ঢাকা

সৌদির আরামকোসহ একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা, হুতি গণমাধ্যমের দাবি

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও লক্ষ্যবস্তুতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা। হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল কোম্পানি আরামকোর বিভিন্ন স্থাপনা, আবহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং কিং খালিদ বিমানঘাঁটি রয়েছে বলে জানিয়েছে হুতিদের গণমাধ্যম আনসারুল্লাহ।

মঙ্গলবার টেলিগ্রামে দেওয়া পৃথক পোস্টে এসব হামলার তথ্য জানায় আনসারুল্লাহ। এর মধ্য দিয়ে সৌদি আরবে সাম্প্রতিক হামলার দায়ও স্বীকার করেছে হুতিদের এই গণমাধ্যম।

আনসারুল্লাহর এক পোস্টে বলা হয়, ইয়েমেনি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ‘শত্রুদেশ’ সৌদি আরবের ওপর ব্যাপক হামলা চালানো হয়েছে। অপর একটি পোস্টে হামলার নির্দিষ্ট কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুর নাম উল্লেখ করা হয়।

যেসব স্থাপনায় হামলার দাবি

হুতিদের গণমাধ্যমের দাবি অনুযায়ী, সৌদি আরবের আবহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং কিং খালিদ বিমানঘাঁটিও হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল।

এ ছাড়া আবহা ও জিজান এলাকায় সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল কোম্পানি আরামকোর বিভিন্ন স্থাপনায়ও হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে আনসারুল্লাহ।

তবে হামলায় এসব স্থাপনার কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, কতগুলো ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে কিংবা সৌদি কর্তৃপক্ষ হামলাগুলো প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে হুতিদের বিবৃতিতে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।

হামলার বিষয়ে সৌদি আরবের পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়ার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

জিজানে আরামকোর স্থাপনায় ফের হামলা

সৌদি আরবের জিজান শহরে অবস্থিত আরামকোর তেল স্থাপনায় নতুন করে হামলার খবর এর আগে সোমবার প্রকাশ করেছিল ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, জিজানে আরামকোর তেল স্থাপনায় আবারও হামলা হয়েছে।

এর আগের মাসেও একই স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটেছিল। ওই হামলার কারণে সেখানে তেল উৎপাদন কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল।

সৌদিতে সর্বশেষ হামলার পর সোমবার পর্যন্ত কোনো পক্ষ প্রকাশ্যে এর দায় স্বীকার করেনি। তবে মঙ্গলবার হুতিদের গণমাধ্যম আনসারুল্লাহ হামলার দায় নেওয়ার কথা জানায়।

ফলে জিজানে আরামকোর স্থাপনায় সাম্প্রতিক হামলার সঙ্গে হুতিদের ঘোষিত হামলার সম্পর্ক রয়েছে কি না, সে বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।

ইয়েমেন সীমান্তের কাছে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পনগরী জিজান

জিজান সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পনগরী। এটি ইয়েমেন সীমান্তের সবচেয়ে কাছের সৌদি শিল্পাঞ্চলগুলোর একটি হওয়ায় অতীতেও হুতিদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।

ইয়েমেনে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তাঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে জিজানের মতো সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সৌদি আরবের সামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামো বিভিন্ন সময়ে হুতিদের হামলার মুখে পড়েছে।

সাম্প্রতিক হামলার দাবি সেই পুরোনো সংঘাতকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে আরামকোর তেল স্থাপনায় হামলার দাবি সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।

জুলাই থেকে সৌদি–হুতি উত্তেজনা

হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সাম্প্রতিক উত্তেজনার পেছনে রয়েছে লোহিত সাগরের বন্দরগুলোকে ঘিরে নতুন বিরোধ। ইরান-সমর্থিত হুতিরা গত জুলাইয়ে সৌদি আরবের লোহিত সাগরের বন্দরগুলো অবরোধের ঘোষণা দেয়।

এর পর সৌদি আরবের সঙ্গে গোষ্ঠীটির আবারও সংঘাত তৈরি হয়। পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে সৌদি আরবের তেল অবকাঠামো লক্ষ্য করে একাধিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সৌদি আরবের জন্য তেল অবকাঠামো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির অর্থনীতি ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় আরামকোর স্থাপনাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলে এসব স্থাপনায় হামলা হলে তা শুধু স্থানীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতিই নয়, জ্বালানি বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে।

২০১৫ সালে ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদি হস্তক্ষেপ

সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সংঘাতের শিকড় ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত। ২০১৫ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে সৌদি আরব। দেশটি হুতিদের বিরুদ্ধে গঠিত আরব জোটের নেতৃত্ব দেয়।

ইয়েমেনের রাজধানী সানা ও দেশটির বিস্তীর্ণ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে চলে যাওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট।

এরপর কয়েক বছর ধরে ইয়েমেনে ভয়াবহ সংঘাত চলতে থাকে। এই সংঘাতের এক পর্যায়ে হুতিরা সৌদি আরবের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। পাল্টা সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটও ইয়েমেনে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়।

২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর বড় লড়াই বন্ধ ছিল

তবে দীর্ঘ সংঘাতের পর ২০২২ সালের এপ্রিলে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এর পর থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে বড় ধরনের সরাসরি লড়াই হয়নি।

এই সময়ের মধ্যে ইয়েমেন যুদ্ধের রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগও হয়েছে। ফলে কয়েক বছর ধরে তুলনামূলকভাবে বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনা এড়িয়ে চলা সম্ভব হয়েছিল।

কিন্তু গত জুলাইয়ে লোহিত সাগরের সৌদি বন্দরগুলো অবরোধের হুতিদের ঘোষণার পর পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এর পর সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে একাধিক হামলার খবর পাওয়া যায়।

নতুন করে বাড়ছে সংঘাতের আশঙ্কা

সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ধারাবাহিক হামলার দাবি এবং হুতিদের পক্ষ থেকে এসব হামলার দায় স্বীকারের ঘটনায় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাত আবারও বড় আকার নিতে পারে কি না, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।

বিশেষ করে আরামকোর মতো গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামো হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়ায় পরিস্থিতি আঞ্চলিক নিরাপত্তার পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তবে সর্বশেষ হামলার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি, সৌদি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া এবং হামলার পর দেশটির পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। এসব বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পরিস্থিতির পূর্ণ চিত্র বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ হবে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স