ঢাকা

সংসদীয় কমিটিতে গাজী নজরুল, তাঁকে রাখা নিয়ে সংসদে বিতর্ক

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কৃত সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে সংসদীয় কমিটিতে রাখা নিয়ে জাতীয় সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে বিতর্ক হয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের আপত্তি ও আলোচনার পর শেষ পর্যন্ত সরকারি প্রতিশ্রুতি কমিটি থেকে গাজী নজরুল ইসলামের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।

সোমবার জাতীয় সংসদে সরকারি প্রতিশ্রুতি কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটে।

গাজী নজরুল ইসলামকে সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তের’ একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর গত ২২ জুলাই দলটি তাঁকে বহিষ্কার করে। একই সঙ্গে বিষয়টি স্পিকার ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করে চিঠি দেয় জামায়াতে ইসলামী। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে স্পিকার কোনো সিদ্ধান্ত দেননি। ফলে গাজী নজরুল ইসলাম এখনো সংসদ সদস্য হিসেবে বহাল আছেন।

সরকারি প্রতিশ্রুতি কমিটিতে নাম থাকা নিয়ে প্রশ্ন

সোমবার সংসদে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি সরকারি প্রতিশ্রুতি কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন। পরে প্রস্তাবটি পাস হয়। ওই কমিটির সদস্যদের তালিকায় গাজী নজরুল ইসলামের নামও ছিল।

কমিটি গঠন অনুমোদিত হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তিনি জানতে চান, গাজী নজরুল ইসলাম বিরোধী দলের কোটা থেকে ওই কমিটির সদস্য হয়েছেন কি না।

জবাবে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, সংসদে বর্তমানে ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন এবং প্রত্যেক সদস্যই অন্তত একটি সংসদীয় কমিটিতে থাকার সুযোগ পেতে পারেন। তবে গাজী নজরুল ইসলামকে বিরোধী দলের কোটা থেকে ওই কমিটিতে নেওয়া হয়নি বলে তিনি স্পষ্ট করেন।

এর পর বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, গাজী নজরুল ইসলাম যদি বিরোধী দলের কোটা থেকে কমিটির সদস্য না হয়ে থাকেন, তাহলে এ বিষয়ে তাঁদের আপত্তি নেই।

‘যতক্ষণ সদস্য পদ না যায়, ততক্ষণ কমিটিতে রাখব’

এ সময় গাজী নজরুল ইসলামকে কমিটিতে রাখার যুক্তি ব্যাখ্যা করেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। তিনি বলেন, সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁর পদ বহাল থাকায় তাঁকে কোনো না কোনো সংসদীয় কমিটিতে রাখার সুযোগ রয়েছে।

চিফ হুইপ বলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত ওনার সদস্য পদ না যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি সব সদস্যকে রাখব (কমিটিতে)। আমি সবার পক্ষে কথা বলব। সে হিসেবে উনি (নজরুল) বিরোধী দলেরও না, সরকারি দলেরও না।’

তিনি জানান, এর আগে দুটি সংসদীয় কমিটিতেও গাজী নজরুল ইসলামকে রাখা হয়েছিল। তবে বিরোধী দলের অনুরোধে পরে তাঁকে ওই কমিটিগুলো থেকে বাদ দেওয়া হয়।

চিফ হুইপের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি চান সংসদের সব সদস্যই কোনো না কোনোভাবে সংসদীয় কার্যক্রমে অবদান রাখার সুযোগ পান। সরকারি প্রতিশ্রুতি কমিটির কার্যক্রমও তুলনামূলক সীমিত বলে উল্লেখ করেন তিনি। এ কমিটি বছরে এক-দুবার কিংবা পুরো পাঁচ বছরে এক-দুবার বৈঠক করতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

তাঁর যুক্তি ছিল, সংসদ সদস্য পদ বাতিল না হওয়া পর্যন্ত গাজী নজরুল ইসলামকে কোনো একটি কমিটিতে রাখা যেতে পারে।

ডেপুটি স্পিকারের ব্যাখ্যা

এ পর্যায়ে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালও বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য দেন। তিনি চিফ হুইপের উদ্দেশে বলেন, গাজী নজরুল ইসলাম আগে একাধিক স্থায়ী কমিটিতে ছিলেন। বিরোধী দলের অনুরোধের পর তাঁকে সেসব কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।

এবার তাঁকে আবার একটি কমিটিতে রাখায় বিরোধী দলের পক্ষ থেকে প্রশ্ন উঠেছে বলে জানান ডেপুটি স্পিকার।

এর পর চিফ হুইপ আবারও বলেন, সংসদ সদস্য হিসেবে গাজী নজরুল ইসলামের পদ বহাল থাকায় তাঁকে সংসদের কোনো না কোনো কমিটিতে রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘বিনা পয়সায় বুদ্ধি’

বিতর্কের এক পর্যায়ে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, গাজী নজরুল ইসলাম বিরোধী দলের তালিকায় ছিলেন না। এ কারণে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলোতে তাঁকে রাখা হয়নি। তবে সংসদের অন্য কোনো কমিটিতে সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করার সময় তাঁকে ‘অ্যাকোমোডেট’ করতে গিয়ে সরকারি প্রতিশ্রুতি কমিটিতে রাখা হয়েছে বলে তিনি জানান।

