করতে পারে এবং সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে প্রশিক্ষিত হতে পারে—সেই প্রযুক্তিও তৈরি করা হচ্ছে।
দূর থেকে নিয়ন্ত্রণই আপাতত বড় সমাধান
২০২৬ সালে এসে হিউম্যানয়েড রোবটের সামরিক সম্ভাবনা চীনের প্রতিরক্ষা শিল্পেও ছড়িয়ে পড়েছে।
চীনের নরিনকোর তৈরি ‘ফুসি’ একটি পূর্ণ আকারের হিউম্যানয়েড রোবট। এটিকে প্রহরা, সব ধরনের আবহাওয়ায় নজরদারি, বুদ্ধিমান টহল এবং বিপজ্জনক কাজে ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হচ্ছে।
ফুসিকে দূরনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা যায়। ফলে একজন মানুষ দূর থেকে রোবটটি পরিচালনা করতে পারেন। এর ফলে রোবটকে নিজে থেকে প্রতিটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হয় না।
স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাই হিউম্যানয়েড রোবটের অন্যতম বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ। নরিনকো এ বিষয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের জবাব দেয়নি।
অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ম্যালকম ডেভিসের মতে, হিউম্যানয়েড রোবট এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত নয়। তবে আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছরের মধ্যে পরিস্থিতি বদলাতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
যুদ্ধক্ষেত্রে বড় নৈতিক প্রশ্ন
রোবটের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো—কোন পর্যায়ে মানুষ রোবটের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে?
ভবিষ্যতে যদি দূর থেকে নিয়ন্ত্রিত রোবটের বদলে সম্পূর্ণ বা আংশিক স্বয়ংক্রিয় রোবট তৈরি হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও যুদ্ধের নীতিমালা নিয়ে জটিলতা আরও বাড়তে পারে।
যুদ্ধের আইন অনুযায়ী, যোদ্ধা ও বেসামরিক মানুষকে আলাদা করে শনাক্ত করতে হয়। আহত কিংবা আত্মসমর্পণকারী যোদ্ধাদের ওপরও হামলা করা যায় না।
আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটি সতর্ক করেছে, স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রব্যবস্থার জন্য আত্মসমর্পণের মতো জটিল পরিস্থিতি বোঝা কঠিন হতে পারে। কারণ এ ধরনের সিদ্ধান্তের জন্য শুধু কোনো বস্তু বা ব্যক্তিকে শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়; পরিস্থিতি, আচরণ ও উদ্দেশ্যও বুঝতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর নিয়মেও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবহারের আগে আইনি পর্যালোচনা ও বাস্তব পরিবেশে পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। অস্ত্র ব্যবহারের সময়ও কমান্ডার ও পরিচালনাকারীদের যথাযথ সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব থাকে।
চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও গত মার্চে বলেছিল, এআইচালিত অস্ত্রের ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত।
যুক্তরাষ্ট্রও পিছিয়ে নেই
হিউম্যানয়েড রোবটের সামরিক ব্যবহার নিয়ে গবেষণায় চীন একা নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীও ভবিষ্যতে সেনাসদস্যদের সঙ্গে কাজ করতে সক্ষম হিউম্যানয়েড রোবট তৈরির লক্ষ্যে একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিবেচনায় এসব রোবটের সম্ভাব্য ব্যবহারের মধ্যে রয়েছে নজরদারি, নিরাপত্তা, বাধা অপসারণ, বিপজ্জনক পদার্থ মোকাবিলা এবং শহুরে এলাকায় আক্রমণ ও প্রতিরক্ষামূলক অভিযান।
এ বছর সর্বোচ্চ ১০টি চূড়ান্ত পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান মার্কিন সামরিক বিশেষজ্ঞদের সামনে তাদের প্রযুক্তি পরীক্ষা করবে। এরপর নির্বাচিত প্রযুক্তির উন্নয়নে সর্বোচ্চ ১২ লাখ ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত অর্থ দেওয়া হতে পারে।
তবে দুই ও চার পায়ের রোবট তৈরিতে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প চীনের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
