ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর প্রথম সপ্তাহেই মাঠে ছড়িয়ে পড়েছে এক অদ্ভুত ‘ড্র-জ্বর’। টুর্নামেন্টের শুরুতেই একের পর এক বড় পরাশক্তি ছোট দলগুলোর রক্ষণভাগের সামনে হোঁচট খাচ্ছে। প্রথম ম্যাচেই পয়েন্ট ভাগাভাগি করতে হয়েছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে। মরক্কোর বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করে মাঠ ছাড়ে সেলেসাওরা। তবে সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছে আফ্রিকার ছোট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে, যারা সাবেক ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে রুখে দিয়ে ফুটবল ইতিহাসে এক নতুন রূপকথা তৈরি করেছে।
বিশ্বকাপের প্রথম সপ্তাহের এই চমকপ্রদ ড্রয়ের মিছিল এবং এর পেছনের কৌশলগত কারণগুলো নিচে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:
স্পেনের আক্রমণ বনাম ভোজিনহার প্রাচীর
যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের ৬৭ নম্বরে থাকা কেপ ভার্দে মুখোমুখি হয়েছিল ২০১০ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনের। ম্যাচে স্পেন প্রায় একতরফা আধিপত্য বিস্তার করে গোলমুখে ২৭টি শট নেয়, যার মধ্যে ৭টি ছিল লক্ষ্যে। কিন্তু কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সী অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনহার অবিশ্বাস্য ৭টি সেভের সামনে স্পেনের তরুণ তারকা লামিন ইয়ামাল বা ফেরান তোরেসরা কোনো সুবিধা করতে পারেননি। ম্যাচটি ০-০ গোলে ড্র হওয়ায় ৫ লাখ জনসংখ্যার দেশ কেপ ভার্দের জন্য এটি এক ঐতিহাসিক অর্জনে পরিণত হয়।
একের পর এক পরাশক্তির পয়েন্ট হারানো
শুধু স্পেন বা ব্রাজিলই নয়, বিশ্বকাপের প্রথম দিনগুলোতে আরও বেশ কিছু বড় দল পয়েন্ট খুইয়েছে:
উরুগুয়ে বনাম সৌদি আরব: গত বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে হারানো সৌদি আরব এবার শুরুতে এগিয়ে গিয়ে উরুগুয়েকে ১-১ গোলে রুখে দিয়েছে।
নেদারল্যান্ডস বনাম জাপান: এশিয়ার পরাশক্তি জাপান দুর্দান্ত ফুটবল খেলে নেদারল্যান্ডসকে ২-২ গোলের নাটকীয় ড্রয়ে বাধ্য করেছে।
বেলজিয়াম বনাম মিশর: ফেভারিট বেলজিয়ামকে ১-১ গোলে আটকে দিয়েছে মিশর।
অন্যান্য ম্যাচ: ইরান ও নিউজিল্যান্ডের ম্যাচটি ২-২ গোলে এবং স্বাগতিক কানাডা ও বসনিয়ার ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্র হয়েছে। অন্যদিকে, জার্মানি ছোট দল কুরাসাওকে ৭ গোলে হারালেও কুরাসাও জার্মানির জালে গোল দিয়ে চমক সৃষ্টি করেছে।
কেন এই ‘ড্র’ এর আধিপত্য?
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, এবারের বিশ্বকাপে এত বেশি ড্র হওয়ার পেছনে মূলত দুটি প্রধান কারণ রয়েছে:
১. ৪৮ দলের নতুন ফরম্যাট: এবারের বর্ধিত ফরম্যাটে কুরাসাও বা কেপ ভার্দের মতো অনেক নতুন ও ছোট দেশ বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেয়েছে। এই দলগুলো হারানোর ভয় ছাড়া মাঠে নামছে এবং রক্ষণভাগকে সম্পূর্ণ নিরেট বা জমাটবদ্ধ করে রাখছে। আধুনিক ফুটবলে এমন সুসংগঠিত রক্ষণ ভাঙ্গা পরাশক্তিগুলোর জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২. ভৌগোলিক ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ: উত্তর আমেরিকার (যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো) তীব্র গরম, দীর্ঘ বিমান ভ্রমণ এবং ভিন্ন পরিবেশের সাথে বড় দলগুলোর তারকা খেলোয়াড়রা শুরুতেই পুরোপুরি খাপ খাইয়ে নিতে পারছেন না, যা তাদের স্বাভাবিক ছন্দে প্রভাব ফেলছে।
তবে ফুটবল ইতিহাস বলে, শুরুর হোঁচট মানেই বিদায় নয়; ১৯৮২ সালের চ্যাম্পিয়ন ইতালিও গ্রুপ পর্বে ধুঁকতে ধুঁকতে শিরোপা জিতেছিল। এবারের বিশ্বকাপ শুরুতেই প্রমাণ করে দিয়েছে যে, এই মঞ্চ শুধু ফুটবল জায়ান্টদের একার নয়, ছোট স্বপ্নের বড় হওয়ার গল্পও এখানে লেখা সম্ভব।