গাজী নজরুল ইসলামকে জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কারের পর দলটি স্পিকার ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে চিঠি দেওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, কোনো রাজনৈতিক দল কাউকে বহিষ্কার করলেই সংবিধান অনুযায়ী তাঁর সংসদ সদস্য পদ শূন্য হয়ে যায় না। একইভাবে, নিজে থেকে পদত্যাগ না করলে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বিষয়ও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এরপর বিরোধী দলকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, তাঁরা যদি গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ শূন্য করতে চান, তাহলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে তাঁর ভোট দেওয়া বা ভোটদানে বিরত থাকার বিষয়টি সামনে আনতে পারেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা যদি সত্যি সত্যিই চান তাঁর (গাজী নজরুল) আসনটি শূন্য হোক, তাহলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলের পক্ষে ভোট দেয় নাই আপনাদের এবং ভোটদানে বিরত ছিলেন। সেই জায়গায় ৭০ অনুচ্ছেদ কিন্তু আসে।’

তিনি আরও বলেন, এ বিষয়টি আমলে নিয়ে বিরোধী দল স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বা নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিলে সাংবিধানিক ও বিধিগত প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করা যেতে পারে। এ বক্তব্যকে তিনি রসিকতা করে ‘বিনা পয়সায়’ দেওয়া বুদ্ধি হিসেবে উল্লেখ করেন।

বিরোধীদলীয় নেতার পাল্টা জবাব

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানও রসিকতা করেন। তিনি বলেন, গ্রামে একটি কথা প্রচলিত আছে—কোনো দুর্বল ব্যক্তির ওপর প্রতিশোধ নিতে হলে তাঁকে ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য পদে নির্বাচন করিয়ে দেওয়া হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাঝেমধ্যে এ ধরনের ‘টিপস’ দেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এরপর গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ নিয়ে বিরোধী দলের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন শফিকুর রহমান।

তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে। ফলে তাঁকে নিয়ে ফ্লোর ক্রসিংয়ের অভিযোগ তোলার সুযোগ নেই। কারণ তিনি এখন আর দলের সদস্য নন।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘আমরা এখন তাকে (গাজী নজরুল ইসলাম) ফ্লোর ক্রসিংয়ের কথা বলব কেন? আমরা তো তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করেছি। আমরা তো বলতে পারি না, তিনি আমাদের দলের সদস্য হয়ে ফ্লোর ক্রসিং করেছেন, দলের সিদ্ধান্ত ভঙ্গ করেছেন।’

নৈতিক কারণ দেখিয়ে কমিটি থেকে বাদ দেওয়ার দাবি

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি তাঁরা স্পিকারসহ সংশ্লিষ্টদের চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, দলীয়ভাবে বহিষ্কারের পেছনে যে নৈতিকতার প্রশ্ন রয়েছে, সেটি বিবেচনায় নিয়ে তাঁকে জাতীয় সংসদের কোনো কমিটিতে না রাখাই উত্তম।

তিনি সরকারি প্রতিশ্রুতি কমিটি পুনর্গঠনের আহ্বান জানান।

শফিকুর রহমানের বক্তব্য ছিল, গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকার বিষয়টি একদিকে যেমন আলাদা সাংবিধানিক ও আইনগত প্রশ্ন, অন্যদিকে সংসদীয় কমিটিতে তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি নৈতিকতার দিক থেকেও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

‘সংসদ সদস্য পদ বহাল রাখতে চান, কমিটিতে নয়’

এর জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্য থেকে তাঁর কাছে মনে হচ্ছে, বিরোধী দল গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ বহাল রাখতে চায়, কিন্তু তাঁকে কোনো সংসদীয় কমিটিতে রাখতে চায় না।

তিনি বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা অনুরোধ করলে গাজী নজরুল ইসলামকে কমিটি থেকে বাদ দিয়ে কমিটি পুনর্গঠন করা সম্ভব। তাঁকে বাদ দিলে বিরোধীদলীয় নেতার প্রতি সম্মান দেখানো হবে বলেও মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

একই সঙ্গে তিনি বলেন, এ আলোচনার মাধ্যমে তিনি বুঝেছেন যে গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ শূন্য করার পক্ষে বিরোধীদলীয় নেতা নন।

শেষ পর্যন্ত কমিটি পুনর্গঠন

সংসদে দীর্ঘ আলোচনার পর শেষ পর্যন্ত গাজী নজরুল ইসলামের নাম বাদ দিয়ে সরকারি প্রতিশ্রুতি কমিটি পুনর্গঠন করা হয়।

ফলে সংসদ সদস্য হিসেবে গাজী নজরুল ইসলামের অবস্থান বহাল থাকলেও সরকারি প্রতিশ্রুতি কমিটিতে তাঁর অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি আর থাকল না।

তাঁকে নিয়ে সংসদে এই বিতর্কের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন কোনো রাজনৈতিক দল থেকে বহিষ্কারের পর সংসদ সদস্যের সাংবিধানিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন সামনে এসেছে, তেমনি সংসদীয় কমিটিতে সদস্য অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও নৈতিকতার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স