চীনের ইউনিট্রি বিশ্বের শীর্ষ রোবট নির্মাতাদের একটি। প্রতিষ্ঠানটির জনপ্রিয় রোবট-কুকুরের নকশায় এমন প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা জানা গেছে, যার গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী অর্থায়ন করেছিল।
সবচেয়ে বড় বাধা এখনো প্রযুক্তি
হিউম্যানয়েড রোবট নিয়ে যতই আলোচনা হোক, বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে এগুলোকে বড় পরিসরে ব্যবহার করার আগে বেশ কিছু মৌলিক সমস্যার সমাধান করতে হবে।
প্রথমত, এসব রোবট পরিচালনায় প্রচুর শক্তি প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষাগারের বাইরে যুদ্ধক্ষেত্রের অনিশ্চিত পরিবেশ সামাল দেওয়া কঠিন। ধ্বংসস্তূপ, কাদা, ধোঁয়া, পানি, অন্ধকার, অসমতল ভূমি এবং হঠাৎ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মানুষের মতো দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এখনো রোবটের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটির যন্ত্র প্রকৌশলের অধ্যাপক অ্যারন জনসন বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে অসংখ্য অনিশ্চিত পরিস্থিতি তৈরি হয়, যা রোবটের সক্ষমতার জন্য বড় পরীক্ষা।
অন্যদিকে, রোবটকে ব্যাপকভাবে সামরিক বাহিনীতে ব্যবহার করতে হলে উৎপাদন খরচ কমাতে হবে এবং বিপুল সংখ্যায় রোবট তৈরির সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
চায়না একাডেমি অব মিলিটারি সায়েন্সেসের গবেষক ওয়াং ইয়ংহুয়াও স্বীকার করেছেন, হিউম্যানয়েড রোবট এখনো ঠিকভাবে চলাফেরা করতে, আশপাশ বুঝতে কিংবা পরিস্থিতি অনুযায়ী বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কাজ করতে পারে না। এসব সমস্যার সমাধান এখনো হয়নি।
তাঁর মতে, প্রযুক্তিগত বাধা দূর করার পাশাপাশি উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো ও ব্যয় কমানো সম্ভব হলে পরিস্থিতি বদলাতে পারে। তখন হিউম্যানয়েড রোবট যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে নামার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
ভবিষ্যতের যুদ্ধ কি সত্যিই বদলে যাবে?
চীনের সামরিক গবেষণা এখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি যে আগামীকালই হিউম্যানয়েড রোবটকে যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাসদস্যের পাশাপাশি ব্যাপকভাবে দেখা যাবে। বরং বর্তমানে চীনের কাজের বড় অংশই গবেষণা, মহড়া, প্রযুক্তি পরীক্ষা, সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং সম্ভাব্য ব্যবহারের মডেল তৈরির পর্যায়ে রয়েছে।
তারপরও প্রবণতাটি গুরুত্বপূর্ণ। বেসামরিক রোবটশিল্পে চীনের দ্রুত অগ্রগতি সামরিক গবেষণাকে প্রযুক্তিগত ভিত্তি দিচ্ছে। একই সঙ্গে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মতো সংঘাতগুলো সামরিক বাহিনীকে স্বয়ংক্রিয় ও দূরনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার কার্যকারিতা সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা দিচ্ছে।
চীনের পরিকল্পনায় তাই রোবটের ভূমিকা ধীরে ধীরে বদলানোর ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে—নজরদারি ও রসদ বহন থেকে শুরু করে বিপজ্জনক এলাকায় প্রবেশ, সেনাসদস্যদের সঙ্গে সমন্বয় এবং ভবিষ্যতে সরাসরি যুদ্ধের সম্ভাবনা পর্যন্ত।
তবে সেই ভবিষ্যৎ বাস্তবে আসতে হলে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি আরও বড় প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে—যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেবে কে, মানুষের নিয়ন্ত্রণ কতটা থাকবে এবং একটি স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র কীভাবে যুদ্ধের আইন মেনে চলবে।
চীনা সামরিক গবেষক ওয়াং ইয়ংহুয়ার ভাষায়, প্রযুক্তিগত ও উৎপাদনগত সমস্যাগুলো সমাধান করা গেলে হিউম্যানয়েড রোবট একসময় ‘যুদ্ধক্ষেত্রে দলে দলে নামতে’ পারে। সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হবে কি না, তা এখনো ভবিষ্যতের প্রশ্ন। কিন্তু নাচের মঞ্চে রোবটের প্রদর্শনী থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের সম্ভাব্য উপস্থিতি—এই যাত্রা যে ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে, চীনের সামরিক গবেষণা তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।