যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলায় ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে বলে দাবি করা হয়েছে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে নিরাপত্তা, গোয়েন্দা ও সশস্ত্র বাহিনীর বহু শীর্ষ কর্মকর্তা এই হামলায় নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও সূত্রের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির তথ্য অনুযায়ী, এই সংঘাতে ইরানের নেতৃত্ব কাঠামো গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তেহরান দ্রুত নেতৃত্ব পুনর্গঠন করে পাল্টা প্রতিরোধ চালিয়ে গেছে। এতে যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে।
এদিকে ওয়াশিংটন ও তেহরান যুদ্ধবিরতি চুক্তির লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারকে একমত হয়েছে বলে গত রোববার মধ্যরাতে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়। আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় এ চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে।
নিচে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলি হামলায় নিহত ইরানের শীর্ষস্থানীয় ও গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তুলে ধরা হলো।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি (সর্বোচ্চ নেতা)
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ১৯৮৯ সাল থেকে দেশটির শাসনব্যবস্থার শীর্ষে ছিলেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধের শুরুতেই ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে এক বিমান হামলায় তিনি নিহত হন।
হামলার সময় তিনি সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। একই হামলায় তাঁর পরিবারের একাধিক সদস্যও নিহত হন। তাঁর পুত্র মোজতবা খামেনি আহত হলেও বেঁচে যান বলে উল্লেখ করা হয়।
খামেনিকে এখনো দাফন করা হয়নি এবং তেহরান ও কোমে তিন দিনের শোক পালনের পর তাঁর জন্মস্থান মাশহাদে দাফনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে।
আলী লারিজনি (জাতীয় নিরাপত্তা প্রধান)
দীর্ঘদিন ইরানি শাসনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারক আলী লারিজনি নিরাপত্তা খাতে শীর্ষ দায়িত্বে ছিলেন। ১৭ মার্চ তেহরানে ইসরায়েলি হামলায় তিনি পরিবারের কয়েক সদস্যসহ নিহত হন বলে দাবি করা হয়।
এর আগে তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদে দায়িত্ব পালন করেন এবং ক্ষমতাসীন কাঠামোর অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
মোহাম্মদ পাকপুর (আইআরজিসি প্রধান কমান্ডার)
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ডসের (আইআরজিসি) স্থলবাহিনীর সাবেক প্রধান মোহাম্মদ পাকপুর যুদ্ধকালীন সময়ে বাহিনীর শীর্ষ কমান্ডারের দায়িত্বে ছিলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পর তিনি আইআরজিসির সর্বোচ্চ কমান্ডে আসেন। তবে যুদ্ধের প্রথম দিকেই তিনি নিহত হন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আলিরেজা তাংসিরি (নৌবাহিনী প্রধান)
আইআরজিসির নৌবাহিনীর প্রধান আলিরেজা তাংসিরি হরমুজ প্রণালিতে সামরিক কৌশল বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। তিনি ১৯৮০–৮৮ সালের ইরান–ইরাক যুদ্ধেও অংশ নিয়েছিলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েলি হামলায় তিনি নিহত হন।
আলী শামখানি (প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা)
ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা উপদেষ্টা আলী শামখানি দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
যুদ্ধের প্রথম দিনেই এক বিমান হামলায় তিনি নিহত হন বলে দাবি করা হয়েছে। তাঁর জানাজা তেহরানের তাজরিশ স্কয়ারে অনুষ্ঠিত হয়।
ইসমাইল খাতিব (গোয়েন্দামন্ত্রী)
২০২১ সাল থেকে ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা ইসমাইল খাতিব ১৮ মার্চ তেহরানে এক হামলায় নিহত হন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে তিনি ইরানের অভ্যন্তরীণ দমন–পীড়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছিল।
আজিজ নাসিরজাদেহ (প্রতিরক্ষামন্ত্রী)
ইরান–ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞ সেনা কর্মকর্তা আজিজ নাসিরজাদেহ ২০২৪ সাল থেকে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন।
যুদ্ধের প্রথম দিনেই তিনি নিহত হন বলে উল্লেখ করা হয়।
গোলামরেজা সুলেইমানি (বাসিজ কমান্ডার)
ইরানের আধা সামরিক বাহিনী ‘বাসিজ’-এর প্রধান গোলামরেজা সুলেইমানি বিক্ষোভ দমনের জন্য দায়িত্বশীল ছিলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৭ মার্চ এক বিমান হামলায় তিনি নিহত হন।
আলী মোহাম্মদ নাইনি (আইআরজিসি মুখপাত্র)
আইআরজিসির মুখপাত্র আলী মোহাম্মদ নাইনি যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন বলে দাবি করা হয়েছে।
মৃত্যুর আগে তিনি জানান, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে।
মোহাম্মদ শিরাজি (সামরিক সমন্বয় প্রধান)
সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ে নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা মোহাম্মদ শিরাজি যুদ্ধের প্রথম দিনেই নিহত হন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
আবদুর রহিম মুসাভি (সশস্ত্র বাহিনী প্রধান)
আইআরজিসি ও নিয়মিত সেনাবাহিনীর সমন্বয়কারী আবদুর রহিম মুসাভি পূর্ববর্তী সামরিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন।
যুদ্ধের প্রথম দিনেই তিনি নিহত হন বলে দাবি করা হয়।
যুদ্ধ ও ক্ষয়ক্ষতির দাবি
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের অন্তত ৫০ জনের বেশি শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, এত বড় পরিসরে নেতৃত্ব হারালেও ইরান দ্রুত পুনর্গঠন করে যুদ্ধ চালিয়ে গেছে, যা দেশটির রাষ্ট্রীয় স্থিতিস্থাপকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।